উত্তর বঙ্গোপসাগরে নতুন করে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে সংস্থাটি বলছে, এই লঘুচাপ নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত কিছুটা বাড়লেও চলতি মাসের শুরুতে হওয়া টানা ভারী বর্ষণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।সোমবার সকালে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-ওডিশা উপকূলসংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপটি সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অফিস।এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশনা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ জানান, লঘুচাপের প্রভাবে সাগর কিছুটা উত্তাল থাকতে পারে। তবে এটি নিম্নচাপে রূপ নেবে না। সর্বোচ্চ সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে পরে ভারতের ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।তিনি আরও বলেন, এই সিস্টেমের প্রভাবে আগামী শুক্রবার ও শনিবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। তুলনামূলক বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগে। রাজধানী ঢাকাতেও বৃষ্টি হতে পারে। তবে দেশের কোথাও অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা নেই। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।এর আগে ৫ জুলাই সৃষ্ট একটি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাত শুরু হয়। প্রবল বর্ষণে অন্তত ১১ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জুলাইয়ের মধ্যেই চলতি মাসে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৯ শতাংশ রেকর্ড হয়েছে।আবহাওয়াবিদদের মতে, নতুন লঘুচাপের কারণে বৃষ্টিপাত কিছুটা বাড়লেও আগের দফার মতো দীর্ঘস্থায়ী বা ব্যাপক ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা আপাতত নেই।
সংবিধান সংস্কারকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান আরও মুখোমুখি হয়ে উঠেছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সরকার বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংশোধনী আনার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল এই প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে এবং আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংসদ গঠিত বিশেষ কমিটি রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ তৈরি করবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী কমিটিতে সদস্য থাকার কথা ছিল ১৭ জনের। বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দিতে বলা হলেও তারা তা না দেওয়ায় পাঁচটি পদ আপাতত শূন্য রাখা হয়েছে।কমিটিতে বিএনপির আটজন সংসদ সদস্যের পাশাপাশি গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহকে রাখা হয়েছে।তবে মো. অলিউল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কমিটি গঠনের সময় তিনি সংসদে উপস্থিত ছিলেন না এবং পরে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন।ইসলামী আন্দোলনের এই সংসদ সদস্য বলেন, তাঁদের দল জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষেই রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ যে মত দিয়েছেন, তা উপেক্ষা করা যায় না। সরকারের বর্তমান অবস্থান জনগণের সেই রায়ের প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শনের শামিল।সংসদে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানও বিশেষ কমিটির বিরোধিতা করে বলেন, তাঁরা সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। তাই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে বিশেষ কমিটির প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন হওয়া উচিত। সরকার যদি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসার বৈধতা গ্রহণ করে, তবে গণভোটে দেওয়া সংবিধান সংস্কারের রায়কেও সম্মান জানাতে হবে। অন্যথায় রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন।সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত করতে হলেও আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পরই পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তাঁর মতে, এ বিষয়ে আলোচনার যথাযথ ক্ষেত্র হলো সংসদের বিশেষ কমিটি।এর আগে ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। তখনও বিরোধী দলকে সদস্য মনোনয়নের আহ্বান জানানো হলেও তারা এতে অংশ নেয়নি।বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, সরকার সেই পথ এড়িয়ে গিয়ে দেশকে নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান জানান।বিরোধী জোটের নেতারা জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিবাদ শুধু সংসদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংসদের ভেতরে বিশেষ কমিটির বিরোধিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোটের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছিল। সরকারের বর্তমান অবস্থান সেই অঙ্গীকার থেকে সরে আসার শামিল। তাই সংসদের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়েও আন্দোলন সংগঠিত করা হবে।জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান প্রশ্ন তোলেন, অতীতে সংবিধান সংশোধনের সময় বিশেষ কমিটির প্রয়োজন হয়নি, এবার কেন হলো। তাঁর দাবি, আগের একাধিক সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়েছে। সে অভিজ্ঞতা থেকেই বিরোধী দল মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য আলাদা সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।বিশেষ কমিটি গঠনের সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও। এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণভোটে জনগণ মৌলিক সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। সেই রায় উপেক্ষা করে সরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে।বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংবিধান পরিবর্তনের দুই ভিন্ন পদ্ধতি। সরকার বিদ্যমান সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংশোধনী আনার পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী জোটের দাবি, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সেখানে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের মতে, এটি কেবল সংবিধান সংশোধনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্ন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে তুমুল আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দলগত বিচার দ্রুত শুরু, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর এবং তাকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান জানানোর দাবি জানিয়েছে। জবাবে সরকার জানিয়েছে, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আত্মসমর্পণের সুযোগ নয়, সরাসরি গ্রেপ্তার করা হবে।মঙ্গলবার সংসদে বিধি-৬৮ অনুযায়ী ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ বিষয়ে জরুরি জনস্বার্থে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়ে নোটিশ দেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবিতে সরকার আন্তরিক। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে আইন প্রণয়নে সরকারই উদ্যোগ নিয়েছে এবং সংসদে তা পাস করতেও ভূমিকা রেখেছে। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগের বিচার দাবি তিনিই প্রথম সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। সেই রায়ের প্রতি সম্মান জানাতে হলে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল। কিন্তু বিরোধী দল কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যেন দেশে আর কোনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে, সে লক্ষ্যেই সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী ৫ আগস্ট ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করা হবে। এছাড়া বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আহত জুলাই যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে থাকবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিবেশী দেশকে বদলানো যায় না। তাই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতেই সরকার এগোচ্ছে বলে তিনি জানান।শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাগিদ দিচ্ছে। বিভিন্ন মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আরও কয়েকজন আসামিকেও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে এবং এ বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের নিপীড়নের চূড়ান্ত পরিণতি। এই সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার মানুষের বিচার নিশ্চিত না হলে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। তিনি বলেন, বিচার হতে হবে দ্রুত, তবে অবশ্যই ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে।তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের একটি বড় অংশের গণমাধ্যম অতীতে স্বৈরাচারকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছিল। এখনো তারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে দাবি করে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ জানতে চান। সীমান্ত ইস্যুতেও সরকারের আরও দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশা করেন তিনি।আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে, চারটি মামলায় অভিযোগ গঠন এবং তিনটি মামলায় রায় হয়েছে। শাপলা চত্বরের ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে এবং জুলাই হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেলা পর্যায়ে তদন্ত বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।তিনি বলেন, দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের বক্তব্য এলেও বাংলাদেশের আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। তিনি দেশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার হবেন—এটি সরকারের অঙ্গীকার।এনসিপির চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, যে রাজনৈতিক দল দুই দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে গণহত্যা, গণতন্ত্র ধ্বংস এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, সেই আওয়ামী লীগের দলগত বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার চালিয়েছে। এমনকি সরকারের কিছু সদস্যের বক্তব্যেও সেই বয়ানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, নতুন প্রসিকিউশন টিম এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনাও জানতে চান তিনি।আলোচনার সূচনা করা আখতার হোসেন বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তাই শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত শাস্তি কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরুর জন্য সরকারের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।গণ-অধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নূরুল হক বলেন, ফ্যাসিবাদের বিচার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো স্বৈরাচারী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে গণবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, সে জন্য আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রয়োজন। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত সমঝোতার আহ্বান জানান তিনি।আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগমও অংশ নেন।
এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে থাকা দুটি ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে বন্যা বা দুর্যোগের কারণে যেসব পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে পৃথক দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।মন্ত্রী বলেন, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ত্রুটি ছিল। তাই ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থী পূর্ণ নম্বর পাবেন। পাশাপাশি যেসব কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণে অনিয়ম বা বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে, সেসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে।শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কীভাবে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায় এবং দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না করে পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।সোমবার প্রবল বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেই দেশের বেশির ভাগ শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অন্য সব বোর্ডে পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া হয়।বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে ব্যাখ্যা দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, পরীক্ষা শুরুর আগে ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনার, শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকার তথ্য পাওয়ার পরই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।তবে সকালে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। পরে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে নিরাপদ ভবনে নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। যেসব শিক্ষার্থী অসুবিধায় পড়েছিলেন, তাদের অতিরিক্ত সময়সহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।মন্ত্রী আরও বলেন, কোনো এলাকায় দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব না হলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কেন্দ্র পরিবর্তন বা পরীক্ষা স্থগিতের ক্ষমতা রয়েছে। কোথাও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলে প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে। প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশনের কাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। তারপরও ভুল শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের দুটি প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে একই অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন এবং এবতেদায়ি মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছেন একদল শিক্ষার্থী। সড়ক অবরোধের পর তারা মিছিল নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা ঘেরাও করেন।মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল প্রায় ১১টা ৪৫ মিনিটে ‘২০২৬ ব্যাচ এইচএসসি পরীক্ষার্থী’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নেন। সেখানে কিছু সময় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন শেষে তারা মিছিল নিয়ে নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন।মিছিলটি দুপুর প্রায় ১২টা ৫৫ মিনিটে ভিসি চত্বরের পূর্ব পাশে পৌঁছালে পুলিশ তাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। এ সময় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ গেট দিয়ে বের হয়ে পলাশী মোড় হয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থানকালে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবিগুলো হলো—দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৩ জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ।এ সময় আন্দোলনকারীরা ‘দফা এক, দাবি এক—মিলনের পদত্যাগ’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। শিক্ষামন্ত্রীকে লক্ষ্য করেও নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো শোনা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে শিক্ষা বোর্ড।
রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর ঘিরে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের যে কৌশল বেইজিং নিয়েছে, তাতে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডরে যুক্ত হওয়ার আগে ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করতে হবে।মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে কিয়াউকফিউ নামের ছোট্ট একটি বন্দর। বাইরে থেকে দেখলে একে নিতান্তই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, এই একটি বন্দর ঘিরেই এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক দাবা খেলাটি চলছে। চীনের কাছে এটি নিছক পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা নয়; বরং এটি ভারত মহাসাগরে সরাসরি পা রাখার সবচেয়ে নিরাপদ দরজা। আর এই দরজার পোশাকি নাম হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর বা সিএমইসি।একটু তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগের চেয়ে বড় কোনো কৌশলগত হাতিয়ার আর নেই। চীনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই-এর সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো এই করিডোর। চীনের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের বুক চিরে সোজা বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে এই পথ। কেন এই বিপুল বিনিয়োগ? সহজ উত্তর হলো, মালাক্কা প্রণালির ওপর বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমানো। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কখনো সংঘাত বাধলে ওই সরু মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই ভয় চীনের সবসময়ের। তাই কিয়াউকফিউ বন্দর দিয়ে সরাসরি তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে নিজেদের দেশে নেওয়ার এই বিকল্প পথটি তাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই লাইফলাইন।আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের শিক্ষনীয়আমাদের নিজেদের প্রেক্ষাপট বোঝার আগে আন্তর্জাতিক দিকে একটু চোখ ফেরানো দরকার। এ ধরনের বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডরের মডেল পৃথিবীতে নতুন নয়। আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকাই, সেখানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) অধীনে গাদর বন্দর গড়ে তোলা হয়েছে। শুরুতে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো পাকিস্তান এখন বিশাল ঋণের বোঝায় ধুঁকছে এবং ওই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কেবল বেড়েছে। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের পরিণতি আমাদের সবার জানা। ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্দরটির নিয়ন্ত্রণই বেইজিংয়ের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে কলম্বো।এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরাশক্তির বড় বিনিয়োগ সব সময় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি আনে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ঋণফাঁদ এবং কৌশলগত পরাধীনতার জন্ম দেয়। তাই চীনের নতুন কোনো করিডরে যুক্ত হওয়ার আগে এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।বাংলাদেশের বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবার আসা যাক আমাদের নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে, গত জুন মাসে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি সফরের সময় এই করিডোরের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। চীন প্রস্তাব দিয়েছে, মিয়ানমারের এই করিডোরটি বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে একটি ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ বা সিএমবিইসি গড়ে তোলার। প্রস্তাবটি শুনতে বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর যুক্ত হলে আমাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের স্থানীয় বাস্তবতা আসলে কতটা অনুকূল?প্রথমত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। রাখাইন রাজ্যসহ করিডোরটির বড় অংশই এখন জান্তা সরকারের হাতছাড়া। সেখানে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে। এই অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে একটি নিরাপদ বাণিজ্যিক পথ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে রোহিঙ্গা সংকটের মতো একটি বিশাল বোঝা। মিয়ানমার যতক্ষণ না এই সংকটের সম্মানজনক সমাধান করছে, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে কোনো বহুমাত্রিক ট্রানজিট বা অর্থনৈতিক চুক্তিতে যাওয়াটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।এর পাশাপাশি রয়েছে বড় শক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ। বঙ্গোপসাগরে চীনের এই আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে ভারত কখনোই ভালোভাবে নেবে না। কারণ, তারা এটিকে নিজেদের ঘিরে ফেলার কৌশল হিসেবেই দেখছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ভারতও কালাদান প্রকল্পের মতো নিজস্ব অবকাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের কোয়াড মিত্ররাও ভারত মহাসাগরে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকাতে মরিয়া। বাংলাদেশ যদি তড়িঘড়ি করে এই করিডরে যুক্ত হয়, তবে আমরা খুব সহজেই এই বৃহৎ শক্তিগুলোর রেষারেষির মাঝখানে চাপা পড়ে যাব।আমাদের করণীয় ও নীতি-প্রস্তাব তাহলে বাংলাদেশের পথ কোনটি? ভূরাজনীতিতে আবেগ বা তাড়াহুড়োর কোনো জায়গা নেই। আমাদের এগোতে হবে অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং ধাপে ধাপে।আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি স্বাধীন ও অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক সমীক্ষা পরিচালনা করা। প্রস্তাবিত করিডরে যুক্ত হলে আমাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ কতটা হবে এবং ঋণের শর্তগুলো কেমন, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ঋণের ফাঁদে যেন আমরা পা না দিই, সেটি নিশ্চিত করাই হবে প্রধান কাজ।দ্বিতীয়ত, আমাদের স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে হবে যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন কোনো বৃহৎ অর্থনৈতিক সংযুক্তিতে ঢাকা জড়াবে না। করিডর সম্প্রসারণের এই চীনা প্রস্তাবটিকে আমরা বরং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বেইজিংকে দিয়ে নেপিদোর ওপর চাপ প্রয়োগের একটি কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল পদক্ষেপটি হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা। আমাদের বন্দরগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির একক ব্যবহারের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন—এই তিন শক্তিকেই বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু তা কোনোভাবেই কারও সামরিক বা কৌশলগত আধিপত্যের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না। ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পরিশেষে এটুকু বলা যায়, একুশ শতকের অর্থনীতিতে কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি নতুন দরজা খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা যেমন রাখে, ঠিক তেমনি এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ভূরাজনৈতিক দাবানলের ঝুঁকি। একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারে না, আবার অন্ধের মতো এতে ঝাঁপিয়েও পড়তে পারে না। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এই বৈশ্বিক রেষারেষি মোকাবিলা করতে পারি। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে আমাদের অত্যন্ত ধীরস্থির, প্রজ্ঞাবান ও বাস্তবমুখী হতে হবে। কারণ, কূটনীতির এই টেবিলে একটি ভুল চাল আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মাশুল গুনতে বাধ্য করতে পারে।
ইতিহাসে এমন কিছু জাতি আছে, যাদের শক্তি কেবল সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাদের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সভ্যতার স্মৃতি, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায়। পারস্য—আজকের ইরান—সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই ভূখণ্ড আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক শক্তি।ইরানের সমর্থকদের কাছে দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মমর্যাদাবোধ। তাদের বিশ্বাস, বহিরাগত চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা—কোনোটিই ইরানকে তার মৌলিক অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। সমালোচকেরা এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত না হলেও এটুকু অস্বীকার করা কঠিন যে, গত চার দশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইরান একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।এই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে আয়াতুল্লাহ খোমেনির রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি নতুন আদর্শিক অধ্যায়ের সূচনা। সেই বিপ্লবের পর থেকে ইরানকে ঘিরে সমর্থন ও বিরোধিতা—উভয়ই সমানভাবে তীব্র হয়েছে।খোমেনির মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান ঘটিয়েছে—এমনটি বলা কঠিন। ইতিহাসে বহু নেতার মতোই মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকার নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে খোমেনিকে ঘিরে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্ভবত একক পরাশক্তির বিশ্ব থাকবে না। বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আদর্শিক রাজনীতির প্রশ্নে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেই পারে।তবে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা আজ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের আদালত আবেগ নয়, দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, অর্জন, ব্যর্থতা এবং মানবিক প্রভাবের সমন্বিত বিচার করে রায় দেয়। তাই আয়াতুল্লাহ খোমেনির উত্তরাধিকারও আগামী প্রজন্ম নতুন প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করবে।একটি বিষয় অবশ্যই স্পষ্ট—ইরানকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কঠিন। আর খোমেনিকে বাদ দিয়ে আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব। তিনি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে কী পরিচয়ে স্মরণীয় হবেন, তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে সময়। তবে এতটুকু বলা যায়, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আগামী বহু বছর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূরাজনীতি এবং রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েই থাকবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্য কৌশলে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। চীনের প্রস্তাবিত নতুন এই কানেক্টিভিটি প্রকল্প—যা মিয়ানমারের বুক চিরে চীনের সঙ্গে সরাসরি রেল ও সড়কপথের সংযোগ স্থাপন করবে—তা বাস্তবায়িত হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি ও পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতাভুক্ত এই করিডোরটিকে অনেকেই তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন।বুলেট ট্রেনে চীনের পথেচীনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠবে সরাসরি রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক। বুলেট ট্রেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৫০ কিলোমিটার হলে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে চীনের মূল ভূখণ্ডে। সড়কপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা চালু হলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে। আধুনিক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনের এই সক্ষমতা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন পথ খুলে দেবে। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ভারত-নির্ভরতা কমিয়ে চীনের বিশাল সোর্সিং মার্কেটে সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলে ব্যবসায়িক খরচ অনেক কমে আসবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাজারে।রপ্তানির নতুন দুয়ারএই করিডোর শুধুমাত্র আমদানির পথ প্রশস্ত করবে না, বরং বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। গত অর্থবছরে ভিয়েতনাম চীনে রপ্তানি করেছে ৬১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যার একটি বড় অংশই কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য। বাংলাদেশও যদি একইভাবে চীনের বাজারে কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে পারে, তবে রপ্তানি আয়ের খাতা দ্রুত বড় হবে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানি শুরু হয়েছে এবং কাঁঠালসহ অন্যান্য কৃষি পণ্য নিয়ে নতুন করে চুক্তি হয়েছে। কুঁচিয়া, কাঁকড়া ও চিংড়ির মতো উচ্চমূল্যের পণ্যগুলো সরাসরি চীনের বাজারে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরি হবে।আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুএই করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু চীনের সঙ্গেই নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। লাওস, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সহজতর হবে। এটি দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভারতকে ছাড়িয়ে বাণিজ্যের নতুন মেরুকরণে দেশ একটি শক্ত অবস্থানে চলে আসবে।চিকিৎসা ও পর্যটনে বিপ্লবসাধারণ মানুষের যাতায়াত ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এই করিডোর বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারত-নির্ভর চিকিৎসা ও পর্যটন ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষ খুব সহজেই চীনের আধুনিক চিকিৎসাসেবা ও পর্যটন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা জটিলতায় অনেকেই বিকল্প হিসেবে চীনকে বেছে নিচ্ছেন। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হলে সাধারণ নাগরিকের জন্য যাতায়াত খরচ ও সময়—দুটোই সাশ্রয় হবে। এটি ভারতের পর্যটন ও চিকিৎসা ব্যবসার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমাবে এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করবে।বাস্তবায়নের গুরুত্ববিআরআই প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘমেয়াদী এই কানেক্টিভিটি কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের টিকে থাকার বড় অস্ত্র। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের সমন্বয়ে এই প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। চীন-বাংলাদেশ এই করিডোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী লজিস্টিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এ প্রকল্পটি এখন কেবল সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। স্বাধীনতার পর যে দেশটিকে একসময় দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও অনুন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির কাতারে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। এই দীর্ঘ পথচলা কোনো একক খাতের অবদান নয়; বরং কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং প্রবাসীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল আজকের এই বাংলাদেশ।তবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থনীতি কেবল উদযাপনের বিষয় নয়, এটি একটি বড় দায়িত্বেরও সূচনা। অর্থনীতি যত বড় হয়, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জও সেই হারে বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নের আসল মানে কেবল জিডিপির আকার নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলোর সহজলভ্যতা। প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন এর সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়।অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তিবাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে কিছু খাত শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে:তৈরি পোশাক শিল্প: দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এই খাত লাখো মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।রেমিট্যান্স: প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান উৎস।কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি: খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালী ভূমিকা দেশের ভিত্তিকে মজবুত করেছে।সেবা খাত: তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন ও ব্যাংকিং খাতের প্রসার নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।আগামীর চ্যালেঞ্জ ও আর্থিক শৃঙ্খলাএত বড় অর্থনীতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো, কিন্তু বর্তমানে দেশের সামনে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি বড় অর্থনীতি কেবল দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থার ওপর ভর করে টিকে থাকতে পারে না। তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন:ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা।ঋণ প্রদানে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের অবসান ঘটানো।খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।অর্থপাচার বন্ধে শক্তিশালী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।ভবিষ্যৎ পথচলা: নতুন কর্মপরিকল্পনাবিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা মূল চালিকাশক্তি হবে। তাই শুধু কম খরচের শ্রমনির্ভর শিল্প দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় হলো:প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নে জোর দেওয়া।গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো।দক্ষ মানবসম্পদ ও কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করা।রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা।বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিপুল জনসংখ্যা, তবে তাদের আধুনিক ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা গেলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের পথে যাত্রার এই মাহেন্দ্রক্ষণে, পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত টেকসই প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই মাইলফলকের সার্থকতা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
হরমুজের পর বাব–এল-মান্দেব: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান হামলা কিংবা সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের নতুন ভাষা হয়ে উঠছে কৌশলগত সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব–এল-মান্দেবকে ঘিরেও নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল আরেকটি সামরিক হুমকি নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকে কেন্দ্র করে ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর হামলাও বেড়েছে। এই দুই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছেন না মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, তেহরান এখন সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বাড়িয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের প্রধান জ্বালানি করিডোরগুলোও এর অংশ হয়ে উঠবে।সমুদ্রপথ কেন ইরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রসামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের পক্ষে সহজ নয়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এমন একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে, যা বহু বছর ধরে তেহরানের অন্যতম বড় হাতিয়ার।বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। অন্যদিকে বাব–এল-মান্দেব প্রণালি সংযুক্ত করেছে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও ভারত মহাসাগরকে। এ পথ দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও পণ্য পরিবহন হয়।ফলে এই দুটি প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন—সবকিছুর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্বের ভোক্তাদের কাছেই পৌঁছায়।হুতিদের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, তারা লোহিত সাগরের নৌপথে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর তারা একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এর ফলে বিশ্বের বৃহৎ শিপিং কোম্পানিগুলোকে সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয়—দুই-ই বেড়ে যায়।এবার হুতিদের পক্ষ থেকে বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি নতুন করে সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে।ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, হুতি নেতা মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে তাঁরা বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে প্রস্তুত। তাঁর দাবি, এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।যদিও এই ধরনের মূল্য পূর্বাভাস নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করার জন্য এমন বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।চাপের নতুন সমীকরণমধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, তেহরান এখন ওয়াশিংটনকে এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, সংঘাতের মূল্য শুধু ইরানকে নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।এ কৌশলের মূল দর্শন হলো—যদি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানো হয়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধরত পক্ষের নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বর্তাবে।এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান এখন সরাসরি সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে বড় উদ্বেগনিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। বরং ধাপে ধাপে সংঘাতের বিস্তার।আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে একে বলা হয় 'মিশন ক্রিপ'—যেখানে কোনো পক্ষই শুরুতে সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না, কিন্তু প্রতিটি পাল্টা পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখান থেকে পিছু হটা কঠিন হয়ে পড়ে।মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা অনেকটাই সেই দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।কূটনীতির সময় কি ফুরিয়ে আসছে?যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শান্তি আলোচক ডেনিস রস মনে করেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, যাতে ইরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে এবং শুধু আলোচনায় বসাই নয়, একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহও দেখায়।অন্যদিকে সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগেরের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও উপলব্ধি করছে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য পুরো অঞ্চলকেই দিতে হবে।বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন অনিশ্চয়তাহরমুজ ও বাব–এল-মান্দেব—এই দুটি প্রণালি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অংশ নয়; এগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিরও অন্যতম প্রাণরেখা।যদি এই দুই সমুদ্রপথ একই সময়ে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তাহলে শুধু তেলের দামই বাড়বে না; বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।ফলে বর্তমান সংঘাতের গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে এমন এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অর্থনীতিতে অনুভূত হতে পারে।এ কারণেই অনেক বিশ্লেষকের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাপ্রবাহ নয়, হরমুজ ও বাব–এল-মান্দেবকে ঘিরে নেওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি তার কী মূল্য দেবে।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে ১৪ জন উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারকে নতুন করে পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে আগে থেকে দায়িত্বে থাকা পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালকসহ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে।বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পাঁচ সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। তবে আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের সক্রিয় উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাদের আবারও পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ১৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল, তার মধ্যে আল-আরাফাহ ব্যাংকের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়েছে। অন্য কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা পরিচালকদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আল-আরাফাহ ব্যাংকের উদ্যোক্তারা সক্রিয় থাকায় তাদের আবার পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।নতুন উদ্যোক্তা পরিচালকদের মধ্যে কেডিএস গ্রুপের তিনজন রয়েছেন। তারা হলেন— কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি পরিচালক মাহবুব আহমেদ এবং কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। এছাড়া কেওয়াই স্টিল মিলের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে রয়েছেন শরিফ উদ্দিন তসলিম।পর্ষদের অন্য নতুন সদস্যরা হলেন— বদিউর রহমান, মো. এনায়াত উল্লা, সেলিম রহমান, আহামেদুল হক, মো. রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইমাদুর রহমান, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ আবদুস সালাম এবং লিয়াকত আলী চৌধুরী।এদিকে বর্তমান স্বতন্ত্র পরিচালকরা— খাজা শাহরিয়ার, মো. শাহীন উল ইসলাম, মো. আব্দুল ওয়াদুদ, ড. এম আবু ইউসুফ এবং মোহাম্মদ আশরাফুল হাসান— নতুন পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করবেন।বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পুনর্গঠিত ১৯ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের মধ্য থেকে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচন করবে।
গাইবান্ধায় বিশাল আকৃতির একটি রামমূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে রোববার রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা থেকে তাকে আটক করা হয়।সোমবার তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে তদন্তকারী সংস্থা। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন, যাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়।সিআইডির দায়ের করা মামলায় হরিদাসের বিরুদ্ধে দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা তার বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমের উৎস ও বৈধতা খতিয়ে দেখছেন।গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম হরিদাসের। তাকে গ্রেফতারের পর সিআইডি জানায়, তিনি ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেছেন। তবে মঙ্গলবার সংস্থাটি জানিয়েছে, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কিত এই তথ্য এখনো যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হরিদাস দাবি করেছেন, তার অনুসারী ও ভক্তদের দেওয়া অনুদান থেকেই অর্থ এসেছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একজন এসি মেকানিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা ব্যক্তি কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে শতকোটি টাকার আর্থিক লেনদেনে যুক্ত হলেন, সেই অর্থের উৎস ও লেনদেনের প্রকৃতি এখন তদন্তের মূল বিষয়।
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের রায় কার্যকর করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় ওই রায়ের বিরুদ্ধে এখন আর কোনো আইনি আপিলের সুযোগ নেই।বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণার পর আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে তাঁর পক্ষে কোনো আপিল করা হয়নি। তাই এখন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন।সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেওয়া সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সেখানে তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের কথা বলেছেন। তবে তিনি কবে ফিরবেন, সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।তিনি আরও বলেন, সরকারও ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দর থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের রায় কার্যকর করা হবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, মন্ত্রী আপিলের বিষয়টি আইনের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে তাঁর নিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ মামলায় আপিলের আর কোনো সুযোগ নেই।আলোচনা সভায় ২০২৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের ঘটনাও তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি ওই দিনের হামলায় জড়িতদের তালিকা প্রকাশ, দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে হামলাকে সমর্থন বা বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।সংস্কার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাঁর দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।তিনি বলেন, গুমবিরোধী অধ্যাদেশ, পুলিশ সংস্কার, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়সহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সংবিধান বা সাংবিধানিক পুনর্গঠনের পরিবর্তে কেবল সংশোধনের পথে হাঁটা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।বক্তব্যের এক পর্যায়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরেই নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি গড়ে উঠবে। তাঁর ভাষায়, দেশকে আর স্বৈরতন্ত্রের পথে নয়, গণতন্ত্র, বৈষম্যহীনতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের পথে এগিয়ে নিতে হবে।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান এবং সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন দলের শৃঙ্খলা বিভাগের প্রধান ও সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ এবং জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতারা।অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আয়োজকেরা।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে শিশুদের আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও লুণ্ঠনের শিকার শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যজ্ঞানেই নয়, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণেও সমৃদ্ধ হবে।বুধবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একযোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।মাহদী আমিন বলেন, দেশের সাতটি জেলা থেকে নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের ভালোবাসা ও উদ্দীপনা প্রমাণ করে যে, জনমুখী নেতৃত্ব মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলতে পারে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন-ভাবনাকে বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং সেই লক্ষ্যেই শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হবে।তিনি আরও বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করবে। আগামী দিনের সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও আধুনিক বাংলাদেশ গঠনে তারাই নেতৃত্ব দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে একটি উন্নত বাংলাদেশের যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সারাদেশের বিদ্যালয়ে প্রায় দুই লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। তিনি জানান, এই কর্মসূচি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিক্ষার্থীরাই নিজ নিজ বিদ্যালয়ে গাছগুলোর পরিচর্যা করবে। এর মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা-ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সারা বছর দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। এসব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধাবী ও সৃজনশীল শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হবে।অনুষ্ঠানে তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রাথমিক স্তরের প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ‘প্রাইম মিনিস্টার্স ফুটবল গোল্ড কাপ’ আয়োজনেও প্রধানমন্ত্রী পৃষ্ঠপোষকতা করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর রাজধানী প্যারিস এবং লিওঁসহ বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকদের একটি অংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অভিযান চালিয়ে দুই শহর থেকে মোট ১৬০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভি জানিয়েছে, আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু প্যারিস থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছে ১৪১ জনকে। পুলিশ প্রিফেকচারের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে পুলিশ সদস্য ও জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজির মর্টার ছোড়ার অভিযোগে।একই সময়ে লিওঁর প্লাস বেলকুর চত্বরে বড় পর্দায় শত শত ফুটবলপ্রেমী সেমিফাইনাল ম্যাচটি উপভোগ করেন। খেলা শেষ হওয়ার পরও সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান করছিলেন। পরে কয়েকটি ছোট দল নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে বিভিন্ন বস্তু, বিশেষ করে আতশবাজি ছুড়ে মারলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ইউনিট সিআরএস ৮৩-এর সহায়তা নেয়। যৌথ অভিযানে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার পাশাপাশি প্রায় ২০ জনকে আটক করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, আটক হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ২০০২ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া তরুণ।তবে সংঘর্ষের মধ্যেও বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত হননি। একই সঙ্গে সরকারি বা বেসরকারি সম্পদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবিতে ভোলায় মানববন্ধন করেছেন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুর সোয়া ২টার দিকে ভোলা প্রেস ক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।‘ভোলার সব এইচএসসি পরীক্ষার্থী’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা অংশ নেন। তারা চলমান এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নিজেদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন।মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতি ও চাহিদা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও জানান তারা।কর্মসূচিকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেজন্য ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।ভোলা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইব্রাহিম বলেন, বিভিন্ন দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা প্রেস ক্লাবের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে এবং কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারে দিনের আলোয় এক ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র তাণ্ডব চালিয়েছে একদল সন্ত্রাসী। ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) নামের ওই কার্যালয়ে ঢুকে কর্মীদের জিম্মি করে ভাঙচুর ও টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটিতে এই হামলার ঘটনা ঘটে, যা পুরো এলাকায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হঠাৎ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশীয় অস্ত্র ও কুড়াল হাতে সন্ত্রাসীরা অফিসের কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর করতে থাকে। কর্মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাদের মুঠোফোন কেড়ে নেয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির জানান, ভাঙচুরের পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা।প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন জানান, ঘটনার দুই দিন আগে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে ফোন দিয়ে ২ কোটি টাকা চাঁদা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দাবি করে। ফোনে ইমন দাবি করেন, এখন থেকে ওই এলাকার ব্যবসা তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, দাবিকৃত চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ইমন ও তাঁর অনুসারীরা এই হামলা চালায়।আদিল বিন মামুন আরও বলেন, ফোনে কথা বলার সময় ইমন অত্যন্ত উদ্ধত আচরণ করেন। এমনকি নিজের প্রভাব জাহির করতে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে এবং এর আগে স্মার্ট গ্রুপের মালিকের বাসায় গুলি করার ঘটনা উল্লেখ করে তাঁকে হুমকি দেন।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর বাহিনী। বর্তমানে এই বাহিনীর চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইমনের বিরুদ্ধে বাকলিয়ার জোড়া খুন ও পতেঙ্গার সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ অন্তত সাতটি গুরুতর মামলা রয়েছে। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে পারদর্শী ইমন ও তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে নগরের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছে।এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিষ্ঠানের পাশেই স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসায় একইভাবে চাঁদা না পেয়ে গুলি করার ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া গত মে মাসে এক সাংবাদিককে গুলি করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই ইমনের বিরুদ্ধে। একের পর এক এমন ঘটনায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলীর এই অনুসারীদের গ্রেপ্তার করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে বলেও তিনি জানান।
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কথা মাথায় রেখে ফেনীর সোনাগাজীর মুহুরী সেচ প্রকল্পের ৪০টি দরজা খোলা রাখা হয়েছে। পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়া দ্রুত এবং নদীর পানির স্তর স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে গত প্রায় দুই মাস ধরেই এই গেটগুলো খোলা রয়েছে। সেই সাথে উপজেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নদী ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত আরও ১০টি স্লুইস গেটও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, এটি কোনো আকস্মিক বা জরুরি কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি তাদের বার্ষিক নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শিহাব আহাম্মেদ জানান, সাধারণত প্রতি বছরের নভেম্বর মাসে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে রেগুলেটরের গেটগুলো বন্ধ করা হয়, যা এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বন্যার ঝুঁকি কমাতে এপ্রিলের শেষ দিকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই গেটগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং সেগুলো বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত খোলাই থাকে। বর্তমানে গেট খোলা নিয়ে যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। মুহুরী সেচ প্রকল্পের রেগুলেটরটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে এটি জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে পারে। প্রকৌশলী শিহাব আহাম্মেদ ব্যাখ্যা করেন, জোয়ারের সময় ফেনী নদী থেকে উল্টো স্রোতের পানি যেন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ‘ফ্ল্যাপ গেট’গুলো পানির চাপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। আবার ভাটার সময় বা পানির চাপ কমে গেলে সেগুলো আপনাআপনি খুলে যায়। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ জুলাই রাত ১১টা পর্যন্ত মুহুরী নদীর পানির স্তর ছিল ১০ দশমিক ১৪ মিটার। এখানে বিপৎসীমা হলো ১২ দশমিক ৫৫ মিটার। অর্থাৎ, পানির স্তর এখনো বিপৎসীমার বেশ নিচে রয়েছে।গত ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে ৪৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শনিবার রাত ৯টার পর থেকে নদীর পানি কিছুটা বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে এখনো পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে এবং পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব বিভাগকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। মুহুরী সেচ প্রকল্পটি ফেনী ও কালিদাস পাহালিয়া নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বর্ষাকালে বন্যা থেকে জনপদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রকল্পের ৪০ ভেন্টবিশিষ্ট রেগুলেটরের মাধ্যমেই মূলত বর্ষার অতিরিক্ত পানি বঙ্গোপসাগরের দিকে নিষ্কাশন করা হয়।
পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। ভয়াবহ এই জলাবদ্ধতায় উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে স্বাভাবিক চলাচল—সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্গতদের কষ্ট লাঘবে উপজেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ শুরু করলেও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।জলাবদ্ধতার মূল কারণ ও জনদুর্ভোগস্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উপজেলা সদরের ‘মার্টিন খাল’ দখল করে দোকানঘর, মার্কেট ও প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণের ফলে পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। পৌর এলাকার বাসিন্দারা জানান, খাল সংস্কার না হওয়ায় এবং খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পৌরসভা এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা এবারের আষাঢ়ের ভারী বর্ষণে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।জীবনযাত্রায় বিপর্যয়উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও জাহাজমারা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এখন পানির নিচে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে। পানিবন্দী বাসিন্দাদের রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় খাবার রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকট। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কাঁচা-পাকা সড়ক ও হাটবাজার তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।কৃষিখাতে বড় ক্ষতিটানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাতিয়ার কৃষিখাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। আগাম আমন মৌসুমের বীজতলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা দুশ্চিন্তায় আছেন। এছাড়া পুকুর ও মাছের ঘের উপচে অনেক চাষি তাদের মাছ হারিয়েছেন। দ্রুত পানি না নামলে সবজি ফসলের ব্যাপক সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও জাহাজমারা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে এখন থৈ থৈ করছে পানি। বহু ঘরবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় রান্না করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জাহাজমারা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিন আগেও যেখানে গবাদিপশু চরে বেড়াত, আজ সেখানে নৌকা চলছে।’ কর্মহীন হয়ে পড়া দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি খাদ্য সংকটে ভুগছেন।যোগাযোগ বিচ্ছিন্নবিপদসীমার উপরদিয়ে প্রবাহিত মেঘনার তীব্র স্রোতে সীট্রাক,ফেরিসহ সকল ধরনের জলযান প্রশাসনের নির্দেশে বন্ধ থাকায় মূল ভূখন্ডের সাথে হাতিয়ার যোগাযোগ কার্যত বন্ধ আছে। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবালের নেতৃত্বে ‘হাতিয়া টিম’-এর সহায়তায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে পানিবন্দী পরিবারগুলোর মাঝে চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। পানিবন্দী আবুল কালাম ও গৃহবধূ রাবেয়া বেগম জানান, প্রশাসনের এই সহায়তায় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।শিক্ষা ও কৃষিতে বড় আঘাত জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পশ্চিম মাইজচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছায়েদুল ইসলাম মিঠু জানান, কাদা ও পানি মাড়িয়ে নারী শিক্ষক ও ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে আসতে হচ্ছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। এদিকে, কৃষকরা পড়েছেন চরম অর্থনৈতিক সংকটে। আমন মৌসুমের শুরুতে বিস্তীর্ণ এলাকার বীজতলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা। পাশাপাশি শত শত পুকুর ও মাছের ঘের উপচে চাষের মাছ ভেসে গেছে। নিঝুমদ্বীপের কৃষক সাহেদ উদ্দিন বলেন, ‘আমার পুরো বীজতলা পানির নিচে। মাছও ভেসে গেছে। এখন নতুন করে চাষাবাদ কীভাবে করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’জলাবদ্ধতার নেপথ্যে: অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও দখল স্থানীয়দের অভিযোগ, ভৌগোলিক কারণের চেয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত বাধাই এই কৃত্রিম বন্যার মূল কারণ। উপজেলা সদরে মার্টিন খালের ওপর গড়ে ওঠা দোকানঘর, মার্কেট ও বহুতল ভবনের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া, হাতিয়ার ছোট-বড় খালগুলোতে অবৈধভাবে পাতানো ‘বেহুন্দী জাল’ পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। উপজেলার প্রায় ২০টি স্লুইসগেটের অধিকাংশেরই ডালা বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে পড়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি আহসান হাবীব রুবেল অবিলম্বে এসব জাল অপসারণ এবং স্লুইসগেটগুলো সচল করার দাবি জানিয়েছেন।প্রশাসনের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় জরুরি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ইউএনও মোহাম্মদ রাসেল ইকবাল জানান, ‘হাতিয়া নদীবেষ্টিত হওয়ায় কিছু এলাকায় পানি নিষ্কাশন ধীরগতিতে হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং দুর্গতদের ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি।’আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কায় দ্বীপবাসীর উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বছরের এই চেনা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসন যেন শুধু সাময়িক ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, স্লুইসগেট মেরামত এবং একটি স্থায়ী ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে।