মহাকালের আয়না
আমাদের ছোটবেলার পাঠ্যবই বা জাতীয় দিবসগুলোর গল্পে বীরদের অভাব নেই। আমরা সবাই জানি ক্ষুদিরাম বসুর কথা, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই কালজয়ী গানের কথা। ক্ষুদিরাম আমাদের অহংকার, আমাদের প্রেরণা। কিন্তু আজ আপনাদের এমন একজনের গল্প শোনাব, যিনি ক্ষুদিরামের অনেক আগেই ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ ইতিহাসে তিনি আজ এক বিস্মৃত নাম। তাঁর নাম মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।
সালটা ছিল ১৮৭১। তখন ব্রিটিশদের শাসন চলছে দাপটের সঙ্গে। কলকাতার টাউন হলের সিঁড়ি দিয়ে একদিন নিচে নামছিলেন প্রধান বিচারপতি জন প্যাক্সটন নরম্যান। এই নরম্যান ছিলেন সেই বিচারক, যিনি ব্রিটিশবিরোধী সব বিপ্লবীদের ধরপাকড় আর ফাঁসির আদেশে ছিলেন কুখ্যাত। সাধারণ মানুষ তাঁকে বাঘের মতো ভয় পেত। সেই সিঁড়ির অন্ধকার কোণেই ওত পেতে ছিলেন যুবক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। বিচারক নরম্যান যেই সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছালেন, আব্দুল্লাহ চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হাতে ছিল একটি ধারালো ছুরি। বিচারক কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি একের পর এক আঘাত করলেন। ব্রিটিশ রাজের প্রধান বিচারক মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং পরে মারা গেলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে বসে একাই এক যুবক ব্রিটিশ বিচারককে খতম করেছেন—এ খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো ভারতজুড়ে।
সবাই যখন অবাক, তখন ব্রিটিশরা খুব চতুরতার সঙ্গে এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল। তারা প্রচার করল, আব্দুল্লাহ নাকি একজন ‘উন্মাদ’ বা ‘ধর্মান্ধ’। কারণ তারা কোনোভাবেই চায়নি মানুষ জানুক যে, ব্রিটিশদের আইনের বিরুদ্ধে একজন সাধারণ মুসলমান যুবকও রুখে দাঁড়াতে পারেন। বিচারে আব্দুল্লাহকে ফাঁসি দেওয়া হলো। শুধু তাই নয়, তাঁর মৃতদেহ পরিবারের হাতে না দিয়ে জেলের ভেতর পুড়িয়ে দেওয়া হলো, যেন তাঁর কোনো চিহ্নই এই পৃথিবীতে না থাকে।
আচ্ছা, আমরা কেন তাঁকে চিনি না? কেন আমাদের ইতিহাসের বইতে ক্ষুদিরামদের নাম থাকে কিন্তু আব্দুল্লাহর নাম থাকে না? এর পেছনে একটা বড় কারণ হলো ইতিহাসের রাজনীতি। ব্রিটিশরা চেয়েছিল আমাদের মনে গেঁথে দিতে যে, স্বাধীনতার লড়াই শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কাজ। আর স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও আমরা সেই পুরনো ঢঙেই ইতিহাস লিখেছি। সেখানে মুসলিম বিপ্লবীদের অবদানকে প্রায়ই 'সাম্প্রদায়িক' বা 'বিচ্ছিন্ন' ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের শেখানো হয়েছে, আধুনিক ভাষা বা পশ্চিমা আদর্শ ছাড়া বিদ্রোহ হয় না। কিন্তু আব্দুল্লাহ তো সাধারণ কৃষক বা শ্রমিকের ভাষায় প্রতিবাদ করেছিলেন, যা তথাকথিত শিক্ষিত মহলে হয়তো বেমানান ছিল।
ভাবুন তো, ব্রিটিশ আদালত যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন তিনি এই কাজ করলেন? তিনি কোনো বড় কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা দেননি। তিনি হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, ‘আমার ভাইকে ফাঁসি দিয়েছ, আমার মানুষকে নির্যাতন করেছ, তাই আমি প্রতিশোধ নিয়েছি।’ কিন্তু ব্রিটিশরা সেই কথাকে ‘অসংলগ্ন’ বলে প্রচার করেছিল। আর আমরাও সেই মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি যুগের পর যুগ।
ইতিহাস আসলে আমাদের সবাইকে সমান চোখে দেখে না। ইতিহাস সব সময় তাদেরই গল্প বলে, যারা জয়ী হয়েছে বা যাদের কথা বলার মতো শক্তি ছিল। কিন্তু একজন মুসলিম যুবক, যিনি একা হাতে ব্রিটিশ বিচারকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁর দেশপ্রেম কি ক্ষুদিরামের চেয়ে কম ছিল? অবশ্যই না। স্বাধীনতার লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা বর্ণের মানুষের একার গল্প নয়। এটি হিন্দু, মুসলিম, দলিত, আদিবাসী—সবার সম্মিলিত ত্যাগের গল্প।
আজ সময় এসেছে আমাদের সেই ভুল ভাঙার। ইতিহাস কোনো গৎবাঁধা দলিল নয় যে, যা লেখা আছে তা-ই ধ্রুব সত্য। সময় এসেছে ইতিহাসের ধুলো পরিষ্কার করার। আমাদের উচিত সব বীরকে সমান মর্যাদা দেওয়া। পাঠ্যবইয়ে শুধু একটি ফুটনোট হিসেবে নয়, বরং মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মতো বীরদের পূর্ণাঙ্গ জীবনী নিয়ে আলোচনার সময় এসেছে। কারণ, যে দেশ তার বীরদের সম্মান করতে জানে না, সেই দেশ কখনোই নিজের শেকড় খুঁজে পায় না।মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সেই ছুরি কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য চলেনি, তা চলেছিল সাম্রাজ্যবাদের অন্যায়ের বুকের ওপর। আমরা কি আজ অন্তত একবার সেই বিস্মৃত বীরের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে পারি না?
2.png)
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
আমাদের ছোটবেলার পাঠ্যবই বা জাতীয় দিবসগুলোর গল্পে বীরদের অভাব নেই। আমরা সবাই জানি ক্ষুদিরাম বসুর কথা, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই কালজয়ী গানের কথা। ক্ষুদিরাম আমাদের অহংকার, আমাদের প্রেরণা। কিন্তু আজ আপনাদের এমন একজনের গল্প শোনাব, যিনি ক্ষুদিরামের অনেক আগেই ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ ইতিহাসে তিনি আজ এক বিস্মৃত নাম। তাঁর নাম মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।
সালটা ছিল ১৮৭১। তখন ব্রিটিশদের শাসন চলছে দাপটের সঙ্গে। কলকাতার টাউন হলের সিঁড়ি দিয়ে একদিন নিচে নামছিলেন প্রধান বিচারপতি জন প্যাক্সটন নরম্যান। এই নরম্যান ছিলেন সেই বিচারক, যিনি ব্রিটিশবিরোধী সব বিপ্লবীদের ধরপাকড় আর ফাঁসির আদেশে ছিলেন কুখ্যাত। সাধারণ মানুষ তাঁকে বাঘের মতো ভয় পেত। সেই সিঁড়ির অন্ধকার কোণেই ওত পেতে ছিলেন যুবক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। বিচারক নরম্যান যেই সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছালেন, আব্দুল্লাহ চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হাতে ছিল একটি ধারালো ছুরি। বিচারক কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি একের পর এক আঘাত করলেন। ব্রিটিশ রাজের প্রধান বিচারক মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং পরে মারা গেলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে বসে একাই এক যুবক ব্রিটিশ বিচারককে খতম করেছেন—এ খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো ভারতজুড়ে।
সবাই যখন অবাক, তখন ব্রিটিশরা খুব চতুরতার সঙ্গে এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল। তারা প্রচার করল, আব্দুল্লাহ নাকি একজন ‘উন্মাদ’ বা ‘ধর্মান্ধ’। কারণ তারা কোনোভাবেই চায়নি মানুষ জানুক যে, ব্রিটিশদের আইনের বিরুদ্ধে একজন সাধারণ মুসলমান যুবকও রুখে দাঁড়াতে পারেন। বিচারে আব্দুল্লাহকে ফাঁসি দেওয়া হলো। শুধু তাই নয়, তাঁর মৃতদেহ পরিবারের হাতে না দিয়ে জেলের ভেতর পুড়িয়ে দেওয়া হলো, যেন তাঁর কোনো চিহ্নই এই পৃথিবীতে না থাকে।
আচ্ছা, আমরা কেন তাঁকে চিনি না? কেন আমাদের ইতিহাসের বইতে ক্ষুদিরামদের নাম থাকে কিন্তু আব্দুল্লাহর নাম থাকে না? এর পেছনে একটা বড় কারণ হলো ইতিহাসের রাজনীতি। ব্রিটিশরা চেয়েছিল আমাদের মনে গেঁথে দিতে যে, স্বাধীনতার লড়াই শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কাজ। আর স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও আমরা সেই পুরনো ঢঙেই ইতিহাস লিখেছি। সেখানে মুসলিম বিপ্লবীদের অবদানকে প্রায়ই 'সাম্প্রদায়িক' বা 'বিচ্ছিন্ন' ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের শেখানো হয়েছে, আধুনিক ভাষা বা পশ্চিমা আদর্শ ছাড়া বিদ্রোহ হয় না। কিন্তু আব্দুল্লাহ তো সাধারণ কৃষক বা শ্রমিকের ভাষায় প্রতিবাদ করেছিলেন, যা তথাকথিত শিক্ষিত মহলে হয়তো বেমানান ছিল।
ভাবুন তো, ব্রিটিশ আদালত যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন তিনি এই কাজ করলেন? তিনি কোনো বড় কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা দেননি। তিনি হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, ‘আমার ভাইকে ফাঁসি দিয়েছ, আমার মানুষকে নির্যাতন করেছ, তাই আমি প্রতিশোধ নিয়েছি।’ কিন্তু ব্রিটিশরা সেই কথাকে ‘অসংলগ্ন’ বলে প্রচার করেছিল। আর আমরাও সেই মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি যুগের পর যুগ।
ইতিহাস আসলে আমাদের সবাইকে সমান চোখে দেখে না। ইতিহাস সব সময় তাদেরই গল্প বলে, যারা জয়ী হয়েছে বা যাদের কথা বলার মতো শক্তি ছিল। কিন্তু একজন মুসলিম যুবক, যিনি একা হাতে ব্রিটিশ বিচারকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁর দেশপ্রেম কি ক্ষুদিরামের চেয়ে কম ছিল? অবশ্যই না। স্বাধীনতার লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা বর্ণের মানুষের একার গল্প নয়। এটি হিন্দু, মুসলিম, দলিত, আদিবাসী—সবার সম্মিলিত ত্যাগের গল্প।
আজ সময় এসেছে আমাদের সেই ভুল ভাঙার। ইতিহাস কোনো গৎবাঁধা দলিল নয় যে, যা লেখা আছে তা-ই ধ্রুব সত্য। সময় এসেছে ইতিহাসের ধুলো পরিষ্কার করার। আমাদের উচিত সব বীরকে সমান মর্যাদা দেওয়া। পাঠ্যবইয়ে শুধু একটি ফুটনোট হিসেবে নয়, বরং মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মতো বীরদের পূর্ণাঙ্গ জীবনী নিয়ে আলোচনার সময় এসেছে। কারণ, যে দেশ তার বীরদের সম্মান করতে জানে না, সেই দেশ কখনোই নিজের শেকড় খুঁজে পায় না।মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সেই ছুরি কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য চলেনি, তা চলেছিল সাম্রাজ্যবাদের অন্যায়ের বুকের ওপর। আমরা কি আজ অন্তত একবার সেই বিস্মৃত বীরের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে পারি না?
2.png)