মতামত
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের পার্কে গত শুক্রবারের একটি দৃশ্য আমাদের নগরজীবনের এক রূঢ় ও পীড়াদায়ক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। চার বছর বয়সী শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অভিভাবকের চোখেমুখে যে শঙ্কা, অস্বস্তি এবং নিরাপত্তার চরম হীনম্মন্যতা ফুটে উঠেছিল, তা কেবল একজনের ব্যক্তিগত ভীতি নয়; বরং এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত মানসিক বিপর্যস্ততার একটি প্রতিচ্ছবি।
সাম্প্রতিক ‘রামিসা হত্যাকাণ্ড’ দেশজুড়ে যে নৃশংসতার বার্তা দিয়েছে, তা কেবল একটি পরিবারকে নিঃস্ব করেনি, বরং সমাজতাত্ত্বিকভাবে এক গভীর ‘কালেক্টিভ ট্রমা’ বা সামাজিক ট্রমার সৃষ্টি করেছে। যখন একটি শিশু কোনো অপরাধের শিকার হয় , তখন তা প্রতিটি অভিভাবকের মনে এমন এক অদৃশ্য আতঙ্কের জন্ম দেয়, যা তার নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিন্তা ভাবনা আর জীবনধারাকে ব্যহত। মোহাম্মদপুরের ওই পার্কের ঘটনাটি তারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র। নিজের সন্তানকে কোল থেকে নামাতে ভয় পাওয়া কিংবা অন্যান্য শিশুদের দিকে তাকিয়ে বারংবার রামিসার স্মৃতি রোমন্থন—এগুলো কেবল আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা ‘হাইপার-ভিজিল্যান্স’ বা অতি-সতর্কতার কবলে পড়েন। বাস্তব ঝুঁকির সীমানা পেরিয়ে তারা তখন প্রতিটি মুহূর্তকে সম্ভাব্য বিপদের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। এর ফলে খেলার মাঠ, স্কুল কিংবা সামাজিক পরিসরগুলো আর নিরাপদ মনে হয় না। শিশু তার স্বাভাবিক শৈশব ও বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, আর অভিভাবক নিমজ্জিত হন এক অবর্ণনীয় মানসিক চাপের সাগরে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রামিসার মতো ঘটনাগুলো কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতির সূচক নয়, এগুলো নাগরিক আস্থার ভিতকেও দুর্বল করে দেয়। একটি শিশু যখন তার নিজের পাড়ায় বা পরিবেশে নিরাপদ বোধ করে না, তখন পুরো নগর সভ্যতার নৈতিক ও সামাজিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমরা এমন এক নগরে বাস করছি, যেখানে প্রতিটি শিশুর অভিভাবকদের চোখে মুখে থাকে এক অদৃশ্য আতঙ্ক ।
এই আতঙ্ক দিনে দিনে হয়ে উঠছে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংকট। এই পরিস্থিতি উত্তরণে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিশুনির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ও দ্রুত বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি।
যে সমাজে শিশুরা তাদের খেলার মাঠের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে এবং অভিভাবকরা প্রতিটি পদক্ষেপে ভীতির সম্মুখীন হন, সেই সমাজ কখনোই তার সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশের পথ খুঁজে পেতে পারে না। রামিসার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, কেবল আইন দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, বরং একটি মানবিক ও সচেতন সমাজব্যবস্থাই পারে শিশুদের জন্য ভীতিহীন একটি পরিবেশ উপহার দিতে। জনগণের এই উঠকন্ঠা যেন রাষ্ট্র ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে—তারা যেন শিশুদের একটি নিরাপদ আগামীর প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ না হয়।
বিষয় : জাতীয়
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের পার্কে গত শুক্রবারের একটি দৃশ্য আমাদের নগরজীবনের এক রূঢ় ও পীড়াদায়ক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। চার বছর বয়সী শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অভিভাবকের চোখেমুখে যে শঙ্কা, অস্বস্তি এবং নিরাপত্তার চরম হীনম্মন্যতা ফুটে উঠেছিল, তা কেবল একজনের ব্যক্তিগত ভীতি নয়; বরং এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত মানসিক বিপর্যস্ততার একটি প্রতিচ্ছবি।
সাম্প্রতিক ‘রামিসা হত্যাকাণ্ড’ দেশজুড়ে যে নৃশংসতার বার্তা দিয়েছে, তা কেবল একটি পরিবারকে নিঃস্ব করেনি, বরং সমাজতাত্ত্বিকভাবে এক গভীর ‘কালেক্টিভ ট্রমা’ বা সামাজিক ট্রমার সৃষ্টি করেছে। যখন একটি শিশু কোনো অপরাধের শিকার হয় , তখন তা প্রতিটি অভিভাবকের মনে এমন এক অদৃশ্য আতঙ্কের জন্ম দেয়, যা তার নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিন্তা ভাবনা আর জীবনধারাকে ব্যহত। মোহাম্মদপুরের ওই পার্কের ঘটনাটি তারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র। নিজের সন্তানকে কোল থেকে নামাতে ভয় পাওয়া কিংবা অন্যান্য শিশুদের দিকে তাকিয়ে বারংবার রামিসার স্মৃতি রোমন্থন—এগুলো কেবল আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা ‘হাইপার-ভিজিল্যান্স’ বা অতি-সতর্কতার কবলে পড়েন। বাস্তব ঝুঁকির সীমানা পেরিয়ে তারা তখন প্রতিটি মুহূর্তকে সম্ভাব্য বিপদের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। এর ফলে খেলার মাঠ, স্কুল কিংবা সামাজিক পরিসরগুলো আর নিরাপদ মনে হয় না। শিশু তার স্বাভাবিক শৈশব ও বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, আর অভিভাবক নিমজ্জিত হন এক অবর্ণনীয় মানসিক চাপের সাগরে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রামিসার মতো ঘটনাগুলো কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতির সূচক নয়, এগুলো নাগরিক আস্থার ভিতকেও দুর্বল করে দেয়। একটি শিশু যখন তার নিজের পাড়ায় বা পরিবেশে নিরাপদ বোধ করে না, তখন পুরো নগর সভ্যতার নৈতিক ও সামাজিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমরা এমন এক নগরে বাস করছি, যেখানে প্রতিটি শিশুর অভিভাবকদের চোখে মুখে থাকে এক অদৃশ্য আতঙ্ক ।
এই আতঙ্ক দিনে দিনে হয়ে উঠছে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংকট। এই পরিস্থিতি উত্তরণে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিশুনির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ও দ্রুত বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি।
যে সমাজে শিশুরা তাদের খেলার মাঠের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে এবং অভিভাবকরা প্রতিটি পদক্ষেপে ভীতির সম্মুখীন হন, সেই সমাজ কখনোই তার সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশের পথ খুঁজে পেতে পারে না। রামিসার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, কেবল আইন দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, বরং একটি মানবিক ও সচেতন সমাজব্যবস্থাই পারে শিশুদের জন্য ভীতিহীন একটি পরিবেশ উপহার দিতে। জনগণের এই উঠকন্ঠা যেন রাষ্ট্র ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে—তারা যেন শিশুদের একটি নিরাপদ আগামীর প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ না হয়।
2.png)