টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং প্রায় ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জেলা (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) এবং সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ মোট ৫৯টি উপজেলা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।
শনিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৪, যা রবিবার বেড়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে। জেলাভিত্তিক মৃতের সংখ্যা হলো—কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জন।
মানুষের দুর্ভোগ: ‘চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই’
বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের চিত্র ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের একজন জানান, ঘরের মেঝে পানির নিচে থাকায় পাঁচ দিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। ছয় সন্তান নিয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো মাচায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় ভাষায় তার আক্ষেপ, "চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই। বইন্যার পানি হত্তে নামিব, ন জানি।"
একই এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুকের ৩০ বছরের পুরোনো মাটির ঘরটি মঙ্গলবার রাতে ধসে পড়েছে। তিনি বলেন, “তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।”
অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম অঞ্চল: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ জনপদ কার্যত অবরুদ্ধ। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
পার্বত্য জেলা: বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও বিধ্বস্ত সড়ক ও ধসে পড়া সেতুর কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ফিরতে শুরু করলেও অধিকাংশেরই বাড়িঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সিলেট ও অন্যান্য জেলা: হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে এখনো দুই থেকে আড়াই ফুট পানি রয়েছে। মৌলভীবাজারের ৫টি উপজেলা বন্যায় আক্রান্ত। এছাড়া সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম ও যশোরেও নদ-নদীর পানি বেড়ে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কতা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করছে।
প্রশাসন ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার তৎপরতা চলমান রয়েছে, তবে দুর্গম অনেক এলাকায় এখনো সহায়তা পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।
2.png)
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং প্রায় ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জেলা (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) এবং সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ মোট ৫৯টি উপজেলা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।
শনিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৪, যা রবিবার বেড়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে। জেলাভিত্তিক মৃতের সংখ্যা হলো—কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জন।
মানুষের দুর্ভোগ: ‘চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই’
বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের চিত্র ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের একজন জানান, ঘরের মেঝে পানির নিচে থাকায় পাঁচ দিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। ছয় সন্তান নিয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো মাচায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় ভাষায় তার আক্ষেপ, "চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই। বইন্যার পানি হত্তে নামিব, ন জানি।"
একই এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুকের ৩০ বছরের পুরোনো মাটির ঘরটি মঙ্গলবার রাতে ধসে পড়েছে। তিনি বলেন, “তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।”
অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম অঞ্চল: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ জনপদ কার্যত অবরুদ্ধ। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
পার্বত্য জেলা: বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও বিধ্বস্ত সড়ক ও ধসে পড়া সেতুর কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ফিরতে শুরু করলেও অধিকাংশেরই বাড়িঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সিলেট ও অন্যান্য জেলা: হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে এখনো দুই থেকে আড়াই ফুট পানি রয়েছে। মৌলভীবাজারের ৫টি উপজেলা বন্যায় আক্রান্ত। এছাড়া সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম ও যশোরেও নদ-নদীর পানি বেড়ে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কতা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করছে।
প্রশাসন ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার তৎপরতা চলমান রয়েছে, তবে দুর্গম অনেক এলাকায় এখনো সহায়তা পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।
2.png)