সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

  বানিজ্য বানিজ্য

এক লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলকে পূবালী ব্যাংক

দেশের বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ও সরকারি-বেসরকারি মিলে পঞ্চম ব্যাংক হিসেবে এই অর্জনে নাম লেখালো পূবালী। মাত্র সাড়ে তিন বছরে আমানত দ্বিগুণ করে ব্যাংকিং খাতে আস্থার নতুন ভিত্তি গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এক লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলকে পূবালী ব্যাংক
ছবি -সংগৃহীত

টানা সাড়ে ছয় দশকের পথচলায় দেশের ব্যাংকিং খাতে এক নতুন ইতিহাস গড়েছে পূবালী ব্যাংক। প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ব্যাংক হিসেবে এই অভিজাত মাইলফলক স্পর্শ করল প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার আমানত ক্লাবের সদস্য পাঁচটি ব্যাংক—সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও সর্বশেষ পূবালী ব্যাংক।

গত সপ্তাহ শেষে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকায়। ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকভাবে করপোরেট সুশাসন ও গ্রাহকসেবায় আধুনিকায়নের ফলেই এই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

সাড়ে তিন বছরেই দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি 

পূবালী ব্যাংকের এই সাফল্যের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তাদের দ্রুত প্রবৃদ্ধি। ২০২২ সালের শেষে ব্যাংকটির আমানতের স্থিতি ছিল ৫১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৬৩ বছরে ব্যাংকটি যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করেছিল, তার প্রায় সমপরিমাণ নতুন আমানত এসেছে মাত্র গত সাড়ে তিন বছরে। ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর শেষে আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

পূবালী ব্যাংকের আজকের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫৯ সালে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর এটি জাতীয়করণ করা হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে ঋণ অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংকটির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ১৯৮৪ সালে মাত্র ১৬ কোটি টাকার বিনিময়ে ব্যাংকটিকে পুনরায় বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়। সেই থেকেই শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, মানবসম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং কঠোর করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে ব্যাংকটিকে দেশের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।

আর্থিক সূচকে শক্ত অবস্থান

আমানতের মাইলফলকের পাশাপাশি অন্যান্য সূচকেও পূবালী ব্যাংক ঈর্ষণীয় দক্ষতা দেখাচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার যখন গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, তখন পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ। গত বছর ব্যাংকটি ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; গত বছর প্রায় ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি ও ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার আমদানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

ভৌত কাঠামোর বাইরে ডিজিটাল সেবায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে পূবালী ব্যাংক। ৫১৯টি শাখা ও ২৯০টি উপশাখার পাশাপাশি ব্যাংকটির নিজস্ব অ্যাপ ‘পাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ এর ব্যবহারকারী সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এ ছাড়া ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট পিওএস ও দেড় লাখ ‘বাংলা কিউআর’ কোডের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেনে ব্যাংকটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই অর্জনের বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দেশজুড়ে আমাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকেরা ঘরে বসেই ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। আমানতের এই বিশাল প্রবৃদ্ধি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। নতুন প্রজন্ম এখন ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আর আমরা সেই চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ ও সহজ সেবা নিশ্চিত করছি।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে একটি ব্যাংকের এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো এবং মাইলফলক স্পর্শ করা দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই ইতিবাচক বার্তা। গ্রাহক আস্থাকে পুঁজি করে পূবালী ব্যাংক আগামীর পথে আরও টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

বিষয় : পূবালী ব্যাংক এক লাখ কোটি টাকার আমানত

কাল মহাকাল

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬


এক লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলকে পূবালী ব্যাংক

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬

featured Image

টানা সাড়ে ছয় দশকের পথচলায় দেশের ব্যাংকিং খাতে এক নতুন ইতিহাস গড়েছে পূবালী ব্যাংক। প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ব্যাংক হিসেবে এই অভিজাত মাইলফলক স্পর্শ করল প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার আমানত ক্লাবের সদস্য পাঁচটি ব্যাংক—সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও সর্বশেষ পূবালী ব্যাংক।

গত সপ্তাহ শেষে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকায়। ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকভাবে করপোরেট সুশাসন ও গ্রাহকসেবায় আধুনিকায়নের ফলেই এই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

সাড়ে তিন বছরেই দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি 

পূবালী ব্যাংকের এই সাফল্যের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তাদের দ্রুত প্রবৃদ্ধি। ২০২২ সালের শেষে ব্যাংকটির আমানতের স্থিতি ছিল ৫১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৬৩ বছরে ব্যাংকটি যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করেছিল, তার প্রায় সমপরিমাণ নতুন আমানত এসেছে মাত্র গত সাড়ে তিন বছরে। ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর শেষে আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

পূবালী ব্যাংকের আজকের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫৯ সালে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর এটি জাতীয়করণ করা হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে ঋণ অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংকটির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ১৯৮৪ সালে মাত্র ১৬ কোটি টাকার বিনিময়ে ব্যাংকটিকে পুনরায় বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়। সেই থেকেই শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, মানবসম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং কঠোর করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে ব্যাংকটিকে দেশের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।

আর্থিক সূচকে শক্ত অবস্থান

আমানতের মাইলফলকের পাশাপাশি অন্যান্য সূচকেও পূবালী ব্যাংক ঈর্ষণীয় দক্ষতা দেখাচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার যখন গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, তখন পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ। গত বছর ব্যাংকটি ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; গত বছর প্রায় ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি ও ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার আমদানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

ভৌত কাঠামোর বাইরে ডিজিটাল সেবায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে পূবালী ব্যাংক। ৫১৯টি শাখা ও ২৯০টি উপশাখার পাশাপাশি ব্যাংকটির নিজস্ব অ্যাপ ‘পাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ এর ব্যবহারকারী সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এ ছাড়া ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট পিওএস ও দেড় লাখ ‘বাংলা কিউআর’ কোডের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেনে ব্যাংকটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই অর্জনের বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দেশজুড়ে আমাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকেরা ঘরে বসেই ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। আমানতের এই বিশাল প্রবৃদ্ধি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। নতুন প্রজন্ম এখন ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আর আমরা সেই চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ ও সহজ সেবা নিশ্চিত করছি।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে একটি ব্যাংকের এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো এবং মাইলফলক স্পর্শ করা দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই ইতিবাচক বার্তা। গ্রাহক আস্থাকে পুঁজি করে পূবালী ব্যাংক আগামীর পথে আরও টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত