মতামত
ইতিহাসে এমন কিছু জাতি আছে, যাদের শক্তি কেবল সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাদের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সভ্যতার স্মৃতি, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায়। পারস্য—আজকের ইরান—সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই ভূখণ্ড আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক শক্তি।
ইরানের সমর্থকদের কাছে দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মমর্যাদাবোধ। তাদের বিশ্বাস, বহিরাগত চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা—কোনোটিই ইরানকে তার মৌলিক অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। সমালোচকেরা এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত না হলেও এটুকু অস্বীকার করা কঠিন যে, গত চার দশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইরান একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
এই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে আয়াতুল্লাহ খোমেনির রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি নতুন আদর্শিক অধ্যায়ের সূচনা। সেই বিপ্লবের পর থেকে ইরানকে ঘিরে সমর্থন ও বিরোধিতা—উভয়ই সমানভাবে তীব্র হয়েছে।
খোমেনির মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান ঘটিয়েছে—এমনটি বলা কঠিন। ইতিহাসে বহু নেতার মতোই মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকার নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে খোমেনিকে ঘিরে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্ভবত একক পরাশক্তির বিশ্ব থাকবে না। বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আদর্শিক রাজনীতির প্রশ্নে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেই পারে।
তবে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা আজ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের আদালত আবেগ নয়, দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, অর্জন, ব্যর্থতা এবং মানবিক প্রভাবের সমন্বিত বিচার করে রায় দেয়। তাই আয়াতুল্লাহ খোমেনির উত্তরাধিকারও আগামী প্রজন্ম নতুন প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করবে।
একটি বিষয় অবশ্যই স্পষ্ট—ইরানকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কঠিন। আর খোমেনিকে বাদ দিয়ে আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব। তিনি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে কী পরিচয়ে স্মরণীয় হবেন, তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে সময়। তবে এতটুকু বলা যায়, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আগামী বহু বছর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূরাজনীতি এবং রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েই থাকবে।
বিষয় : ইরান আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী
2.png)
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
ইতিহাসে এমন কিছু জাতি আছে, যাদের শক্তি কেবল সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাদের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সভ্যতার স্মৃতি, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায়। পারস্য—আজকের ইরান—সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই ভূখণ্ড আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক শক্তি।
ইরানের সমর্থকদের কাছে দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মমর্যাদাবোধ। তাদের বিশ্বাস, বহিরাগত চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা—কোনোটিই ইরানকে তার মৌলিক অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। সমালোচকেরা এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত না হলেও এটুকু অস্বীকার করা কঠিন যে, গত চার দশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইরান একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
এই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে আয়াতুল্লাহ খোমেনির রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি নতুন আদর্শিক অধ্যায়ের সূচনা। সেই বিপ্লবের পর থেকে ইরানকে ঘিরে সমর্থন ও বিরোধিতা—উভয়ই সমানভাবে তীব্র হয়েছে।
খোমেনির মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান ঘটিয়েছে—এমনটি বলা কঠিন। ইতিহাসে বহু নেতার মতোই মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকার নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে খোমেনিকে ঘিরে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্ভবত একক পরাশক্তির বিশ্ব থাকবে না। বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আদর্শিক রাজনীতির প্রশ্নে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেই পারে।
তবে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা আজ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের আদালত আবেগ নয়, দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, অর্জন, ব্যর্থতা এবং মানবিক প্রভাবের সমন্বিত বিচার করে রায় দেয়। তাই আয়াতুল্লাহ খোমেনির উত্তরাধিকারও আগামী প্রজন্ম নতুন প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করবে।
একটি বিষয় অবশ্যই স্পষ্ট—ইরানকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কঠিন। আর খোমেনিকে বাদ দিয়ে আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব। তিনি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে কী পরিচয়ে স্মরণীয় হবেন, তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে সময়। তবে এতটুকু বলা যায়, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আগামী বহু বছর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূরাজনীতি এবং রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েই থাকবে।
2.png)