মতামত
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলের আলোচনায় এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ ব্যবস্থা। মিয়ানমার হয়ে সরাসরি চীনের সঙ্গে সড়কপথের করিডোর গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাটি নতুন নয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন রুট খোলা হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পুরো বাণিজ্যিক মানচিত্র বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমানে ভারত বা চীনের সাথে বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হলো সমুদ্রপথ বা আকাশপথ। সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে। চীন বর্তমানে বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা কারখানার কেন্দ্র। সেখান থেকে সরাসরি কাঁচামাল আমদানি করলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাতগুলো বড় ধরনের সুবিধা পাবে।
পর্যটন ও চিকিৎসাক্ষেত্রের কথা বললে, ভারতের ওপর বাংলাদেশের মানুষের নির্ভরশীলতা ঐতিহাসিক। তবে চীন যদি চিকিৎসা ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। মানুষ সবসময় সাশ্রয়ী ও উন্নত মানের সেবার সন্ধানে থাকে। ফলে বাজারের এই পরিবর্তন ভারতের ব্যবসায়িক আধিপত্যে প্রভাব ফেলবে কি না—তা সময় ও প্রতিযোগিতার মানদণ্ডই বলে দেবে। তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই ‘প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক বহুমুখীকরণ’ বা ডাইভারসিফিকেশনের ওপর জোর দেয়, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে না হয়।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের অবস্থান
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশগুলো নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়। ভারতের ভিসা নীতি বা সাম্প্রতিক নড়াচড়া কেবল কোনো একক করিডোরের ভয়ে ঘটছে—এমনটা ভাবা হয়তো পুরো পরিস্থিতির সরলীকরণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটি বাড়ানোর উদ্যোগে ভারতের উদ্বেগ বা অস্বস্তি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ এটি তাদের প্রভাববলয়কে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। তবে আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো দেশই এককভাবে সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ যদি তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘কানেক্টিভিটি হাব’ বা যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, তবে তা জাতীয় স্বার্থেই সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।
বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ
সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি এখানে আলোচনায় আসা প্রয়োজন, তা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থা। কোনো করিডোর বা সড়কপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা এই প্রকল্পের প্রধান অন্তরায়। এছাড়া ভৌগোলিক ও পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণ এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল কাজ। এর পাশাপাশি চীন ও ভারতের মধ্যে চলমান আঞ্চলিক স্নায়ুযুদ্ধ বা প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করবে, সেটিই হবে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
পরিশেষে, কোনো একটি বিশেষ পথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বা নতুন নতুন বিকল্প খুঁজে বের করা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। সরাসরি চীনের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
বিষয় : বাংলাদেশ মায়ানমার চীন করিডোর
2.png)
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলের আলোচনায় এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ ব্যবস্থা। মিয়ানমার হয়ে সরাসরি চীনের সঙ্গে সড়কপথের করিডোর গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাটি নতুন নয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন রুট খোলা হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পুরো বাণিজ্যিক মানচিত্র বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমানে ভারত বা চীনের সাথে বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হলো সমুদ্রপথ বা আকাশপথ। সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে। চীন বর্তমানে বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা কারখানার কেন্দ্র। সেখান থেকে সরাসরি কাঁচামাল আমদানি করলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাতগুলো বড় ধরনের সুবিধা পাবে।
পর্যটন ও চিকিৎসাক্ষেত্রের কথা বললে, ভারতের ওপর বাংলাদেশের মানুষের নির্ভরশীলতা ঐতিহাসিক। তবে চীন যদি চিকিৎসা ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। মানুষ সবসময় সাশ্রয়ী ও উন্নত মানের সেবার সন্ধানে থাকে। ফলে বাজারের এই পরিবর্তন ভারতের ব্যবসায়িক আধিপত্যে প্রভাব ফেলবে কি না—তা সময় ও প্রতিযোগিতার মানদণ্ডই বলে দেবে। তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই ‘প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক বহুমুখীকরণ’ বা ডাইভারসিফিকেশনের ওপর জোর দেয়, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে না হয়।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের অবস্থান
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশগুলো নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়। ভারতের ভিসা নীতি বা সাম্প্রতিক নড়াচড়া কেবল কোনো একক করিডোরের ভয়ে ঘটছে—এমনটা ভাবা হয়তো পুরো পরিস্থিতির সরলীকরণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটি বাড়ানোর উদ্যোগে ভারতের উদ্বেগ বা অস্বস্তি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ এটি তাদের প্রভাববলয়কে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। তবে আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো দেশই এককভাবে সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ যদি তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘কানেক্টিভিটি হাব’ বা যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, তবে তা জাতীয় স্বার্থেই সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।
বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ
সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি এখানে আলোচনায় আসা প্রয়োজন, তা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থা। কোনো করিডোর বা সড়কপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা এই প্রকল্পের প্রধান অন্তরায়। এছাড়া ভৌগোলিক ও পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণ এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল কাজ। এর পাশাপাশি চীন ও ভারতের মধ্যে চলমান আঞ্চলিক স্নায়ুযুদ্ধ বা প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করবে, সেটিই হবে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
পরিশেষে, কোনো একটি বিশেষ পথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বা নতুন নতুন বিকল্প খুঁজে বের করা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। সরাসরি চীনের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
2.png)