আন্তর্জাতিক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরানের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক ও হাইপারসোনিক অস্ত্র কতটা কার্যকর, তা এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। দুই দেশের সম্পর্ক নতুন নয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংগ্রহ শুরু করেছিল তেহরান। পরবর্তী সময়ে সেই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ইরান নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প গড়ে তোলে। গবেষণায় দেখা যায়, শাহাব-১ ও শাহাব-২-এর মতো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে উত্তর কোরিয়ার স্কাড প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। পরে শাহাব-৩-সহ আরও উন্নত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দুই দেশের প্রযুক্তিগত যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে ইরানের বর্তমান হাইপারসোনিক সক্ষমতাকে সরাসরি উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তির ফল হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে ইরান ‘ফাত্তাহ’ নামে যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে আনে, তেহরানের দাবি অনুযায়ী সেটির গতি ছিল প্রায় ম্যাক ১৩ থেকে ১৫ এবং পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। ইরান এটিকে এমন একটি অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরে, যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এখানেই কার্বন-কার্বন কম্পোজিট প্রযুক্তির প্রসঙ্গ আসে। এই ধরনের উপাদান উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এবং মহাকাশযান ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উচ্চগতির ব্যবস্থায় তাপ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তর কোরিয়া ২০২৫ সালে একটি নতুন হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় কার্বন-ফাইবারভিত্তিক নতুন কম্পোজিট উপাদান ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল। তবে ওই প্রযুক্তি সরাসরি ইরানের ফাত্তাহ ক্ষেপণাস্ত্রে স্থানান্তরিত হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বরং যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে শক্ত প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত, তা হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে তেহরান ও পিয়ংইয়ংয়ের দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা। গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া বিভিন্ন সময়ে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র, উৎপাদন অবকাঠামো, কারিগরি জ্ঞান, যন্ত্রাংশ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। দুই দেশের প্রকৌশলীদের মধ্যে প্রযুক্তিগত যোগাযোগেরও তথ্য রয়েছে।
এই সহযোগিতা অবশ্য একমুখী ছিল না। ইরানও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কিছু প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সরবরাহ করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। ফলে সম্পর্কটিকে শুধু ‘উত্তর কোরিয়া থেকে ইরানের কাছে প্রযুক্তি সরবরাহ’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বরং এটি ছিল দীর্ঘ সময়ের একটি লেনদেনভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি অংশীদারত্ব।
ইরানের সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে এই বিদেশি প্রযুক্তিকে স্থানীয় গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে। তেহরান কয়েক দশকে এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প গড়ে তুলেছে, যেখানে বিদেশি নকশা বা প্রযুক্তির প্রাথমিক ভিত্তি থাকলেও পরবর্তী উন্নয়ন অনেকটাই দেশীয় প্রকৌশল সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণে ইরানের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে শুধু উত্তর কোরিয়ার ‘উপহার’ হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং দীর্ঘদিনের প্রযুক্তি সংগ্রহ, উল্টো প্রকৌশল, নিজস্ব গবেষণা এবং ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মিলিত ফল হিসেবেই এর বিকাশকে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
এর প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যেও স্পষ্ট। ইরানের কাছে শুধু প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নেই; রয়েছে বিভিন্ন পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য চ্যালেঞ্জটি কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশে আটকে দেওয়া নয়। একই সঙ্গে বহু দিক থেকে আসা হামলার সম্ভাবনাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাত সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইরান বিভিন্ন সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। জুলাইয়ে তেহরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে রাডার ব্যবস্থা ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি করেছিল। আবার বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতেও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার কথা জানিয়েছে ইরান। এসব দাবির সবকটির স্বাধীন যাচাই অবশ্য সম্ভব হয়নি।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানের সামরিক কৌশল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্তরভিত্তিক। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে তেহরান।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের আয়রন ডোমকে ঘিরে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটিও পরিবর্তিত হয়েছে। আয়রন ডোম মূলত স্বল্পপাল্লার রকেট মোকাবিলায় কার্যকর একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলকে তাই অ্যারোসহ একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় একক কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির সঙ্গে কৌশলের সমন্বয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র কত দ্রুত উড়তে পারে, সেটিই এখন একমাত্র প্রশ্ন নয়। তার গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা, উৎক্ষেপণের পর শনাক্ত হওয়ার সময়, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহারের কৌশল এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখার মতো ড্রোন ও রকেটের সমন্বয়—সবকিছু মিলিয়েই একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কার্যকারিতা নির্ধারিত হয়।
ইরান-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে নজর থাকবে এই জায়গায়। দুই দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় এবং দুটিরই সামরিক শিল্পে আত্মনির্ভরতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় এবং সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে থাকবে। গবেষণায় দুই দেশের ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতাকে দীর্ঘদিন ধরেই তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তব বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার কার্বন-কার্বন প্রযুক্তিই ইরানের হাইপারসোনিক শক্তির মূল রহস্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। প্রকাশ্য তথ্য বরং দেখায়, ইরানের সামরিক উত্থান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কয়েক দশকের প্রযুক্তি সহযোগিতা সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু বর্তমান ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার পুরো ব্যাখ্যা নয়।
2.png)
রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরানের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক ও হাইপারসোনিক অস্ত্র কতটা কার্যকর, তা এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। দুই দেশের সম্পর্ক নতুন নয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংগ্রহ শুরু করেছিল তেহরান। পরবর্তী সময়ে সেই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ইরান নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প গড়ে তোলে। গবেষণায় দেখা যায়, শাহাব-১ ও শাহাব-২-এর মতো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে উত্তর কোরিয়ার স্কাড প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। পরে শাহাব-৩-সহ আরও উন্নত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দুই দেশের প্রযুক্তিগত যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে ইরানের বর্তমান হাইপারসোনিক সক্ষমতাকে সরাসরি উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তির ফল হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে ইরান ‘ফাত্তাহ’ নামে যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে আনে, তেহরানের দাবি অনুযায়ী সেটির গতি ছিল প্রায় ম্যাক ১৩ থেকে ১৫ এবং পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। ইরান এটিকে এমন একটি অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরে, যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এখানেই কার্বন-কার্বন কম্পোজিট প্রযুক্তির প্রসঙ্গ আসে। এই ধরনের উপাদান উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এবং মহাকাশযান ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উচ্চগতির ব্যবস্থায় তাপ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তর কোরিয়া ২০২৫ সালে একটি নতুন হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় কার্বন-ফাইবারভিত্তিক নতুন কম্পোজিট উপাদান ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল। তবে ওই প্রযুক্তি সরাসরি ইরানের ফাত্তাহ ক্ষেপণাস্ত্রে স্থানান্তরিত হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বরং যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে শক্ত প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত, তা হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে তেহরান ও পিয়ংইয়ংয়ের দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা। গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া বিভিন্ন সময়ে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র, উৎপাদন অবকাঠামো, কারিগরি জ্ঞান, যন্ত্রাংশ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। দুই দেশের প্রকৌশলীদের মধ্যে প্রযুক্তিগত যোগাযোগেরও তথ্য রয়েছে।
এই সহযোগিতা অবশ্য একমুখী ছিল না। ইরানও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কিছু প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সরবরাহ করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। ফলে সম্পর্কটিকে শুধু ‘উত্তর কোরিয়া থেকে ইরানের কাছে প্রযুক্তি সরবরাহ’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বরং এটি ছিল দীর্ঘ সময়ের একটি লেনদেনভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি অংশীদারত্ব।
ইরানের সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে এই বিদেশি প্রযুক্তিকে স্থানীয় গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে। তেহরান কয়েক দশকে এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প গড়ে তুলেছে, যেখানে বিদেশি নকশা বা প্রযুক্তির প্রাথমিক ভিত্তি থাকলেও পরবর্তী উন্নয়ন অনেকটাই দেশীয় প্রকৌশল সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণে ইরানের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে শুধু উত্তর কোরিয়ার ‘উপহার’ হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং দীর্ঘদিনের প্রযুক্তি সংগ্রহ, উল্টো প্রকৌশল, নিজস্ব গবেষণা এবং ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মিলিত ফল হিসেবেই এর বিকাশকে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
এর প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যেও স্পষ্ট। ইরানের কাছে শুধু প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নেই; রয়েছে বিভিন্ন পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য চ্যালেঞ্জটি কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশে আটকে দেওয়া নয়। একই সঙ্গে বহু দিক থেকে আসা হামলার সম্ভাবনাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাত সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইরান বিভিন্ন সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। জুলাইয়ে তেহরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে রাডার ব্যবস্থা ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি করেছিল। আবার বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতেও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার কথা জানিয়েছে ইরান। এসব দাবির সবকটির স্বাধীন যাচাই অবশ্য সম্ভব হয়নি।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানের সামরিক কৌশল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্তরভিত্তিক। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে তেহরান।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের আয়রন ডোমকে ঘিরে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটিও পরিবর্তিত হয়েছে। আয়রন ডোম মূলত স্বল্পপাল্লার রকেট মোকাবিলায় কার্যকর একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলকে তাই অ্যারোসহ একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় একক কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির সঙ্গে কৌশলের সমন্বয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র কত দ্রুত উড়তে পারে, সেটিই এখন একমাত্র প্রশ্ন নয়। তার গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা, উৎক্ষেপণের পর শনাক্ত হওয়ার সময়, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহারের কৌশল এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখার মতো ড্রোন ও রকেটের সমন্বয়—সবকিছু মিলিয়েই একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কার্যকারিতা নির্ধারিত হয়।
ইরান-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে নজর থাকবে এই জায়গায়। দুই দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় এবং দুটিরই সামরিক শিল্পে আত্মনির্ভরতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় এবং সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে থাকবে। গবেষণায় দুই দেশের ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতাকে দীর্ঘদিন ধরেই তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তব বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার কার্বন-কার্বন প্রযুক্তিই ইরানের হাইপারসোনিক শক্তির মূল রহস্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। প্রকাশ্য তথ্য বরং দেখায়, ইরানের সামরিক উত্থান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কয়েক দশকের প্রযুক্তি সহযোগিতা সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু বর্তমান ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার পুরো ব্যাখ্যা নয়।
2.png)