মতামতমতামত

জ্বালানি সংকট কাটাতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের

জিয়া উদ্দিন জয়
জিয়া উদ্দিন জয়
জ্বালানি সংকট কাটাতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
ছবি-সংগৃহিত

জ্বালানি সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে হলে সাময়িকভাবে আমদানি বাড়ানোর বদলে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।

দেশের জ্বালানি খাতের বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে আমদানিনির্ভরতা। বর্তমানে খাতটির প্রায় ৬০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট—যেকোনো একটি কারণেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় নিয়মিত গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছেন অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। তাঁর মতে, গ্যাসের সম্ভাবনা যাচাই করে ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান চালানো দরকার। কোনো একটি প্রকল্প বা মেয়াদভিত্তিক উদ্যোগের মধ্যে অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানি করা এলএনজির ওপর চাপ কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে দেশের গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া শুধু আমদানি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেও সুফল পাওয়া যাবে না।

এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। জরুরি সময়ে এসব অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উৎসের ব্যবহার বাড়াতে পারলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং জ্বালানি ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস তৈরি হবে।

গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি। সিস্টেম লস, অবৈধ সংযোগ ও চুরি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে উৎপাদন বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা দুর্বল রেখে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে এসব উদ্যোগের ফল দ্রুত পাওয়া যাবে না। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়াতে সময় ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই সংকট দেখা দিলে শুধু তাৎক্ষণিক আমদানি বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সময় লাগলেও ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এগুলোই স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

বিষয় : জ্বালানি সংকট

কাল মহাকাল

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬


জ্বালানি সংকট কাটাতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

জ্বালানি সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে হলে সাময়িকভাবে আমদানি বাড়ানোর বদলে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।

দেশের জ্বালানি খাতের বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে আমদানিনির্ভরতা। বর্তমানে খাতটির প্রায় ৬০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট—যেকোনো একটি কারণেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় নিয়মিত গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছেন অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। তাঁর মতে, গ্যাসের সম্ভাবনা যাচাই করে ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান চালানো দরকার। কোনো একটি প্রকল্প বা মেয়াদভিত্তিক উদ্যোগের মধ্যে অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানি করা এলএনজির ওপর চাপ কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে দেশের গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া শুধু আমদানি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেও সুফল পাওয়া যাবে না।

এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। জরুরি সময়ে এসব অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উৎসের ব্যবহার বাড়াতে পারলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং জ্বালানি ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস তৈরি হবে।

গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি। সিস্টেম লস, অবৈধ সংযোগ ও চুরি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে উৎপাদন বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা দুর্বল রেখে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে এসব উদ্যোগের ফল দ্রুত পাওয়া যাবে না। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়াতে সময় ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই সংকট দেখা দিলে শুধু তাৎক্ষণিক আমদানি বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সময় লাগলেও ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এগুলোই স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত