সম্পাদকীয়
বিশ্ব রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তার সাথে ভারতের কর্তৃত্ববাদী আচরণ মোকাবেলা করাও কম চ্যালেঞ্জিং নয়। এই মুহুর্তে বিদ্যমান বাস্তবতা বাইরে থাকার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। কারণ, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী কৌশলগত অবস্থান, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ এখন বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
এমন বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এগোচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে কোনো একটি শক্তির প্রভাব বলয়ে আটকে পড়ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, বাস্তবতা দেখতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি ও রপ্তানিনির্ভর। শিল্পের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান রপ্তানি বাজারও কয়েকটি বড় অর্থনীতির হাতে। উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, আবার প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্বালানি ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। অর্থাৎ, বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রয়োজনীয় সম্পর্ক আর অতিরিক্ত নির্ভরতার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। যখন একটি রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারাতে শুরু করে, তখন সেই সম্পর্ক আর কূটনীতি থাকে না; তা পরিণত হয় নির্ভরশীলতায়। আর নির্ভরশীল রাষ্ট্র কখনোই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নিতে পারে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি ছিল একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। সেই নীতির মূল কথা ছিল—সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ নিজেই। এই নীতিই দীর্ঘদিন দেশকে আন্তর্জাতিক নানা সংকটের মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। আজও সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি; বরং বেড়েছে।
তবে বাইরের চাপের চেয়েও বড় দুর্বলতা তৈরি হয় দেশের ভেতরে। রাজনৈতিক বিভাজন যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেও ঐক্য গড়ে ওঠে না, তখন বিদেশি শক্তিগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তার সহজ হয়ে যায়। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ই বলে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি যত বাড়ে, বহিরাগত হস্তক্ষেপের ঝুঁকিও তত বাড়ে।
তাই পররাষ্ট্রনীতি কোনো দলীয় নীতি হতে পারে না। সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাবে; কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল একই ধারায় চলতে হবে। সংসদে খোলামেলা আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিদেশনীতি নির্ধারণ করা গেলে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। এতে আন্তর্জাতিক মহলেও একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে—বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
বিশ্বের অনেক দেশ এই পথেই সফল হয়েছে। তারা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে, কিন্তু কারও প্রভাব বলয়ে নিজেদের সমর্পণ করেনি। প্রয়োজন অনুযায়ী সবার সঙ্গে কাজ করেছে, আবার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসও করেনি। ছোট রাষ্ট্র হয়েও তারা সম্মান আদায় করেছে, কারণ তাদের অবস্থান ছিল আত্মবিশ্বাসী এবং সুস্পষ্ট।
বাংলাদেশেরও সেই পথেই হাঁটতে হবে। এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে অকারণ দূরত্ব সৃষ্টি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আবার উন্নয়ন বা বিনিয়োগের প্রয়োজনকে এমন পর্যায়ে নেওয়াও উচিত নয়, যাতে দেশের নীতিনির্ধারণে বাইরের চাপ প্রভাব ফেলতে পারে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই আজ সবচেয়ে বড় শক্তি।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তাই শুধু সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় সফল হতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী বা অর্থনীতি নয়; বরং নিজের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের সামনে পথ একটাই—কারও পক্ষ নেওয়া নয়, বাংলাদেশের পক্ষ নেওয়া। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে কেন্দ্র করেই বিদেশনীতি পরিচালিত হতে হবে। পরিবর্তনশীল বিশ্বে এটাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং সবচেয়ে সম্মানজনক পথ।
বিষয় : বিশ্ব রাজনীতি
2.png)
বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তার সাথে ভারতের কর্তৃত্ববাদী আচরণ মোকাবেলা করাও কম চ্যালেঞ্জিং নয়। এই মুহুর্তে বিদ্যমান বাস্তবতা বাইরে থাকার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। কারণ, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী কৌশলগত অবস্থান, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ এখন বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
এমন বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এগোচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে কোনো একটি শক্তির প্রভাব বলয়ে আটকে পড়ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, বাস্তবতা দেখতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি ও রপ্তানিনির্ভর। শিল্পের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান রপ্তানি বাজারও কয়েকটি বড় অর্থনীতির হাতে। উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, আবার প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্বালানি ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। অর্থাৎ, বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রয়োজনীয় সম্পর্ক আর অতিরিক্ত নির্ভরতার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। যখন একটি রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারাতে শুরু করে, তখন সেই সম্পর্ক আর কূটনীতি থাকে না; তা পরিণত হয় নির্ভরশীলতায়। আর নির্ভরশীল রাষ্ট্র কখনোই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নিতে পারে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি ছিল একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। সেই নীতির মূল কথা ছিল—সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ নিজেই। এই নীতিই দীর্ঘদিন দেশকে আন্তর্জাতিক নানা সংকটের মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। আজও সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি; বরং বেড়েছে।
তবে বাইরের চাপের চেয়েও বড় দুর্বলতা তৈরি হয় দেশের ভেতরে। রাজনৈতিক বিভাজন যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেও ঐক্য গড়ে ওঠে না, তখন বিদেশি শক্তিগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তার সহজ হয়ে যায়। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ই বলে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি যত বাড়ে, বহিরাগত হস্তক্ষেপের ঝুঁকিও তত বাড়ে।
তাই পররাষ্ট্রনীতি কোনো দলীয় নীতি হতে পারে না। সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাবে; কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল একই ধারায় চলতে হবে। সংসদে খোলামেলা আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিদেশনীতি নির্ধারণ করা গেলে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। এতে আন্তর্জাতিক মহলেও একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে—বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
বিশ্বের অনেক দেশ এই পথেই সফল হয়েছে। তারা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে, কিন্তু কারও প্রভাব বলয়ে নিজেদের সমর্পণ করেনি। প্রয়োজন অনুযায়ী সবার সঙ্গে কাজ করেছে, আবার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসও করেনি। ছোট রাষ্ট্র হয়েও তারা সম্মান আদায় করেছে, কারণ তাদের অবস্থান ছিল আত্মবিশ্বাসী এবং সুস্পষ্ট।
বাংলাদেশেরও সেই পথেই হাঁটতে হবে। এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে অকারণ দূরত্ব সৃষ্টি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আবার উন্নয়ন বা বিনিয়োগের প্রয়োজনকে এমন পর্যায়ে নেওয়াও উচিত নয়, যাতে দেশের নীতিনির্ধারণে বাইরের চাপ প্রভাব ফেলতে পারে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই আজ সবচেয়ে বড় শক্তি।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তাই শুধু সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় সফল হতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী বা অর্থনীতি নয়; বরং নিজের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের সামনে পথ একটাই—কারও পক্ষ নেওয়া নয়, বাংলাদেশের পক্ষ নেওয়া। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে কেন্দ্র করেই বিদেশনীতি পরিচালিত হতে হবে। পরিবর্তনশীল বিশ্বে এটাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং সবচেয়ে সম্মানজনক পথ।
2.png)