সম্পাদকীয়
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত পাঁচ মাসে পা রাখতে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের গর্জন যেন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিন যুদ্ধের গতি হঠাৎ কমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা হামলার পর বিরতি নিয়েছে, ইরানও বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ থেকে বিরত রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই নীরবতার অর্থ কী? যুদ্ধ কি শেষের পথে, নাকি আরও বড় সংঘর্ষের প্রস্তুতি চলছে?
যুদ্ধের ইতিহাস বলে, নীরবতা সব সময় শান্তির ইঙ্গিত দেয় না। অনেক সময় সেটিই হয় পরবর্তী বড় আঘাতের পূর্বপ্রস্তুতি। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাই নয়, কূটনীতি, সামরিক সক্ষমতা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্ডি সম্প্রতি বলেছেন, ইরান চায় আন্তর্জাতিক মহল বুঝুক যে এই সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি তেহরান নয়, বরং ওয়াশিংটন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান নিজেকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যে আগে থেকে যুদ্ধ শুরু করে না; বরং হামলার জবাব দেয়। এই কৌশলের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক জনমতকে নিজের পক্ষে রাখা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জনমতের গুরুত্ব কম নয়। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কোনো রাষ্ট্র যদি আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে তার কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এ কারণেই এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠন করতে পারেনি। যদিও এর পেছনে আরও নানা ভূ-রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে হামলার গতি কমিয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে গোলাবারুদের মজুদের ওপর চাপ, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলেও, একটি বিষয় স্পষ্ট—দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা কোনো দেশের জন্যই সহজ নয়। আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়; এটি সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলেও, একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা তার জন্যও ব্যয়বহুল। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে।
অন্যদিকে ইরানও কেবল নিজের ভূখণ্ডে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেনি। গত দুই দশকে তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের 'অ্যাসিমেট্রিক নেটওয়ার্ক' তৈরি করেছে। ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, লেবাননের হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি সেই নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে যুদ্ধ শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে।
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট এবং সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যদি এসব উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে শুধু যুদ্ধরত পক্ষ নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেতে পারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি এই অঞ্চলের সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অবস্থান। তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কারণ তারা জানে, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রথম আঘাত তাদের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপরই আসবে। তাই অনেক দেশই প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূলত তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমত, সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, সীমিত লক্ষ্য অর্জনের পর কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়া। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে চাপ বজায় রাখা।
প্রথম পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয় পথটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। আর তৃতীয় পথ দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার জন্ম দিতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষই স্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারবে না।
ইরানের প্রতিক্রিয়াও নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সামরিক চাপ বাড়ে, তাহলে তেহরান সরাসরি বা তার আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিতে পারে। আর যদি আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে ইরান আগের তুলনায় আরও কঠোর শর্ত উত্থাপন করার চেষ্টা করবে—এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকের।
তবে যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। অতীতে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি সব সময় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে পারে না। আবার এটাও সত্য যে, শুধু প্রতিরোধ গড়ে তোলাও কোনো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত বিজয়ের নিশ্চয়তা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, সেনা মোতায়েন এবং পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সময়ে ইরানও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ব্যয় বহন করছে। অর্থাৎ দুই পক্ষই এক ধরনের ক্লান্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো—এই বিরতি কি কূটনীতির সুযোগ তৈরি করবে, নাকি আরও বড় সংঘর্ষের প্রস্তুতি? এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আর শুধু দুটি দেশের সংঘাত নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক কূটনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
অতএব, যুদ্ধের প্রতিটি বিরতিকে বিজয় বা পরাজয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন এক সংঘাত, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক ধৈর্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার অবস্থান কতটা টেকসই। ইতিহাস বলে, যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, সম্মানজনকভাবে তা শেষ করা ততটাই কঠিন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতও সেই কঠিন বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ।
বিষয় : ইরান যুদ্ধে বিরতি
2.png)
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৬
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত পাঁচ মাসে পা রাখতে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের গর্জন যেন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিন যুদ্ধের গতি হঠাৎ কমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা হামলার পর বিরতি নিয়েছে, ইরানও বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ থেকে বিরত রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই নীরবতার অর্থ কী? যুদ্ধ কি শেষের পথে, নাকি আরও বড় সংঘর্ষের প্রস্তুতি চলছে?
যুদ্ধের ইতিহাস বলে, নীরবতা সব সময় শান্তির ইঙ্গিত দেয় না। অনেক সময় সেটিই হয় পরবর্তী বড় আঘাতের পূর্বপ্রস্তুতি। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাই নয়, কূটনীতি, সামরিক সক্ষমতা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্ডি সম্প্রতি বলেছেন, ইরান চায় আন্তর্জাতিক মহল বুঝুক যে এই সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি তেহরান নয়, বরং ওয়াশিংটন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান নিজেকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যে আগে থেকে যুদ্ধ শুরু করে না; বরং হামলার জবাব দেয়। এই কৌশলের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক জনমতকে নিজের পক্ষে রাখা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জনমতের গুরুত্ব কম নয়। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কোনো রাষ্ট্র যদি আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে তার কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এ কারণেই এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠন করতে পারেনি। যদিও এর পেছনে আরও নানা ভূ-রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে হামলার গতি কমিয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে গোলাবারুদের মজুদের ওপর চাপ, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলেও, একটি বিষয় স্পষ্ট—দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা কোনো দেশের জন্যই সহজ নয়। আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়; এটি সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলেও, একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা তার জন্যও ব্যয়বহুল। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে।
অন্যদিকে ইরানও কেবল নিজের ভূখণ্ডে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেনি। গত দুই দশকে তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের 'অ্যাসিমেট্রিক নেটওয়ার্ক' তৈরি করেছে। ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, লেবাননের হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি সেই নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে যুদ্ধ শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে।
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট এবং সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যদি এসব উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে শুধু যুদ্ধরত পক্ষ নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেতে পারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি এই অঞ্চলের সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অবস্থান। তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কারণ তারা জানে, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রথম আঘাত তাদের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপরই আসবে। তাই অনেক দেশই প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূলত তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমত, সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, সীমিত লক্ষ্য অর্জনের পর কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়া। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে চাপ বজায় রাখা।
প্রথম পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয় পথটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। আর তৃতীয় পথ দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার জন্ম দিতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষই স্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারবে না।
ইরানের প্রতিক্রিয়াও নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সামরিক চাপ বাড়ে, তাহলে তেহরান সরাসরি বা তার আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিতে পারে। আর যদি আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে ইরান আগের তুলনায় আরও কঠোর শর্ত উত্থাপন করার চেষ্টা করবে—এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকের।
তবে যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। অতীতে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি সব সময় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে পারে না। আবার এটাও সত্য যে, শুধু প্রতিরোধ গড়ে তোলাও কোনো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত বিজয়ের নিশ্চয়তা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, সেনা মোতায়েন এবং পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সময়ে ইরানও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ব্যয় বহন করছে। অর্থাৎ দুই পক্ষই এক ধরনের ক্লান্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো—এই বিরতি কি কূটনীতির সুযোগ তৈরি করবে, নাকি আরও বড় সংঘর্ষের প্রস্তুতি? এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আর শুধু দুটি দেশের সংঘাত নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক কূটনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
অতএব, যুদ্ধের প্রতিটি বিরতিকে বিজয় বা পরাজয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন এক সংঘাত, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক ধৈর্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার অবস্থান কতটা টেকসই। ইতিহাস বলে, যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, সম্মানজনকভাবে তা শেষ করা ততটাই কঠিন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতও সেই কঠিন বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ।
2.png)