জাতীয়
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বিভিন্ন মহলে এখনো পুরোনো ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের প্রভাব অব্যাহত থাকার অভিযোগ উঠছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, দরদাতা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের কয়েকজনের দাবি, দেশের বাইরে অবস্থান করা কিছু ব্যক্তি তাদের প্রতিনিধি বা ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ও চট্টগ্রামের শিপিং, নির্মাণ, খাদ্য আমদানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে আগের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে সরকারি বড় প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য ছিল। বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ভাঙেনি বলে বিভিন্ন পক্ষ অভিযোগ করছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিদ্যুৎ খাতের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স পাওয়ার। কয়েকজন দরদাতা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়ে কোম্পানিটিকে কালোতালিকাভুক্ত করার আবেদন করেছেন। তাদের অভিযোগ, ডেসকোর আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল অ্যাক্সেসরিজ ক্রয়ের দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
দরদাতাদের অভিযোগ পাওয়ার পর বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ডেসকোকে চিঠি দেয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, একক গ্রহণযোগ্য দরদাতা নির্ধারণ এবং প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো তদন্তের দাবি রাখে।
এদিকে ডেসকো মন্ত্রণালয়কে দেওয়া জবাবে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট দরপত্রে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং তাদের মূল্যায়নে অ্যালায়েন্স পাওয়ারই সব শর্ত পূরণ করেছে। সেই কারণেই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
অ্যালায়েন্স পাওয়ারের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী এস এম আল-ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি। কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেওয়া ফোন নম্বরেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) সবুর হোসেন জানান, কয়েকজন দরদাতার অভিযোগের ভিত্তিতে ডেসকোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ডেসকোর জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, প্রয়োজন হলে আইএমইডি, দুদক, ওসিএজি এবং স্বাধীন কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে তদন্ত করা উচিত। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ক্রয় বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে সীমিত প্রতিযোগিতা, একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকভাবে কাজ পাওয়া এবং দরপত্রের শর্ত নিয়ে বিতর্কের অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায়। তাদের মতে, ই-জিপি চালুর ফলে স্বচ্ছতা কিছুটা বাড়লেও বড় ও বিশেষায়িত প্রকল্পে কারিগরি শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়, যা বিতর্কেরও জন্ম দেয়।
বিষয় : আওয়ামী লীগ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ
2.png)
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৬
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বিভিন্ন মহলে এখনো পুরোনো ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের প্রভাব অব্যাহত থাকার অভিযোগ উঠছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, দরদাতা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের কয়েকজনের দাবি, দেশের বাইরে অবস্থান করা কিছু ব্যক্তি তাদের প্রতিনিধি বা ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ও চট্টগ্রামের শিপিং, নির্মাণ, খাদ্য আমদানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে আগের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে সরকারি বড় প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য ছিল। বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ভাঙেনি বলে বিভিন্ন পক্ষ অভিযোগ করছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিদ্যুৎ খাতের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স পাওয়ার। কয়েকজন দরদাতা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়ে কোম্পানিটিকে কালোতালিকাভুক্ত করার আবেদন করেছেন। তাদের অভিযোগ, ডেসকোর আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল অ্যাক্সেসরিজ ক্রয়ের দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
দরদাতাদের অভিযোগ পাওয়ার পর বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ডেসকোকে চিঠি দেয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, একক গ্রহণযোগ্য দরদাতা নির্ধারণ এবং প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো তদন্তের দাবি রাখে।
এদিকে ডেসকো মন্ত্রণালয়কে দেওয়া জবাবে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট দরপত্রে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং তাদের মূল্যায়নে অ্যালায়েন্স পাওয়ারই সব শর্ত পূরণ করেছে। সেই কারণেই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
অ্যালায়েন্স পাওয়ারের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী এস এম আল-ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি। কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেওয়া ফোন নম্বরেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) সবুর হোসেন জানান, কয়েকজন দরদাতার অভিযোগের ভিত্তিতে ডেসকোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ডেসকোর জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, প্রয়োজন হলে আইএমইডি, দুদক, ওসিএজি এবং স্বাধীন কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে তদন্ত করা উচিত। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ক্রয় বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে সীমিত প্রতিযোগিতা, একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকভাবে কাজ পাওয়া এবং দরপত্রের শর্ত নিয়ে বিতর্কের অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায়। তাদের মতে, ই-জিপি চালুর ফলে স্বচ্ছতা কিছুটা বাড়লেও বড় ও বিশেষায়িত প্রকল্পে কারিগরি শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়, যা বিতর্কেরও জন্ম দেয়।
2.png)