সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

তিনগুণ দামে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব, দ্বিধায় শিল্প খাত

মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস আইএসও পদ্ধতিতে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বর্তমান দামের তিনগুণ মূল্য পরিশোধে অনাগ্রহী শিল্প উদ্যোক্তারা, সরকারও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

তিনগুণ দামে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব, দ্বিধায় শিল্প খাত
ছবি -সংগৃহীত

দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে বিকল্প সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস। আইএসও কনটেইনার পদ্ধতিতে দ্রুত এলএনজি এনে শিল্পকারখানায় সরবরাহের আগ্রহ দেখালেও প্রতি ইউনিট গ্যাসের জন্য প্রায় ১০০ টাকা মূল্য চাওয়ায় প্রস্তাবটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে শিল্প খাতে একই পরিমাণ গ্যাসের সরকারি মূল্য ৩১ টাকা।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল কবে পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ফলে দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং গৃহস্থালি—সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাস না থাকায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকরা।

এমন পরিস্থিতিতে সোমবার পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল পেট্রোবাংলায় বৈঠক করে আইএসও কনটেইনারের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব তুলে ধরে। বৈঠকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রতিনিধি রাজীব হায়দার বলেন, শিল্প খাতে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গ্যাস। সে কারণে নতুন যেকোনো উদ্যোগই গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে পেট্রোনাস যে দাম প্রস্তাব করেছে, তা অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বহন করা কঠিন হবে।

মঙ্গলবার পেট্রোনাসের প্রতিনিধিদল নারায়ণগঞ্জের জেরা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বেসরকারি সুগার মিল পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। সেখানে আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি সরবরাহের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। তবে এ বিষয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সরকারি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। সেই সমঝোতার অংশ হিসেবেই পেট্রোনাস বাংলাদেশে এই বিশেষ পদ্ধতিতে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।

আইএসও পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের ক্রায়োজেনিক কনটেইনারে এলএনজি পরিবহন করা হয়। ২০ ফুটের প্রতিটি কনটেইনারে প্রায় ৯ টন এবং ৪০ ফুটের প্রতিটিতে প্রায় ১৮ টন এলএনজি বহন করা সম্ভব। একটি জাহাজে প্রায় ৬০০টি কনটেইনার আনা যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর এসব কনটেইনার ট্রেইলার বা লরির মাধ্যমে সরাসরি শিল্পকারখানা কিংবা গ্যাস নেটওয়ার্কে নেওয়া হবে। তবে এই ব্যবস্থা চালু করতে ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিজার্ভ ট্যাংক ও রিগ্যাসিফিকেশন সুবিধা স্থাপন করতে হবে, যার জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

পেট্রোনাসের দাবি, মালয়েশিয়া থেকে এভাবে এলএনজি বাংলাদেশে পৌঁছাতে প্রায় সাত দিন সময় লাগবে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই পদ্ধতিতে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম দাঁড়াবে প্রায় ১০০ টাকা। বর্তমানে পেট্রোবাংলা আমদানি করা এলএনজির জন্য গড়ে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬৬ টাকা ব্যয় করছে। ফলে পেট্রোনাসের প্রস্তাবিত মূল্য বিদ্যমান আমদানি ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি।

এ কারণে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এখনো এ প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নেয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, গ্যাসের অভাবে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে, যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ২৫ টাকারও বেশি। এ অবস্থায় আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানি অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাস সরবরাহে মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৯ দশমিক ৫৯ শতাংশই এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়। গত অর্থবছরে এ খাতে সরকারের ব্যয় ছিল প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরে সেই ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। আগে প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ১০ ডলারে কেনা গেলেও এখন বাংলাদেশকে প্রায় ২২ ডলার পর্যন্ত মূল্য দিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগও স্থবির রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দেওয়ার পরও গত পাঁচ বছরে অন্তত ৫৫০টি শিল্পকারখানা গ্যাস সংযোগ পায়নি। চলমান সংকটের কারণে এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬


তিনগুণ দামে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব, দ্বিধায় শিল্প খাত

প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে বিকল্প সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস। আইএসও কনটেইনার পদ্ধতিতে দ্রুত এলএনজি এনে শিল্পকারখানায় সরবরাহের আগ্রহ দেখালেও প্রতি ইউনিট গ্যাসের জন্য প্রায় ১০০ টাকা মূল্য চাওয়ায় প্রস্তাবটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে শিল্প খাতে একই পরিমাণ গ্যাসের সরকারি মূল্য ৩১ টাকা।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল কবে পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ফলে দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং গৃহস্থালি—সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাস না থাকায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকরা।

এমন পরিস্থিতিতে সোমবার পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল পেট্রোবাংলায় বৈঠক করে আইএসও কনটেইনারের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব তুলে ধরে। বৈঠকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রতিনিধি রাজীব হায়দার বলেন, শিল্প খাতে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গ্যাস। সে কারণে নতুন যেকোনো উদ্যোগই গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে পেট্রোনাস যে দাম প্রস্তাব করেছে, তা অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বহন করা কঠিন হবে।

মঙ্গলবার পেট্রোনাসের প্রতিনিধিদল নারায়ণগঞ্জের জেরা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বেসরকারি সুগার মিল পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। সেখানে আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি সরবরাহের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। তবে এ বিষয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সরকারি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। সেই সমঝোতার অংশ হিসেবেই পেট্রোনাস বাংলাদেশে এই বিশেষ পদ্ধতিতে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।

আইএসও পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের ক্রায়োজেনিক কনটেইনারে এলএনজি পরিবহন করা হয়। ২০ ফুটের প্রতিটি কনটেইনারে প্রায় ৯ টন এবং ৪০ ফুটের প্রতিটিতে প্রায় ১৮ টন এলএনজি বহন করা সম্ভব। একটি জাহাজে প্রায় ৬০০টি কনটেইনার আনা যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর এসব কনটেইনার ট্রেইলার বা লরির মাধ্যমে সরাসরি শিল্পকারখানা কিংবা গ্যাস নেটওয়ার্কে নেওয়া হবে। তবে এই ব্যবস্থা চালু করতে ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিজার্ভ ট্যাংক ও রিগ্যাসিফিকেশন সুবিধা স্থাপন করতে হবে, যার জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

পেট্রোনাসের দাবি, মালয়েশিয়া থেকে এভাবে এলএনজি বাংলাদেশে পৌঁছাতে প্রায় সাত দিন সময় লাগবে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই পদ্ধতিতে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম দাঁড়াবে প্রায় ১০০ টাকা। বর্তমানে পেট্রোবাংলা আমদানি করা এলএনজির জন্য গড়ে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬৬ টাকা ব্যয় করছে। ফলে পেট্রোনাসের প্রস্তাবিত মূল্য বিদ্যমান আমদানি ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি।

এ কারণে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এখনো এ প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নেয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, গ্যাসের অভাবে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে, যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ২৫ টাকারও বেশি। এ অবস্থায় আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানি অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাস সরবরাহে মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৯ দশমিক ৫৯ শতাংশই এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়। গত অর্থবছরে এ খাতে সরকারের ব্যয় ছিল প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরে সেই ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। আগে প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ১০ ডলারে কেনা গেলেও এখন বাংলাদেশকে প্রায় ২২ ডলার পর্যন্ত মূল্য দিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগও স্থবির রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দেওয়ার পরও গত পাঁচ বছরে অন্তত ৫৫০টি শিল্পকারখানা গ্যাস সংযোগ পায়নি। চলমান সংকটের কারণে এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত