সম্পাদকীয়
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়, সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এই প্র্যাক্টিস খুবই সাধারণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি কেবল কে নিয়োগ পেলেন, সেটি নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন কোন দিকে এগোচ্ছে—সেই প্রশ্নই আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার আসে-যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি হওয়ার কথা পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। অথচ যদি প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তাহলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও দলের মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সরকারের জন্যই কল্যাণকর নয়।
এখানে একটি বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। অতীতের সরকারগুলোর আমলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা দলসমর্থকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ছিল। কিন্তু যদি এখন সেই প্রবণতা আরও প্রকাশ্য ও সরাসরি রূপ পায়, তাহলে সেটিকে সংস্কার বলা কঠিন। বরং এটি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
অবশ্য রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দক্ষ প্রশাসক, সফল ব্যবস্থাপক এবং রাজনৈতিক কর্মী হতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মপরিকল্পনাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়; রাজনৈতিক পরিচয় নয়। কারণ স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের অভাবে জনগণের মনে সবসময়ই প্রশ্ন থেকে যাবে—নিয়োগটি কি মেধার ভিত্তিতে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার?
আরও একটি গভীর সংকট এখানে নিহিত। রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মকে যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে উচ্চপদে পৌঁছানোর প্রধান পথ হলো রাজনৈতিক পরিচয়, তবে মেধা, শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার প্রতি তাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। কারণ উন্নত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে দক্ষ প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী সিভিল সার্ভিস এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের ওপর; কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নয়।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে "সংস্কার" শব্দটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সংস্কার মানে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়; পরিবর্তন হতে হবে নিয়ম, প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের। সরকার যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে চায়, তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি, প্রকাশ্য যোগ্যতার মানদণ্ড, উন্মুক্ত আবেদন এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচি, কর্মসম্পাদন সূচক (KPI) এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এগুলো জনগণের করের অর্থে পরিচালিত জাতীয় সম্পদ। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি কেবল মুখ বদলায়, কিন্তু নিয়োগের সংস্কৃতি না বদলায়, তাহলে "পরিবর্তন" শব্দটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।
আজকের বিতর্ক তাই ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, নীতিকে ঘিরে। রাষ্ট্র কি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে মেধা ও যোগ্যতা হবে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি? নাকি প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন করে দলীয় প্রভাবের অধীনে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
2.png)
রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়, সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এই প্র্যাক্টিস খুবই সাধারণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি কেবল কে নিয়োগ পেলেন, সেটি নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন কোন দিকে এগোচ্ছে—সেই প্রশ্নই আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার আসে-যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি হওয়ার কথা পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। অথচ যদি প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তাহলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও দলের মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সরকারের জন্যই কল্যাণকর নয়।
এখানে একটি বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। অতীতের সরকারগুলোর আমলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা দলসমর্থকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ছিল। কিন্তু যদি এখন সেই প্রবণতা আরও প্রকাশ্য ও সরাসরি রূপ পায়, তাহলে সেটিকে সংস্কার বলা কঠিন। বরং এটি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
অবশ্য রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দক্ষ প্রশাসক, সফল ব্যবস্থাপক এবং রাজনৈতিক কর্মী হতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মপরিকল্পনাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়; রাজনৈতিক পরিচয় নয়। কারণ স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের অভাবে জনগণের মনে সবসময়ই প্রশ্ন থেকে যাবে—নিয়োগটি কি মেধার ভিত্তিতে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার?
আরও একটি গভীর সংকট এখানে নিহিত। রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মকে যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে উচ্চপদে পৌঁছানোর প্রধান পথ হলো রাজনৈতিক পরিচয়, তবে মেধা, শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার প্রতি তাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। কারণ উন্নত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে দক্ষ প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী সিভিল সার্ভিস এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের ওপর; কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নয়।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে "সংস্কার" শব্দটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সংস্কার মানে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়; পরিবর্তন হতে হবে নিয়ম, প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের। সরকার যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে চায়, তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি, প্রকাশ্য যোগ্যতার মানদণ্ড, উন্মুক্ত আবেদন এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচি, কর্মসম্পাদন সূচক (KPI) এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এগুলো জনগণের করের অর্থে পরিচালিত জাতীয় সম্পদ। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি কেবল মুখ বদলায়, কিন্তু নিয়োগের সংস্কৃতি না বদলায়, তাহলে "পরিবর্তন" শব্দটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।
আজকের বিতর্ক তাই ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, নীতিকে ঘিরে। রাষ্ট্র কি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে মেধা ও যোগ্যতা হবে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি? নাকি প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন করে দলীয় প্রভাবের অধীনে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
2.png)