মহাকালের আয়নামহাকালের আয়না

হাসিনার শেষ ৭২ ঘণ্টা: কীভাবে ভেঙে পড়েছিল ক্ষমতার শেষ দুর্গ

গণভবনে একের পর এক বৈঠক, সেনা সদর থেকে বদলে যাওয়া বার্তা, রাজপথে অপ্রতিরোধ্য জনস্রোত—মাত্র তিন দিনে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়, যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখার সব হিসাব ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।

হাসিনার শেষ ৭২ ঘণ্টা: কীভাবে ভেঙে পড়েছিল ক্ষমতার শেষ দুর্গ
ছবি -সংগৃহীত

৫ আগস্ট ২০২৪। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ঢাকার চারদিক থেকে হাজারো মানুষ গণভবনের দিকে এগিয়ে আসছে। উত্তরা, সাভার, যাত্রাবাড়ী—প্রতিটি দিক থেকেই মিছিলের পর মিছিল রাজধানীর কেন্দ্রে মিলিত হচ্ছে। গণভবনের ভেতরেও তখন সময় যেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবন ছাড়েন। পেছনের দিকের সাবেক বাণিজ্যমেলা মাঠে অপেক্ষমাণ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে ওঠেন তিনি। সেখান থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি, এরপর একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা। এভাবেই শেষ হয় টানা প্রায় দেড় দশকের একটি শাসন অধ্যায়।

কিন্তু এই বিদায়ের সিদ্ধান্ত একদিনে আসেনি। এর পেছনে ছিল টানা কয়েক দিনের দ্রুত বদলে যাওয়া বাস্তবতা, অসংখ্য বৈঠক, পাল্টে যাওয়া হিসাব এবং এমন কিছু মুহূর্ত, যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র বুঝতে শুরু করে যে পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

জুলাইয়ের শুরুতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলেও দিন যত গড়ায়, তা কেবল শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনায় জনঅসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিদিন রাজপথে মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল, আর একই সঙ্গে কমছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা।

এই পরিস্থিতিতে ৩ আগস্ট সেনা সদরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে দরবার করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বর্ণনায় উঠে এসেছে, বৈঠকে অনেক কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে মত দেন—বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করা উচিত হবে না। সেনাবাহিনীর ভারী অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং জনপরিসরে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বাড়ছিল। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশও প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের পর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে শুরু করে। ক্ষমতার কেন্দ্রে তখনও নানা পরিকল্পনা চলছিল, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

৪ আগস্ট দিনভর এবং গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে বৈঠকের পর বৈঠক হয়। মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা—সবাই উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলন কীভাবে থামানো যায়, জরুরি অবস্থা জারি করা হবে কি না, নাকি রাজনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়া হবে—এসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে। কিন্তু প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছিল।

একাধিক সূত্র জানায়, ওই রাতেই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। তখন শেখ রেহানাও উপস্থিত ছিলেন। সেনাপ্রধান তাঁকে জানান, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেন।

পরদিন সকাল ১০টার দিকে আবার গণভবনে যান সেনাপ্রধান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, তখন শেখ হাসিনার হাতে নিজের লেখা পদত্যাগপত্র ছিল। তিনি দৃশ্যত ক্লান্ত ও চিন্তিত ছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানার পর সেনাপ্রধান সেনা সদরে ফিরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেন, যাতে সরকার পতনের পর দেশে বড় ধরনের অরাজকতা তৈরি না হয়।

এদিকে ভোর থেকেই রাজধানীমুখী জনস্রোত আরও ঘন হতে থাকে। উত্তরা, সাভার ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ ঢাকার দিকে রওনা হন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল গণভবন। এই পরিস্থিতিতেই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রস্তুতি শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাড়াহুড়োর কারণে তিনি রান্না করা খাবার পর্যন্ত খেতে পারেননি।

দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে তিনি হেলিকপ্টারে গণভবন ত্যাগ করেন। কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে কিছু সময় অপেক্ষার পর প্রস্তুত করা হয় পরিবহন বিমান। বিকেলে সেটি ভারতের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। পরে ভারতের গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর তাঁকে স্বাগত জানান দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।

পরদিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর রাজ্যসভায় জানান, শেখ হাসিনা অল্প সময়ের নোটিশে সাময়িকভাবে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও তাঁর বিমান চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়ে যোগাযোগ করেছিল।

এদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরেও অনিশ্চয়তা বাড়ছিল। দলটির একাধিক সূত্রের মতে, শেষ সময় পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত ছিলেন না কোন পথে এগোনো হবে। কেউ মনে করছিলেন জরুরি অবস্থা জারি হবে, কেউ ভাবছিলেন কঠোর অভিযান চালানো হবে, আবার কেউ বিশ্বাস করছিলেন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজা হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বারবার বদলাচ্ছিল।

৪ আগস্ট রাতেও গণভবনে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে পরদিনের কর্মসূচি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। পরে সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমেও আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতেই সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে জানিয়ে দেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যেখানে আগের পরিকল্পনাগুলো আর কার্যকর হবে না।

অন্যদিকে আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেও দ্বিধা দেখা দেয়। বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে মানুষের ওপর গুলি চালানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। একই সময়ে আন্দোলন মোকাবিলায় দলীয় কর্মীদের মাঠে নামানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের জবানবন্দিতে উঠে আসে, সরকারকে বাস্তব পরিস্থিতির কথা জানানো হলেও সেই সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বৈঠক চলাকালেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল।

দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বড় একটি অংশ কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন। কেউ বাসা ছেড়ে আত্মগোপনে যান, কেউ পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন। অনেকের কাছেই এই প্রস্থান ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বিবরণে যে চিত্র উঠে আসে, তাতে স্পষ্ট হয়—৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ ছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে জমে ওঠা রাজনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি। ৩ থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সেনা সদর, গণভবন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্তের হিসাব বারবার বদলেছে। কিন্তু রাজপথের বাস্তবতা তার চেয়েও দ্রুত বদলেছে। শেষ পর্যন্ত সেই বাস্তবতার কাছেই পরাজিত হয় ক্ষমতার শেষ প্রতিরোধ।

বিষয় : শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪

কাল মহাকাল

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


হাসিনার শেষ ৭২ ঘণ্টা: কীভাবে ভেঙে পড়েছিল ক্ষমতার শেষ দুর্গ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

৫ আগস্ট ২০২৪। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ঢাকার চারদিক থেকে হাজারো মানুষ গণভবনের দিকে এগিয়ে আসছে। উত্তরা, সাভার, যাত্রাবাড়ী—প্রতিটি দিক থেকেই মিছিলের পর মিছিল রাজধানীর কেন্দ্রে মিলিত হচ্ছে। গণভবনের ভেতরেও তখন সময় যেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবন ছাড়েন। পেছনের দিকের সাবেক বাণিজ্যমেলা মাঠে অপেক্ষমাণ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে ওঠেন তিনি। সেখান থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি, এরপর একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা। এভাবেই শেষ হয় টানা প্রায় দেড় দশকের একটি শাসন অধ্যায়।

কিন্তু এই বিদায়ের সিদ্ধান্ত একদিনে আসেনি। এর পেছনে ছিল টানা কয়েক দিনের দ্রুত বদলে যাওয়া বাস্তবতা, অসংখ্য বৈঠক, পাল্টে যাওয়া হিসাব এবং এমন কিছু মুহূর্ত, যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র বুঝতে শুরু করে যে পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

জুলাইয়ের শুরুতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলেও দিন যত গড়ায়, তা কেবল শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনায় জনঅসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিদিন রাজপথে মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল, আর একই সঙ্গে কমছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা।

এই পরিস্থিতিতে ৩ আগস্ট সেনা সদরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে দরবার করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বর্ণনায় উঠে এসেছে, বৈঠকে অনেক কর্মকর্তা স্পষ্টভাবে মত দেন—বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করা উচিত হবে না। সেনাবাহিনীর ভারী অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং জনপরিসরে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বাড়ছিল। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশও প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের পর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে শুরু করে। ক্ষমতার কেন্দ্রে তখনও নানা পরিকল্পনা চলছিল, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

৪ আগস্ট দিনভর এবং গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে বৈঠকের পর বৈঠক হয়। মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা—সবাই উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলন কীভাবে থামানো যায়, জরুরি অবস্থা জারি করা হবে কি না, নাকি রাজনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়া হবে—এসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে। কিন্তু প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছিল।

একাধিক সূত্র জানায়, ওই রাতেই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। তখন শেখ রেহানাও উপস্থিত ছিলেন। সেনাপ্রধান তাঁকে জানান, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেন।

পরদিন সকাল ১০টার দিকে আবার গণভবনে যান সেনাপ্রধান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, তখন শেখ হাসিনার হাতে নিজের লেখা পদত্যাগপত্র ছিল। তিনি দৃশ্যত ক্লান্ত ও চিন্তিত ছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানার পর সেনাপ্রধান সেনা সদরে ফিরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেন, যাতে সরকার পতনের পর দেশে বড় ধরনের অরাজকতা তৈরি না হয়।

এদিকে ভোর থেকেই রাজধানীমুখী জনস্রোত আরও ঘন হতে থাকে। উত্তরা, সাভার ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ ঢাকার দিকে রওনা হন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল গণভবন। এই পরিস্থিতিতেই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রস্তুতি শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাড়াহুড়োর কারণে তিনি রান্না করা খাবার পর্যন্ত খেতে পারেননি।

দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে তিনি হেলিকপ্টারে গণভবন ত্যাগ করেন। কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে কিছু সময় অপেক্ষার পর প্রস্তুত করা হয় পরিবহন বিমান। বিকেলে সেটি ভারতের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। পরে ভারতের গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর তাঁকে স্বাগত জানান দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।

পরদিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর রাজ্যসভায় জানান, শেখ হাসিনা অল্প সময়ের নোটিশে সাময়িকভাবে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও তাঁর বিমান চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়ে যোগাযোগ করেছিল।

এদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরেও অনিশ্চয়তা বাড়ছিল। দলটির একাধিক সূত্রের মতে, শেষ সময় পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত ছিলেন না কোন পথে এগোনো হবে। কেউ মনে করছিলেন জরুরি অবস্থা জারি হবে, কেউ ভাবছিলেন কঠোর অভিযান চালানো হবে, আবার কেউ বিশ্বাস করছিলেন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজা হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বারবার বদলাচ্ছিল।

৪ আগস্ট রাতেও গণভবনে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে পরদিনের কর্মসূচি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। পরে সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমেও আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতেই সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে জানিয়ে দেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যেখানে আগের পরিকল্পনাগুলো আর কার্যকর হবে না।

অন্যদিকে আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেও দ্বিধা দেখা দেয়। বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে মানুষের ওপর গুলি চালানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। একই সময়ে আন্দোলন মোকাবিলায় দলীয় কর্মীদের মাঠে নামানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের জবানবন্দিতে উঠে আসে, সরকারকে বাস্তব পরিস্থিতির কথা জানানো হলেও সেই সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বৈঠক চলাকালেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল।

দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বড় একটি অংশ কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন। কেউ বাসা ছেড়ে আত্মগোপনে যান, কেউ পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন। অনেকের কাছেই এই প্রস্থান ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বিবরণে যে চিত্র উঠে আসে, তাতে স্পষ্ট হয়—৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ ছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে জমে ওঠা রাজনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি। ৩ থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সেনা সদর, গণভবন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্তের হিসাব বারবার বদলেছে। কিন্তু রাজপথের বাস্তবতা তার চেয়েও দ্রুত বদলেছে। শেষ পর্যন্ত সেই বাস্তবতার কাছেই পরাজিত হয় ক্ষমতার শেষ প্রতিরোধ।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত