সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মহাকালের আয়নামহাকালের আয়না

মাঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধ, তারপর রাষ্ট্রনায়ক: মেজর হাফিজের বর্ণাঢ্য জীব

জাতীয় দলের ফুটবলার, মুক্তিযুদ্ধের সেনানায়ক, বীর বিক্রম, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সংসদের স্পিকার এবং সবশেষে দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি—মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মাঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধ, তারপর রাষ্ট্রনায়ক: মেজর হাফিজের বর্ণাঢ্য জীব
ছবি -সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাদের জীবন একইসঙ্গে ক্রীড়া, যুদ্ধ, সামরিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রপরিচালনার মতো ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে সমানভাবে আলো ছড়িয়েছে। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। মাঠের দ্রুতগতির ফরোয়ার্ড থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সেনা কর্মকর্তা, পরে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতা এবং সবশেষে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের আসনে বসা—প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি

১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্ম নেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর বাবা প্রয়াত ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ নিজেও একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন—১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে দুই দফায় পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মা করিমুন নেছা বেগম ছিলেন গৃহিণী। রাজনীতির সেই পারিবারিক ধারা পরবর্তী জীবনে হাফিজ উদ্দিনের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মাঠ কাঁপানো ফুটবলার ও দ্রুততম মানব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন হাফিজ উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়কত্বও করেছেন তিনি। মাঠের বাইরে ট্র্যাকেও ছিলেন সমান পারদর্শী—১৯৬৪, ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সাল, টানা তিন মৌসুম ১০০ ও ২০০ মিটারে রেকর্ড টাইমিং গড়ে তিনি হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব।

ফুটবলার মেজর হাফিজ


১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি খেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে, যা সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের কোনো খেলোয়াড়ের জন্য ছিল বিরল অর্জন। ১৯৭০ সালে দলের অধিনায়কও নির্বাচিত হন তিনি—একমাত্র বাঙালি হিসেবে রেঙ্গুনে এশিয়ান কাপ খেলতে যান, খেলেছেন সৌদি আরবের বিপক্ষে ঢাকায়, সফর করেছেন ইরান ও তুরস্কেও। ঘরোয়া ফুটবলেও তাঁর নাম স্মরণীয়—ঢাকা ফুটবল লিগে প্রথম ডাবল হ্যাটট্রিকের কীর্তি তাঁরই, ১৯৭৩ সালে ফায়ার সার্ভিসের বিপক্ষে মোহামেডানের ৬-০ গোলের জয়ে ছয় গোলই এসেছিল তাঁর পা থেকে।

যুদ্ধক্ষেত্রে বীর বিক্রম

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন হাফিজ উদ্দিন। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হলে তিনি বিদ্রোহী বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের অন্যতম হয়ে ওঠেন। জীবনবাজি রেখে সহযোদ্ধাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। রণাঙ্গনে অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতার পর তাঁকে দেওয়া হয় দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর বিক্রম’।

বীর বিক্রম পদকসহ মেজর হাফিজ


সংগঠক হাফিজ: বাফুফে থেকে ফিফা

স্বাধীনতার পর সেনাজীবন ছেড়ে আবারও ফুটবলে সক্রিয় হন হাফিজ উদ্দিন। শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, সংগঠক হিসেবেও দেশের ফুটবলের উন্নয়নে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি, নির্বাচিত হন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সহ-সভাপতি হিসেবে এবং সদস্য হন ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটিরও। ১৯৮০ সালে তিনি ভূষিত হন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে, আর ফুটবলে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে ২০০৪ সালে পান ফিফার সর্বোচ্চ সম্মাননা।

রাজনীতির মাঠে দীর্ঘ পথচলা

সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর বাবার পথ ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন হাফিজ উদ্দিন। ভোলা-৩ আসন থেকে টানা ছয়বারসহ মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বাণিজ্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমি

সংসদ সদস্য মেজর হাফিজ

স্পিকার থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

স্পিকার মেজর হাফিজ

২০২৬ সালের ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই দিন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান, উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ


এরপর ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই ঘটে আরেক নাটকীয় মোড়। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং নিজে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা রয়েছে। এই দায়িত্বপ্রাপ্তির খবরে তাঁর নিজ এলাকা ভোলার লালমোহনে আনন্দ মিছিল বের করেন স্থানীয় মানুষ।

ফুটবলার থেকে মুক্তিযোদ্ধা, মন্ত্রী, স্পিকার এবং সবশেষে রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া—আট দশকের বেশি দীর্ঘ এই জীবনের প্রতিটি বাঁকই যেন বাংলাদেশের ইতিহাসেরই এক-একটি অধ্যায়।

লেখক হাফিজ ও ব্যক্তিজীবন

মেজর হাফিজের ব্যক্তিজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর লেখালেখি। মুক্তিযুদ্ধ, সেনাজীবন, গণতন্ত্র ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে তিনি রচনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ, যেখানে নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা।

মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এর লেখা বই

মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এর লেখা বই


ব্যক্তিজীবনে হাফিজ উদ্দিনের স্ত্রী দিলারা হাফিজ ছিলেন একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। দীর্ঘ ৫৪ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁদের দুই ছেলে শাহরুখ হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ এবং এক মেয়ে শামামা শাহরীন।

মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রি দিলারা হাফিজ


এক জীবনে অনেক ইতিহাস

আট দশকের বেশি দীর্ঘ জীবনে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক ফুটবলের মাঠে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে লড়েছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। সংসদ ও মন্ত্রিসভায় থেকে হয়েছেন রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ, আর জীবনের এক পর্যায়ে এসে বসেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসনেও। ক্রীড়াবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিক, সংগঠক ও লেখক—এই বহুমাত্রিক পরিচয় তাঁকে বাংলাদেশের জনজীবনে করে তুলেছে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন কেবল একজন মানুষের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া, মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিষয় : মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬


মাঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধ, তারপর রাষ্ট্রনায়ক: মেজর হাফিজের বর্ণাঢ্য জীব

প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাদের জীবন একইসঙ্গে ক্রীড়া, যুদ্ধ, সামরিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রপরিচালনার মতো ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে সমানভাবে আলো ছড়িয়েছে। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। মাঠের দ্রুতগতির ফরোয়ার্ড থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সেনা কর্মকর্তা, পরে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতা এবং সবশেষে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের আসনে বসা—প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি

১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্ম নেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর বাবা প্রয়াত ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ নিজেও একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন—১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে দুই দফায় পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মা করিমুন নেছা বেগম ছিলেন গৃহিণী। রাজনীতির সেই পারিবারিক ধারা পরবর্তী জীবনে হাফিজ উদ্দিনের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মাঠ কাঁপানো ফুটবলার ও দ্রুততম মানব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন হাফিজ উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়কত্বও করেছেন তিনি। মাঠের বাইরে ট্র্যাকেও ছিলেন সমান পারদর্শী—১৯৬৪, ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সাল, টানা তিন মৌসুম ১০০ ও ২০০ মিটারে রেকর্ড টাইমিং গড়ে তিনি হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব।

ফুটবলার মেজর হাফিজ


১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি খেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে, যা সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের কোনো খেলোয়াড়ের জন্য ছিল বিরল অর্জন। ১৯৭০ সালে দলের অধিনায়কও নির্বাচিত হন তিনি—একমাত্র বাঙালি হিসেবে রেঙ্গুনে এশিয়ান কাপ খেলতে যান, খেলেছেন সৌদি আরবের বিপক্ষে ঢাকায়, সফর করেছেন ইরান ও তুরস্কেও। ঘরোয়া ফুটবলেও তাঁর নাম স্মরণীয়—ঢাকা ফুটবল লিগে প্রথম ডাবল হ্যাটট্রিকের কীর্তি তাঁরই, ১৯৭৩ সালে ফায়ার সার্ভিসের বিপক্ষে মোহামেডানের ৬-০ গোলের জয়ে ছয় গোলই এসেছিল তাঁর পা থেকে।

যুদ্ধক্ষেত্রে বীর বিক্রম

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন হাফিজ উদ্দিন। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হলে তিনি বিদ্রোহী বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের অন্যতম হয়ে ওঠেন। জীবনবাজি রেখে সহযোদ্ধাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। রণাঙ্গনে অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতার পর তাঁকে দেওয়া হয় দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর বিক্রম’।

বীর বিক্রম পদকসহ মেজর হাফিজ


সংগঠক হাফিজ: বাফুফে থেকে ফিফা

স্বাধীনতার পর সেনাজীবন ছেড়ে আবারও ফুটবলে সক্রিয় হন হাফিজ উদ্দিন। শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, সংগঠক হিসেবেও দেশের ফুটবলের উন্নয়নে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি, নির্বাচিত হন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সহ-সভাপতি হিসেবে এবং সদস্য হন ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটিরও। ১৯৮০ সালে তিনি ভূষিত হন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে, আর ফুটবলে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে ২০০৪ সালে পান ফিফার সর্বোচ্চ সম্মাননা।

রাজনীতির মাঠে দীর্ঘ পথচলা

সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর বাবার পথ ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন হাফিজ উদ্দিন। ভোলা-৩ আসন থেকে টানা ছয়বারসহ মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বাণিজ্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমি

সংসদ সদস্য মেজর হাফিজ

স্পিকার থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

স্পিকার মেজর হাফিজ

২০২৬ সালের ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই দিন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান, উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ


এরপর ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই ঘটে আরেক নাটকীয় মোড়। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং নিজে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা রয়েছে। এই দায়িত্বপ্রাপ্তির খবরে তাঁর নিজ এলাকা ভোলার লালমোহনে আনন্দ মিছিল বের করেন স্থানীয় মানুষ।

ফুটবলার থেকে মুক্তিযোদ্ধা, মন্ত্রী, স্পিকার এবং সবশেষে রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া—আট দশকের বেশি দীর্ঘ এই জীবনের প্রতিটি বাঁকই যেন বাংলাদেশের ইতিহাসেরই এক-একটি অধ্যায়।

লেখক হাফিজ ও ব্যক্তিজীবন

মেজর হাফিজের ব্যক্তিজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর লেখালেখি। মুক্তিযুদ্ধ, সেনাজীবন, গণতন্ত্র ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে তিনি রচনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ, যেখানে নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা।


মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এর লেখা বই

মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এর লেখা বই


ব্যক্তিজীবনে হাফিজ উদ্দিনের স্ত্রী দিলারা হাফিজ ছিলেন একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। দীর্ঘ ৫৪ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁদের দুই ছেলে শাহরুখ হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ এবং এক মেয়ে শামামা শাহরীন।

মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রি দিলারা হাফিজ


এক জীবনে অনেক ইতিহাস

আট দশকের বেশি দীর্ঘ জীবনে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক ফুটবলের মাঠে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে লড়েছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। সংসদ ও মন্ত্রিসভায় থেকে হয়েছেন রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ, আর জীবনের এক পর্যায়ে এসে বসেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসনেও। ক্রীড়াবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিক, সংগঠক ও লেখক—এই বহুমাত্রিক পরিচয় তাঁকে বাংলাদেশের জনজীবনে করে তুলেছে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন কেবল একজন মানুষের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া, মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত