সম্পাদকীয়
ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (R&AW), সংক্ষেপে ‘র’, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নানা অধ্যায়ে এই সংস্থার নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ‘র’-এর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও অভিযোগ রয়েছে।
এই আলোচনার পটভূমি বুঝতে হলে ‘র’-এর প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার দিকে ফিরে তাকাতে হয়।
‘র’-এর প্রতিষ্ঠা এবং প্রথম দিকের কার্যক্রম
১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের পর ভারতের গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে দিল্লি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় Research and Analysis Wing (R&AW)। সংস্থাটির প্রথম প্রধান ছিলেন কিংবদন্তি গোয়েন্দা কর্মকর্তা আর. এন. কাও।
সংস্থাটির মূল দায়িত্ব ছিল ভারতের সীমান্তের বাইরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কৌশলগত বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন হলে গোপন অপারেশন পরিচালনা করা। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট—১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—‘র’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধে ‘র’-এর সম্পৃক্ততা
বিভিন্ন গবেষণা ও স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মার্চের আগেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গতিবিধির ওপর নিবিড় নজর রাখছিল ‘র’। অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পর পরিস্থিতি আরও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, গেরিলা অভিযানের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানের তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে ‘র’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে একাধিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হাজার হাজার তরুণকে গেরিলা যুদ্ধ, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং আধুনিক অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়েও সংস্থাটির সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন লেখক তুলে ধরেছেন।
গবেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ে এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরাজয় ত্বরান্বিত হয়।
স্বাধীনতার পর সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। ১৯৭১ সালের সহযোগিতার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ।
সাবেক ‘র’ কর্মকর্তা বি. রমনের স্মৃতিকথায় দাবি করা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থানের বিষয়ে আর. এন. কাও তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। তবে সেই সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায়নি বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।
সামরিক শাসন এবং পাল্টাপাল্টি নিরাপত্তা কৌশল
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সে সময় ভারত অভিযোগ করে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় ছিল।
অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণায় অভিযোগ রয়েছে, এর পাল্টা কৌশল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। গবেষক সুবীর ভৌমিকসহ কয়েকজন লেখক এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভারতের অগ্রাধিকার
১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন।
ভারতের বিভিন্ন কৌশলগত বিশ্লেষণে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আইএসআই এবং উলফার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। বিশেষ করে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনাকে ভারত তাদের নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে দলটিকে দিল্লির জন্য তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষক উল্লেখ করেছেন।
২০০৯-পরবর্তী সময় এবং বিতর্ক
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উলফার শীর্ষ নেতাদের ভারতের কাছে হস্তান্তরসহ সন্ত্রাসবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ দিল্লির কাছে শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্ব আরও বাড়ায়।
তবে এখান থেকেই নতুন বিতর্কেরও জন্ম হয়।
বাংলাদেশের বিরোধী দল, কয়েকজন গবেষক এবং কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ভারতের নীতিগত সমর্থন আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল। এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশিত হলেও, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি নির্বাচন পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করেছে—এমন দাবি প্রকাশ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিতর্ক
শেখ হাসিনাকে ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এমন মতামত কয়েকজন গবেষক ও বিশ্লেষকের লেখায় পাওয়া যায়। তবে তাঁকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ‘পরীক্ষিত এজেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করার মতো দাবির পক্ষে কোনো সরকারি দলিল, আদালতের রায় বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্লেষণে বাংলাদেশ নীতিতে দিল্লির ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে’ রাখার কৌশল নিয়ে আত্মসমালোচনার আলোচনা উঠে এসেছে। সেখানে আওয়ামী লীগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে ভারতের একটি কৌশলগত ভুল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং ‘র’-এর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনেও চলবে। তবে ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত তথ্য, গবেষণালব্ধ উপসংহার এবং রাজনৈতিক অভিযোগ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনীতিতে বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রমাণের মানদণ্ডও সমানভাবে অপরিহার্য।
বিষয় : শেখ হাসিনা র
2.png)
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬
ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (R&AW), সংক্ষেপে ‘র’, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নানা অধ্যায়ে এই সংস্থার নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ‘র’-এর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও অভিযোগ রয়েছে।
এই আলোচনার পটভূমি বুঝতে হলে ‘র’-এর প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার দিকে ফিরে তাকাতে হয়।
‘র’-এর প্রতিষ্ঠা এবং প্রথম দিকের কার্যক্রম
১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের পর ভারতের গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে দিল্লি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় Research and Analysis Wing (R&AW)। সংস্থাটির প্রথম প্রধান ছিলেন কিংবদন্তি গোয়েন্দা কর্মকর্তা আর. এন. কাও।
সংস্থাটির মূল দায়িত্ব ছিল ভারতের সীমান্তের বাইরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কৌশলগত বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন হলে গোপন অপারেশন পরিচালনা করা। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট—১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—‘র’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধে ‘র’-এর সম্পৃক্ততা
বিভিন্ন গবেষণা ও স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মার্চের আগেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গতিবিধির ওপর নিবিড় নজর রাখছিল ‘র’। অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পর পরিস্থিতি আরও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, গেরিলা অভিযানের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানের তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে ‘র’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে একাধিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হাজার হাজার তরুণকে গেরিলা যুদ্ধ, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং আধুনিক অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়েও সংস্থাটির সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন লেখক তুলে ধরেছেন।
গবেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ে এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরাজয় ত্বরান্বিত হয়।
স্বাধীনতার পর সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। ১৯৭১ সালের সহযোগিতার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ।
সাবেক ‘র’ কর্মকর্তা বি. রমনের স্মৃতিকথায় দাবি করা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থানের বিষয়ে আর. এন. কাও তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। তবে সেই সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায়নি বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।
সামরিক শাসন এবং পাল্টাপাল্টি নিরাপত্তা কৌশল
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সে সময় ভারত অভিযোগ করে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় ছিল।
অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণায় অভিযোগ রয়েছে, এর পাল্টা কৌশল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। গবেষক সুবীর ভৌমিকসহ কয়েকজন লেখক এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভারতের অগ্রাধিকার
১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন।
ভারতের বিভিন্ন কৌশলগত বিশ্লেষণে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আইএসআই এবং উলফার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। বিশেষ করে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনাকে ভারত তাদের নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে দলটিকে দিল্লির জন্য তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষক উল্লেখ করেছেন।
২০০৯-পরবর্তী সময় এবং বিতর্ক
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উলফার শীর্ষ নেতাদের ভারতের কাছে হস্তান্তরসহ সন্ত্রাসবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ দিল্লির কাছে শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্ব আরও বাড়ায়।
তবে এখান থেকেই নতুন বিতর্কেরও জন্ম হয়।
বাংলাদেশের বিরোধী দল, কয়েকজন গবেষক এবং কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ভারতের নীতিগত সমর্থন আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল। এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশিত হলেও, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি নির্বাচন পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করেছে—এমন দাবি প্রকাশ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিতর্ক
শেখ হাসিনাকে ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এমন মতামত কয়েকজন গবেষক ও বিশ্লেষকের লেখায় পাওয়া যায়। তবে তাঁকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ‘পরীক্ষিত এজেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করার মতো দাবির পক্ষে কোনো সরকারি দলিল, আদালতের রায় বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্লেষণে বাংলাদেশ নীতিতে দিল্লির ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে’ রাখার কৌশল নিয়ে আত্মসমালোচনার আলোচনা উঠে এসেছে। সেখানে আওয়ামী লীগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে ভারতের একটি কৌশলগত ভুল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং ‘র’-এর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনেও চলবে। তবে ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত তথ্য, গবেষণালব্ধ উপসংহার এবং রাজনৈতিক অভিযোগ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনীতিতে বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রমাণের মানদণ্ডও সমানভাবে অপরিহার্য।
2.png)