আন্তর্জাতিক
বিশ্ব এখন একটি পুরোনো সভ্যতার অবসান এবং নতুন এক সভ্যতার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার মতে, বিদ্যমান সভ্যতা মানুষের মৌলিক চাহিদা ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ইতালির কাস্তেল গানদোলফোর ‘বর্গো লাউদাতো সি’-তে ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলি অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড নিউক্লিয়ার ওয়ার’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আত্মবিনাশী প্রবণতা। তার ভাষায়, পরিবেশের অব্যাহত ধ্বংস এবং অল্প কয়েকজনের হাতে সম্পদের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন—এই দুটি কারণ বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অথচ বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এ সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রচলিত আশাবাদের বিপরীতে তিনি বলেন, শুধু নতুন প্রযুক্তি এই সংকট কাটাতে পারবে না। বরং যথাযথ নীতি না থাকলে এআই সম্পদের বৈষম্য আরও বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরও সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করবে।
কর্মসংস্থানের ওপর এআইয়ের প্রভাব প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, মূল উদ্বেগ চাকরি হারানো নয়; বরং এমন একটি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলছে। তিনি বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তাই শুধু অন্যের নির্দেশ পালন নয়, নতুন কিছু সৃষ্টি করার সুযোগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
তরুণদের ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং প্রচলিত ক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতার কারণে বর্তমান প্রজন্ম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম। তাদের ওপর ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার সময় শেষ হয়েছে। বরং তারা কেমন পৃথিবী গড়তে চায় এবং বর্তমান বিশ্বে কী পরিবর্তন প্রয়োজন—সেটি শোনার সময় এসেছে।
ড. ইউনূস বলেন, এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে, যা নিয়ে মানবজাতি সত্যিকার অর্থেই গর্ব করতে পারে। এ লক্ষ্যে তিনি সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি ও তরুণদের বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং মানবকল্যাণমুখী ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নোবেল বিজয়ী, সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, ধর্মীয় নেতা এবং তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বর্গো লাউদাতো সি-এর সভাপতি কার্ডিনাল ফাবিও বাজ্জিও, প্রো-প্রিফেক্ট কার্ডিনাল অ্যাঞ্জেল ফার্নান্দেজ আরতিমে এবং গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলির সভাপতি ও ডোমাস কম্যুনিস ফাউন্ডেশনের এমেরিটাস সভাপতি কার্ডিনাল সিলভানো মারিয়া তোমাসি।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড্যানিয়েল হোল্জ, পন্টিফিশিয়াল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস-এর চ্যান্সেলর কার্ডিনাল পিটার টার্কসন, পন্টিফিশিয়াল অ্যাকাডেমি ফর লাইফ-এর সভাপতি আর্চবিশপ রেনজো পেগোরারো, হলিউড অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী শ্যারন স্টোনসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
সমাবেশ চলাকালে রোমানো প্রোদি, জোডি উইলিয়ামস, মারিয়া রেসা, ডেনিস মুকওয়েগে এবং হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসসহ বিভিন্ন দেশের নোবেল বিজয়ীরা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। ঘোষণাপত্রে সতর্ক করে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বিত বিকাশ মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য নজিরবিহীন ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিষয় : ড. মোহাম্মদ ইউনুস
2.png)
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬
বিশ্ব এখন একটি পুরোনো সভ্যতার অবসান এবং নতুন এক সভ্যতার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার মতে, বিদ্যমান সভ্যতা মানুষের মৌলিক চাহিদা ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ইতালির কাস্তেল গানদোলফোর ‘বর্গো লাউদাতো সি’-তে ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলি অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড নিউক্লিয়ার ওয়ার’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আত্মবিনাশী প্রবণতা। তার ভাষায়, পরিবেশের অব্যাহত ধ্বংস এবং অল্প কয়েকজনের হাতে সম্পদের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন—এই দুটি কারণ বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অথচ বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এ সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রচলিত আশাবাদের বিপরীতে তিনি বলেন, শুধু নতুন প্রযুক্তি এই সংকট কাটাতে পারবে না। বরং যথাযথ নীতি না থাকলে এআই সম্পদের বৈষম্য আরও বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরও সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করবে।
কর্মসংস্থানের ওপর এআইয়ের প্রভাব প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, মূল উদ্বেগ চাকরি হারানো নয়; বরং এমন একটি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলছে। তিনি বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তাই শুধু অন্যের নির্দেশ পালন নয়, নতুন কিছু সৃষ্টি করার সুযোগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
তরুণদের ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং প্রচলিত ক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতার কারণে বর্তমান প্রজন্ম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম। তাদের ওপর ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার সময় শেষ হয়েছে। বরং তারা কেমন পৃথিবী গড়তে চায় এবং বর্তমান বিশ্বে কী পরিবর্তন প্রয়োজন—সেটি শোনার সময় এসেছে।
ড. ইউনূস বলেন, এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে, যা নিয়ে মানবজাতি সত্যিকার অর্থেই গর্ব করতে পারে। এ লক্ষ্যে তিনি সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি ও তরুণদের বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং মানবকল্যাণমুখী ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নোবেল বিজয়ী, সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, ধর্মীয় নেতা এবং তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বর্গো লাউদাতো সি-এর সভাপতি কার্ডিনাল ফাবিও বাজ্জিও, প্রো-প্রিফেক্ট কার্ডিনাল অ্যাঞ্জেল ফার্নান্দেজ আরতিমে এবং গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলির সভাপতি ও ডোমাস কম্যুনিস ফাউন্ডেশনের এমেরিটাস সভাপতি কার্ডিনাল সিলভানো মারিয়া তোমাসি।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড্যানিয়েল হোল্জ, পন্টিফিশিয়াল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস-এর চ্যান্সেলর কার্ডিনাল পিটার টার্কসন, পন্টিফিশিয়াল অ্যাকাডেমি ফর লাইফ-এর সভাপতি আর্চবিশপ রেনজো পেগোরারো, হলিউড অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী শ্যারন স্টোনসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
সমাবেশ চলাকালে রোমানো প্রোদি, জোডি উইলিয়ামস, মারিয়া রেসা, ডেনিস মুকওয়েগে এবং হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসসহ বিভিন্ন দেশের নোবেল বিজয়ীরা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। ঘোষণাপত্রে সতর্ক করে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বিত বিকাশ মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য নজিরবিহীন ঝুঁকি তৈরি করছে।
2.png)