জাতীয়
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দিতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীরও সম্মতি রয়েছে। তাই এখন থেকেই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সেবার মান বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এতে সরকারের দায়ও কমবে। তার মতে, সরকারের হাতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন থাকবে, আর বিতরণ পরিচালনা করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন শহরে এ ধরনের মডেল সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান জ্বালানি খাতের সংকটের জন্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিকে দায়ী করে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তার মন্ত্রণালয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও ঘাটতি দেখতে পেয়েছেন।
এলএনজি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশে মাত্র দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনায় গ্যাস সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। এতে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলো সমস্যায় পড়েছে। অনেক এলাকায় এ নিয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে একটি স্থাপনায় সমস্যা হলেও সারা দেশে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।
খুলনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে গ্যাস সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা না রেখেই কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইনের ওপর নির্ভর করে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও সেই পাইপলাইন এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে কেন্দ্রটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলেও সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজার আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল রয়েছে, যা চলতি বিলের সঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সৎ ও দায়িত্বশীলভাবে মোকাবিলার চেষ্টা চলছে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিল্প খাতের বড় অংশের আয় ব্যাংক-সংক্রান্ত ব্যয়ে চলে যায়। আগের সরকারের সময় ব্যাংক খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং লুটপাটের কারণে অনেক আমানতকারী নিঃস্ব হয়েছেন। এসব অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে, যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলের প্রশংসা পেয়েছে। ক্লাস্টারভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাহিদা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং চীনের বিভিন্ন কোম্পানি এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে উৎসাহ দিতে কর রেয়াত ও হোল্ডিং ট্যাক্সে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে যারা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন না, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি কর আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম রিজওয়ান খান, আইডিকলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরসেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হক এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদসহ জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
2.png)
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দিতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীরও সম্মতি রয়েছে। তাই এখন থেকেই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সেবার মান বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এতে সরকারের দায়ও কমবে। তার মতে, সরকারের হাতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন থাকবে, আর বিতরণ পরিচালনা করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন শহরে এ ধরনের মডেল সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান জ্বালানি খাতের সংকটের জন্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিকে দায়ী করে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তার মন্ত্রণালয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও ঘাটতি দেখতে পেয়েছেন।
এলএনজি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশে মাত্র দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনায় গ্যাস সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। এতে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলো সমস্যায় পড়েছে। অনেক এলাকায় এ নিয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে একটি স্থাপনায় সমস্যা হলেও সারা দেশে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।
খুলনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে গ্যাস সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা না রেখেই কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইনের ওপর নির্ভর করে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও সেই পাইপলাইন এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে কেন্দ্রটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলেও সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজার আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল রয়েছে, যা চলতি বিলের সঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সৎ ও দায়িত্বশীলভাবে মোকাবিলার চেষ্টা চলছে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিল্প খাতের বড় অংশের আয় ব্যাংক-সংক্রান্ত ব্যয়ে চলে যায়। আগের সরকারের সময় ব্যাংক খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং লুটপাটের কারণে অনেক আমানতকারী নিঃস্ব হয়েছেন। এসব অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে, যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলের প্রশংসা পেয়েছে। ক্লাস্টারভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাহিদা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং চীনের বিভিন্ন কোম্পানি এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে উৎসাহ দিতে কর রেয়াত ও হোল্ডিং ট্যাক্সে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে যারা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন না, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি কর আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম রিজওয়ান খান, আইডিকলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরসেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হক এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদসহ জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
2.png)