জাতীয়
মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনের হাত থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রক্ষায় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বুধবারের একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। পুরো অর্থই সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে ব্যয় করা হবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ও ধনিয়া এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, বাঁধের ঢাল সুরক্ষা এবং পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
তবে প্রকল্পটি একনেকে পাঠানোর আগে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ব্যয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে মাত্র চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ৫০৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়কে অতিরিক্ত বলে উল্লেখ করে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর কয়েকটি খাত পুনর্বিন্যাস করে নদীতীর সংরক্ষণ ব্যয় সামান্য কমিয়ে ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বাঁধ পুনর্বাসন, ঢাল সুরক্ষা, পানি নিষ্কাশন কাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ক্রয় পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশোধন এনে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়।
সরকারি নথি অনুযায়ী, মেঘনা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর ভোলা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বর্তমানে শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া ইউনিয়নের প্রায় চার কিলোমিটার অরক্ষিত নদীতীরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া অতিজোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় মাটির বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পোল্ডারের ভেতরে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যাও বাড়ছে।
প্রকল্পের আওতায় চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সুরক্ষা এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে এবং প্রায় ৬৫ হাজার ৪৭২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই নদীতীর সংরক্ষণ কাজে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ব্যয় নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে পিইসি। জবাবে পাউবো জানায়, প্রকল্প এলাকায় নদীর স্কাওয়ার গভীরতা মাইনাস ৩৩ মিটার এবং পানির প্রবাহের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ দশমিক ০৬ মিটার। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য ৫০ থেকে ৭০ মিটার অ্যাপ্রন এবং প্রতি মিটারে ৯৫ ঘনমিটার ডাম্পিং ভলিউম প্রয়োজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর অর্ধেক জিওব্যাগ এবং বাকি অর্ধেক কংক্রিট ব্লক দিয়ে নির্মাণ করা হবে। সংস্থাটির দাবি, এর চেয়ে কম উপকরণ ব্যবহার করলে স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে না।
পিইসি আরও কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে দৌলতখানের মেদুয়া ইউনিয়নের ৮০০ মিটার বাঁধে কংক্রিট ব্লকের পরিবর্তে টার্ফিংসহ মাটির বাঁধ নির্মাণ, বাঁধ পুনর্বাসন ও ঢাল সুরক্ষার ব্যয় আলাদাভাবে দেখানো এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর প্রয়োজনীয় মাটির পরিমাণ ছক আকারে উপস্থাপনের নির্দেশ রয়েছে।
এ ছাড়া পানি নিষ্কাশন কাঠামোর ব্যয় ৩১ কোটি টাকার মধ্যে সীমিত রাখা, মূল্য ও ভৌত কন্টিনজেন্সি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা নির্ধারণ, প্রকল্প-পরবর্তী বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা এবং ক্রয় পরিকল্পনায় পদ্ধতি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২৩ সালের মে মাসে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) সম্পন্ন করে। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে প্রকল্পটির নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) ২২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১ দশমিক ৫৬ এবং অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। এ কারণে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে উল্লেখ করেছে। তবে এটি থেকে সরাসরি কোনো আর্থিক আয় হবে না বলে পৃথক আর্থিক বিশ্লেষণ করা হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে সুরক্ষা পাবে। পাশাপাশি উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী হওয়ায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়বে। এসব বিবেচনায় কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।
2.png)
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬
মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনের হাত থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রক্ষায় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বুধবারের একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। পুরো অর্থই সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে ব্যয় করা হবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ও ধনিয়া এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, বাঁধের ঢাল সুরক্ষা এবং পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
তবে প্রকল্পটি একনেকে পাঠানোর আগে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ব্যয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে মাত্র চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ৫০৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়কে অতিরিক্ত বলে উল্লেখ করে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর কয়েকটি খাত পুনর্বিন্যাস করে নদীতীর সংরক্ষণ ব্যয় সামান্য কমিয়ে ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বাঁধ পুনর্বাসন, ঢাল সুরক্ষা, পানি নিষ্কাশন কাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ক্রয় পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশোধন এনে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়।
সরকারি নথি অনুযায়ী, মেঘনা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর ভোলা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বর্তমানে শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া ইউনিয়নের প্রায় চার কিলোমিটার অরক্ষিত নদীতীরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া অতিজোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় মাটির বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পোল্ডারের ভেতরে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যাও বাড়ছে।
প্রকল্পের আওতায় চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সুরক্ষা এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে এবং প্রায় ৬৫ হাজার ৪৭২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই নদীতীর সংরক্ষণ কাজে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ব্যয় নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে পিইসি। জবাবে পাউবো জানায়, প্রকল্প এলাকায় নদীর স্কাওয়ার গভীরতা মাইনাস ৩৩ মিটার এবং পানির প্রবাহের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ দশমিক ০৬ মিটার। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য ৫০ থেকে ৭০ মিটার অ্যাপ্রন এবং প্রতি মিটারে ৯৫ ঘনমিটার ডাম্পিং ভলিউম প্রয়োজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর অর্ধেক জিওব্যাগ এবং বাকি অর্ধেক কংক্রিট ব্লক দিয়ে নির্মাণ করা হবে। সংস্থাটির দাবি, এর চেয়ে কম উপকরণ ব্যবহার করলে স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে না।
পিইসি আরও কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে দৌলতখানের মেদুয়া ইউনিয়নের ৮০০ মিটার বাঁধে কংক্রিট ব্লকের পরিবর্তে টার্ফিংসহ মাটির বাঁধ নির্মাণ, বাঁধ পুনর্বাসন ও ঢাল সুরক্ষার ব্যয় আলাদাভাবে দেখানো এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর প্রয়োজনীয় মাটির পরিমাণ ছক আকারে উপস্থাপনের নির্দেশ রয়েছে।
এ ছাড়া পানি নিষ্কাশন কাঠামোর ব্যয় ৩১ কোটি টাকার মধ্যে সীমিত রাখা, মূল্য ও ভৌত কন্টিনজেন্সি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা নির্ধারণ, প্রকল্প-পরবর্তী বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা এবং ক্রয় পরিকল্পনায় পদ্ধতি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২৩ সালের মে মাসে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) সম্পন্ন করে। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে প্রকল্পটির নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) ২২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১ দশমিক ৫৬ এবং অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। এ কারণে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে উল্লেখ করেছে। তবে এটি থেকে সরাসরি কোনো আর্থিক আয় হবে না বলে পৃথক আর্থিক বিশ্লেষণ করা হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে সুরক্ষা পাবে। পাশাপাশি উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী হওয়ায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়বে। এসব বিবেচনায় কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।
2.png)