সম্পাদকীয়
ভূখণ্ডের হিসেবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান। দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, স্বর্ণ, কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। কিন্তু বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্য, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতের শিকড় কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনায় নয়; বরং এর ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। বেলুচ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও উপজাতীয় সামাজিক কাঠামো এই অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় গড়ে তুলেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে অঞ্চলটি সরাসরি উপনিবেশে রূপান্তর না করে স্থানীয় শাসকদের মাধ্যমে পরিচালনা করা হতো। তৎকালীন কালাতের খান ও উপজাতীয় সরদারদের ঘিরে গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থা ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কৌশলের অংশ ছিল।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, কালাত রাষ্ট্র প্রথমে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। পরে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে অঞ্চলটির অন্তর্ভুক্তি ঘটে। তবে এই অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে বেলুচ জাতীয়তাবাদী অংশের একাংশ আপত্তি জানায় এবং একই বছর প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে একাধিক বিদ্রোহ ও সামরিক অভিযান সংঘটিত হয়েছে।
বেলুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর প্রধান অভিযোগ, প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে জাতীয় অর্থনীতি লাভবান হলেও সেই আয়ের ন্যায্য অংশ স্থানীয় জনগণ পায় না। গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থানের সূচকও জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এই অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এর মধ্যে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) অন্যতম আলোচিত সংগঠন। পাকিস্তান সরকার সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, তারা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় অঞ্চলটির অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতিও বেলুচিস্তান ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ তুলে আসছে। পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগের অনেকগুলো অস্বীকার করে এবং সেগুলোকে নিরাপত্তা অভিযান ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
সংকটকে আরও জটিল করেছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) এবং গওয়াদর বন্দর প্রকল্প। পাকিস্তান ও চীনের দৃষ্টিতে এগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৌশলগত প্রকল্প হলেও অনেক বেলুচ জাতীয়তাবাদীর অভিযোগ, এসব প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। তাদের আশঙ্কা, উন্নয়নের নামে স্থানীয়দের ভূমি ও সম্পদের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামও বেলুচ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে বলে বহু গবেষক উল্লেখ করেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বাংলাদেশকে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেও, দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এক নয়—এ বিষয়টিও বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে বেলুচিস্তানের সংকট শুধুমাত্র একটি আইন-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, মানবাধিকার, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক একটি সংকট। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, শুধুমাত্র সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশে চলমান এই অস্থিরতা ভবিষ্যতেও দেশটির অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যেতে পারে।
বিষয় : বেলুচিস্তান বেলুচিস্তান
2.png)
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
ভূখণ্ডের হিসেবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান। দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, স্বর্ণ, কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। কিন্তু বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্য, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতের শিকড় কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনায় নয়; বরং এর ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। বেলুচ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও উপজাতীয় সামাজিক কাঠামো এই অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় গড়ে তুলেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে অঞ্চলটি সরাসরি উপনিবেশে রূপান্তর না করে স্থানীয় শাসকদের মাধ্যমে পরিচালনা করা হতো। তৎকালীন কালাতের খান ও উপজাতীয় সরদারদের ঘিরে গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থা ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কৌশলের অংশ ছিল।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, কালাত রাষ্ট্র প্রথমে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। পরে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে অঞ্চলটির অন্তর্ভুক্তি ঘটে। তবে এই অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে বেলুচ জাতীয়তাবাদী অংশের একাংশ আপত্তি জানায় এবং একই বছর প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে একাধিক বিদ্রোহ ও সামরিক অভিযান সংঘটিত হয়েছে।
বেলুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর প্রধান অভিযোগ, প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে জাতীয় অর্থনীতি লাভবান হলেও সেই আয়ের ন্যায্য অংশ স্থানীয় জনগণ পায় না। গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থানের সূচকও জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এই অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এর মধ্যে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) অন্যতম আলোচিত সংগঠন। পাকিস্তান সরকার সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, তারা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় অঞ্চলটির অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতিও বেলুচিস্তান ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ তুলে আসছে। পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগের অনেকগুলো অস্বীকার করে এবং সেগুলোকে নিরাপত্তা অভিযান ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
সংকটকে আরও জটিল করেছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) এবং গওয়াদর বন্দর প্রকল্প। পাকিস্তান ও চীনের দৃষ্টিতে এগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৌশলগত প্রকল্প হলেও অনেক বেলুচ জাতীয়তাবাদীর অভিযোগ, এসব প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। তাদের আশঙ্কা, উন্নয়নের নামে স্থানীয়দের ভূমি ও সম্পদের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামও বেলুচ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে বলে বহু গবেষক উল্লেখ করেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বাংলাদেশকে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেও, দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এক নয়—এ বিষয়টিও বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে বেলুচিস্তানের সংকট শুধুমাত্র একটি আইন-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, মানবাধিকার, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক একটি সংকট। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, শুধুমাত্র সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশে চলমান এই অস্থিরতা ভবিষ্যতেও দেশটির অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যেতে পারে।
2.png)