সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বিশ্বকাপ দামামাবিশ্বকাপ দামামা

স্কালোনির সিদ্ধান্তেই কি ফসকে গেল বিশ্বকাপ?

স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনার নিষ্প্রভ ফুটবলের পর কোচ লিওনেল স্কালোনির কৌশল, একাদশ নির্বাচন ও ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। পরাজয়ের দায়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে এখন তিনিই।

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক
স্কালোনির সিদ্ধান্তেই কি ফসকে গেল বিশ্বকাপ?
ছবি -সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর লিওনেল স্কালোনির সংবাদ সম্মেলন ছিল আবেগঘন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মন্তব্যও তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা। তবে আবেগের আড়ালে এখন আরও বড় হয়ে উঠেছে কিছু ফুটবলীয় প্রশ্ন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার কৌশলগত ব্যর্থতার দায় কতটা কোচের, সেই আলোচনা জোরালো হয়েছে ফুটবল অঙ্গনে।

পুরো আসরে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত এগিয়েছে অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং লিওনেল মেসির অনন্য দক্ষতার ওপর ভর করে। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচে দলটি নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দই খুঁজে পায়নি। স্পেনের উচ্চ প্রেসিং ও বল দখলের ফুটবলের বিপক্ষে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা যেন দেখা যায়নি।

লাল কার্ডের পর একজন কম নিয়ে খেলা অবশ্যই ম্যাচকে কঠিন করে তোলে। কিন্তু তার আগ পর্যন্তও আর্জেন্টিনা আক্রমণে খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি। শেষদিকে যখন মরিয়া হয়ে সামনে উঠতে দেখা গেছে, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে—এই আগ্রাসী মানসিকতা যদি শুরু থেকেই থাকত, তাহলে কি ম্যাচের গল্প অন্যরকম হতে পারত?

পরিসংখ্যানও স্কালোনির পরিকল্পনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতর থেকে কার্যকর কোনো শট নিতে পারেনি। এমন একটি তথ্য স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়, আক্রমণ গড়ে তোলার প্রক্রিয়াতেই বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

শুরুর একাদশ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। আগের ম্যাচগুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখা লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ানো সিমিওনেকে সাইড বেঞ্চে রেখে নিকো গঞ্জালেজ ও রদ্রিগো ডি পলকে সুযোগ দেন স্কালোনি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি। গঞ্জালেজকে দ্বিতীয়ার্ধেই তুলে নিতে হয়েছে, আর ডি পলও পুরো টুর্নামেন্টে নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি।

আরেকটি আলোচিত সিদ্ধান্ত লাওতারো মার্তিনেজকে ঘিরে। নকআউট পর্বে গুরুত্বপূর্ণ গোল করা এই স্ট্রাইকার ফাইনালে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়ই পাননি। অথচ তাঁর প্রেসিং, আকাশে আধিপত্য এবং বক্সের ভেতরে উপস্থিতি স্পেনের রক্ষণকে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারত।

তরুণদের ব্যবহারেও ছিল স্পষ্ট রক্ষণশীলতা। ইতালিয়ান সিরি ‘আ’-তে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে আসা নিকো পাজ এবং বহুমুখী ডিফেন্ডার ভ্যালেন্তিন বার্কো পুরো টুর্নামেন্টেই খুব সীমিত সুযোগ পেয়েছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, অভিজ্ঞদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে গিয়ে স্কালোনি নতুন শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ হারিয়েছেন।

এখানেই ২০২২ সালের সঙ্গে বড় পার্থক্য দেখা যায়। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে এনজো ফার্নান্দেজ ও হুলিয়ান আলভারেজকে নিয়মিত একাদশে জায়গা দিয়েছিলেন স্কালোনি। সেই পরিবর্তনই পরে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার পুরো আসরে মাঝমাঠে সৃজনশীলতার সংকট দেখা দিলেও তিনি পরিচিত কাঠামো ভাঙতে অনীহা দেখিয়েছেন।

স্কোয়াড নির্বাচনের বিষয়টিও এখন ফুটবল বোদ্ধাদের আলোচনায়। ইনফর্ম এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া কিংবা জিওভানি লো সেলসোর মতো ফুটবলারদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের বিশ্বাস, তাদের সৃজনশীলতা ও বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মাঝমাঠে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারত।

কৌশলগত দিক থেকেও আর্জেন্টিনা ছিল অচেনা। দলটি বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি, আবার দ্রুত পাল্টা আক্রমণেও কার্যকর হতে পারেনি। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ধারাবাহিক সংযোগের অভাব ছিল স্পষ্ট। ফলে মেসি প্রায় পুরো ম্যাচেই বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং স্পেনের রক্ষণকে নিয়মিত পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।

চার বছর আগে কাতারের ফাইনালে যে আত্মবিশ্বাসী, গতিশীল ও আক্রমণাত্মক আর্জেন্টিনা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল, নিউ জার্সির ফাইনালে তার খুব কমই দেখা গেছে। তাই এই পরাজয়ের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু হার নয়; বরং স্কালোনির সিদ্ধান্ত, কৌশল এবং ম্যাচ পরিচালনাই। সামনে তিনি দায়িত্বে থাকুন কিংবা সরে দাঁড়ান, ২০২৬ বিশ্বকাপের এই ফাইনাল তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন আত্মসমালোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

বিষয় : বিশ্বকাপ ফুটবল লিওনেল স্কালোনি

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬


স্কালোনির সিদ্ধান্তেই কি ফসকে গেল বিশ্বকাপ?

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬

featured Image

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর লিওনেল স্কালোনির সংবাদ সম্মেলন ছিল আবেগঘন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মন্তব্যও তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা। তবে আবেগের আড়ালে এখন আরও বড় হয়ে উঠেছে কিছু ফুটবলীয় প্রশ্ন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার কৌশলগত ব্যর্থতার দায় কতটা কোচের, সেই আলোচনা জোরালো হয়েছে ফুটবল অঙ্গনে।

পুরো আসরে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত এগিয়েছে অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং লিওনেল মেসির অনন্য দক্ষতার ওপর ভর করে। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচে দলটি নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দই খুঁজে পায়নি। স্পেনের উচ্চ প্রেসিং ও বল দখলের ফুটবলের বিপক্ষে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা যেন দেখা যায়নি।

লাল কার্ডের পর একজন কম নিয়ে খেলা অবশ্যই ম্যাচকে কঠিন করে তোলে। কিন্তু তার আগ পর্যন্তও আর্জেন্টিনা আক্রমণে খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি। শেষদিকে যখন মরিয়া হয়ে সামনে উঠতে দেখা গেছে, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে—এই আগ্রাসী মানসিকতা যদি শুরু থেকেই থাকত, তাহলে কি ম্যাচের গল্প অন্যরকম হতে পারত?

পরিসংখ্যানও স্কালোনির পরিকল্পনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতর থেকে কার্যকর কোনো শট নিতে পারেনি। এমন একটি তথ্য স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়, আক্রমণ গড়ে তোলার প্রক্রিয়াতেই বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

শুরুর একাদশ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। আগের ম্যাচগুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখা লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ানো সিমিওনেকে সাইড বেঞ্চে রেখে নিকো গঞ্জালেজ ও রদ্রিগো ডি পলকে সুযোগ দেন স্কালোনি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি। গঞ্জালেজকে দ্বিতীয়ার্ধেই তুলে নিতে হয়েছে, আর ডি পলও পুরো টুর্নামেন্টে নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি।

আরেকটি আলোচিত সিদ্ধান্ত লাওতারো মার্তিনেজকে ঘিরে। নকআউট পর্বে গুরুত্বপূর্ণ গোল করা এই স্ট্রাইকার ফাইনালে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়ই পাননি। অথচ তাঁর প্রেসিং, আকাশে আধিপত্য এবং বক্সের ভেতরে উপস্থিতি স্পেনের রক্ষণকে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারত।

তরুণদের ব্যবহারেও ছিল স্পষ্ট রক্ষণশীলতা। ইতালিয়ান সিরি ‘আ’-তে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে আসা নিকো পাজ এবং বহুমুখী ডিফেন্ডার ভ্যালেন্তিন বার্কো পুরো টুর্নামেন্টেই খুব সীমিত সুযোগ পেয়েছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, অভিজ্ঞদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে গিয়ে স্কালোনি নতুন শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ হারিয়েছেন।

এখানেই ২০২২ সালের সঙ্গে বড় পার্থক্য দেখা যায়। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে এনজো ফার্নান্দেজ ও হুলিয়ান আলভারেজকে নিয়মিত একাদশে জায়গা দিয়েছিলেন স্কালোনি। সেই পরিবর্তনই পরে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার পুরো আসরে মাঝমাঠে সৃজনশীলতার সংকট দেখা দিলেও তিনি পরিচিত কাঠামো ভাঙতে অনীহা দেখিয়েছেন।

স্কোয়াড নির্বাচনের বিষয়টিও এখন ফুটবল বোদ্ধাদের আলোচনায়। ইনফর্ম এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া কিংবা জিওভানি লো সেলসোর মতো ফুটবলারদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের বিশ্বাস, তাদের সৃজনশীলতা ও বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মাঝমাঠে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারত।

কৌশলগত দিক থেকেও আর্জেন্টিনা ছিল অচেনা। দলটি বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি, আবার দ্রুত পাল্টা আক্রমণেও কার্যকর হতে পারেনি। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ধারাবাহিক সংযোগের অভাব ছিল স্পষ্ট। ফলে মেসি প্রায় পুরো ম্যাচেই বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং স্পেনের রক্ষণকে নিয়মিত পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।

চার বছর আগে কাতারের ফাইনালে যে আত্মবিশ্বাসী, গতিশীল ও আক্রমণাত্মক আর্জেন্টিনা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল, নিউ জার্সির ফাইনালে তার খুব কমই দেখা গেছে। তাই এই পরাজয়ের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু হার নয়; বরং স্কালোনির সিদ্ধান্ত, কৌশল এবং ম্যাচ পরিচালনাই। সামনে তিনি দায়িত্বে থাকুন কিংবা সরে দাঁড়ান, ২০২৬ বিশ্বকাপের এই ফাইনাল তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন আত্মসমালোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত