সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সম্পাদকীয়সম্পাদকীয়

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: আবেগ নয়, আইনের শাসনের পরীক্ষা

রাজনীতি যদি সাধারণ মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান বা কর্মসংস্থানের বদলে কেবল নেত্রীর ফেরা বা না ফেরার গোলকধাঁধায় বন্দি থাকে, তবে বুঝতে হবে—সেটি জনগণের রাজনীতি নয়, সেটি কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এক ক্ষয়িষ্ণু রূপ। সময় ও বিবেচনাবোধই এখন দেশের জনগণকে এই ফাঁদ চিনতে সাহায্য করবে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: আবেগ নয়, আইনের শাসনের পরীক্ষা
ছবি -সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার নতুন সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি রাজনৈতিক আবেগের নয়; এটি মূলত আইনের শাসন, বিচারিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর রায়ে শেখ হাসিনা দণ্ডিত। আইনগতভাবে তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি। ফলে তাঁর দেশে ফেরা কিংবা না ফেরা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয় হতে পারে না; এটি সম্পূর্ণরূপে একটি বিচারিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত। রাষ্ট্র যদি নিজস্ব আদালতের রায় বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তবে সেটি অবশ্যই প্রচলিত আইন, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার নজির রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন, অভিবাসন বিধান এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই বিচার কার্যকর করা সম্ভব। তবে প্রতিটি মামলার নিজস্ব আইনি বাস্তবতা রয়েছে; তাই অতীতের উদাহরণকে বর্তমানের সঙ্গে সরলভাবে মিলিয়ে দেখাও সমীচীন নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপিলের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী আপিলের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে। সেই সময়সীমা অতিক্রমের পর কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ারের বিষয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা জনমত কোনোভাবেই আদালতের সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না। আইনের ব্যাখ্যা আদালতই দেবে, রাজনীতি নয়।

শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ভারত হওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি কাঠামো, উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ আইন এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা—সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে। এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ বা আবেগনির্ভর অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককেও অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য এবং ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতির খবর রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এগুলো বিচারিক বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না। আদালতের রায় কার্যকর হওয়ার আগে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা জনসমর্থনের প্রদর্শন আইনগত অবস্থানকে বদলে দিতে পারে না। একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ থেকেও প্রতিশোধমূলক মনোভাব বা বিচারপূর্ব রাজনৈতিক রায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি বা দলের নয়, প্রতিষ্ঠানের শক্তি দেখতে চায়। বিচারব্যবস্থা যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই হবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন। আর যদি আইন ব্যক্তিভেদে ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়, তবে তা শুধু একটি মামলার নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না—এটি সময়ই বলবে। কিন্তু তিনি ফিরলে তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ এবং না ফিরলে তাঁকে ফিরিয়ে আনার রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা—উভয় ক্ষেত্রেই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত আইন। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তায় নয়, বরং আদালতের রায় কার্যকর করার সক্ষমতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে নিহিত।

বিষয় : শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬


শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: আবেগ নয়, আইনের শাসনের পরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার নতুন সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি রাজনৈতিক আবেগের নয়; এটি মূলত আইনের শাসন, বিচারিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর রায়ে শেখ হাসিনা দণ্ডিত। আইনগতভাবে তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি। ফলে তাঁর দেশে ফেরা কিংবা না ফেরা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয় হতে পারে না; এটি সম্পূর্ণরূপে একটি বিচারিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত। রাষ্ট্র যদি নিজস্ব আদালতের রায় বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তবে সেটি অবশ্যই প্রচলিত আইন, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার নজির রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন, অভিবাসন বিধান এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই বিচার কার্যকর করা সম্ভব। তবে প্রতিটি মামলার নিজস্ব আইনি বাস্তবতা রয়েছে; তাই অতীতের উদাহরণকে বর্তমানের সঙ্গে সরলভাবে মিলিয়ে দেখাও সমীচীন নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপিলের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী আপিলের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে। সেই সময়সীমা অতিক্রমের পর কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ারের বিষয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা জনমত কোনোভাবেই আদালতের সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না। আইনের ব্যাখ্যা আদালতই দেবে, রাজনীতি নয়।

শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ভারত হওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি কাঠামো, উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ আইন এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা—সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে। এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ বা আবেগনির্ভর অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককেও অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য এবং ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতির খবর রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এগুলো বিচারিক বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না। আদালতের রায় কার্যকর হওয়ার আগে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা জনসমর্থনের প্রদর্শন আইনগত অবস্থানকে বদলে দিতে পারে না। একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ থেকেও প্রতিশোধমূলক মনোভাব বা বিচারপূর্ব রাজনৈতিক রায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি বা দলের নয়, প্রতিষ্ঠানের শক্তি দেখতে চায়। বিচারব্যবস্থা যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই হবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন। আর যদি আইন ব্যক্তিভেদে ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়, তবে তা শুধু একটি মামলার নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না—এটি সময়ই বলবে। কিন্তু তিনি ফিরলে তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ এবং না ফিরলে তাঁকে ফিরিয়ে আনার রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা—উভয় ক্ষেত্রেই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত আইন। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তায় নয়, বরং আদালতের রায় কার্যকর করার সক্ষমতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে নিহিত।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত