সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

জিয়া হত্যায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হওয়া মোজাফফরের ভুমিকা কি?

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে সামনে এসেছে সেই রক্তাক্ত ঘটনার বহু অনুত্তরিত প্রশ্ন। ঐতিহাসিক গ্রন্থ, স্মৃতিকথা ও সরকারি তথ্য মিলিয়ে তাঁর ভূমিকা ও দীর্ঘ পলাতক জীবনের নানা দিক এখন আলোচনায়।

জিয়া হত্যায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হওয়া  মোজাফফরের ভুমিকা কি?
ছবি -সংগৃহীত

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হয়েছেন ওই মামলার অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৭ বছর। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।


ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পর বিষয়টি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোন আইনি বা সামরিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিংবা নতুন কোনো অভিযোগ আনা হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে ডিএমপির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

মোজাফফরের গ্রেপ্তারের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ডের বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার আগে ও পরে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কতটা অবগত ছিলেন এবং চার দশকেরও বেশি সময় কীভাবে আত্মগোপনে থাকতে সক্ষম হয়েছেন—এসব বিষয় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা, ঐতিহাসিক বিবরণ ও স্মৃতিকথায় মোজাফফরের নাম বারবার এসেছে। এসব সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে থাকা সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।

সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড-এ লিখেছেন, সার্কিট হাউসে গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তাঁর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন মেজর মোজাফফর এবং লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।

বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় মোজাফফর দৃশ্যত বিচলিত ছিলেন। মোসলেহউদ্দিন নাকি রাষ্ট্রপতিকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একই বইয়ে দাবি করা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিনের ধারণা ছিল, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা নয়; তাঁকে কেবল সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান কাছ থেকে সাবমেশিনগান দিয়ে গুলি চালান বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে। একই গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর দাবি করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না।

তবে এসব বক্তব্য কোনো আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি কিংবা বিচারিকভাবে যাচাইও করা হয়নি। ফলে এগুলো ঐতিহাসিক সূত্রে উদ্ধৃত দাবি হিসেবেই বিবেচিত।

মাসকারেনহাসের বর্ণনায় আরও উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা পুনরায় সার্কিট হাউসে ফিরে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও ডায়েরি খোঁজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জিয়াউর রহমান এবং নিহত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মরদেহ সামরিক যানে সরিয়ে নেওয়ার কথাও বইটিতে রয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফরের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। সেখানে তথাকথিত ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে বইটির দাবি।

এসব বিবরণ সত্য হলে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু না জানার দাবি এবং হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়।


বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পালানোর সময়ও মোজাফফর মূল দলে ছিলেন বলে একই গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। পথে সরকার-অনুগত বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত বা গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বইটি প্রকাশের সময়ও তিনি পুরস্কার ঘোষিত পলাতক ছিলেন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর বিদ্রোহের অভিযোগে ১৮ সেনা কর্মকর্তার কোর্ট মার্শাল হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মোজাফফর এবং মেজর এস এম খালেদ গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান। তাঁদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

তবে মোজাফফরের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে কোনো বিচারিক রায় হয়েছিল কি না, পুরোনো সামরিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনও কার্যকর রয়েছে কি না কিংবা বর্তমান আইনি ভিত্তি কী—এসব বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

মোজাফফরের দীর্ঘ পলাতক জীবনের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক-এ।

স্মৃতিকথা অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি ব্যাংককে মেজর এস এম খালেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ভারত থেকে মোজাফফরও সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। ওই আলোচনায় তাঁরা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিজেদের বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন।

মইনুল হোসেনের লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি ছিল—মূল পরিকল্পনা ছিল রাষ্ট্রপতিকে সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার উদ্দেশ্য শুরু থেকেই ছিল না।

একই স্মৃতিকথায় বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর মতিউর রহমান কাছ থেকে গুলি চালান এবং উপস্থিত অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়েন। তবে সেখানে কোন তথ্য মোজাফফরের ব্যক্তিগত বক্তব্য এবং কোনটি খালেদের বক্তব্য—তা আলাদাভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। উপরন্তু, ওই দুই ব্যক্তিই তখন পলাতক অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁদের বক্তব্য আদালতে কখনো বিচারিক যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়নি।

মইনুল হোসেন আরও লিখেছেন, ১৯৯১ সালে দেশে ফিরে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই বৈঠকের বিষয়বস্তু জানিয়েছিলেন। পরে ১৯৯৩ সালে মেজর খালেদ ব্যাংককে মারা যান। ফলে সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় মোজাফফরই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে রয়ে যান।

ডিএমপির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকার পর গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তবে তিনি কত বছর ভারতে ছিলেন, কী পরিচয়ে বসবাস করেছেন, কীভাবে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেছেন কিংবা কবে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন—এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এ ছাড়া বনানীর যে বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেখানে কত দিন ধরে অবস্থান করছিলেন, নিজের পরিচয়ে ছিলেন কি না অথবা কার সহায়তায় দেশে বসবাস করছিলেন—এসব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা নাকি আটক করার পরিকল্পনা ছিল, হত্যার পর কেন আবার সার্কিট হাউসে ফেরা হয়েছিল এবং ব্যক্তিগত কাগজপত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

একই সঙ্গে তাঁর চার দশকের বেশি সময়ের পলাতক জীবনের নেপথ্য ঘটনাও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কে বা কারা তাঁকে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে সহায়তা করেছেন এবং কীভাবে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলেছেন—এসব বিষয়ও এখন অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে।

তবে এখন পর্যন্ত মোজাফফর হোসেনের ব্যক্তিগত কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সামরিক তদন্তের নথি কিংবা বর্তমান আইনি অবস্থান সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। ফলে ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত তথ্য, স্মৃতিকথায় উঠে আসা দাবি এবং বর্তমান পুলিশের বক্তব্য—সবকিছুই এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

বিষয় : জিয়া হত্যা মোজাফফর

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬


জিয়া হত্যায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হওয়া মোজাফফরের ভুমিকা কি?

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হয়েছেন ওই মামলার অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৭ বছর। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।


ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পর বিষয়টি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোন আইনি বা সামরিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিংবা নতুন কোনো অভিযোগ আনা হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে ডিএমপির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

মোজাফফরের গ্রেপ্তারের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ডের বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার আগে ও পরে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কতটা অবগত ছিলেন এবং চার দশকেরও বেশি সময় কীভাবে আত্মগোপনে থাকতে সক্ষম হয়েছেন—এসব বিষয় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা, ঐতিহাসিক বিবরণ ও স্মৃতিকথায় মোজাফফরের নাম বারবার এসেছে। এসব সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে থাকা সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।

সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড-এ লিখেছেন, সার্কিট হাউসে গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তাঁর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন মেজর মোজাফফর এবং লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।

বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় মোজাফফর দৃশ্যত বিচলিত ছিলেন। মোসলেহউদ্দিন নাকি রাষ্ট্রপতিকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একই বইয়ে দাবি করা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিনের ধারণা ছিল, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা নয়; তাঁকে কেবল সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান কাছ থেকে সাবমেশিনগান দিয়ে গুলি চালান বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে। একই গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর দাবি করেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না।

তবে এসব বক্তব্য কোনো আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি কিংবা বিচারিকভাবে যাচাইও করা হয়নি। ফলে এগুলো ঐতিহাসিক সূত্রে উদ্ধৃত দাবি হিসেবেই বিবেচিত।

মাসকারেনহাসের বর্ণনায় আরও উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা পুনরায় সার্কিট হাউসে ফিরে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও ডায়েরি খোঁজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জিয়াউর রহমান এবং নিহত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মরদেহ সামরিক যানে সরিয়ে নেওয়ার কথাও বইটিতে রয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফরের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। সেখানে তথাকথিত ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে বইটির দাবি।

এসব বিবরণ সত্য হলে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু না জানার দাবি এবং হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়।


বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পালানোর সময়ও মোজাফফর মূল দলে ছিলেন বলে একই গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। পথে সরকার-অনুগত বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত বা গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বইটি প্রকাশের সময়ও তিনি পুরস্কার ঘোষিত পলাতক ছিলেন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর বিদ্রোহের অভিযোগে ১৮ সেনা কর্মকর্তার কোর্ট মার্শাল হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মোজাফফর এবং মেজর এস এম খালেদ গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান। তাঁদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

তবে মোজাফফরের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে কোনো বিচারিক রায় হয়েছিল কি না, পুরোনো সামরিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনও কার্যকর রয়েছে কি না কিংবা বর্তমান আইনি ভিত্তি কী—এসব বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

মোজাফফরের দীর্ঘ পলাতক জীবনের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক-এ।

স্মৃতিকথা অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি ব্যাংককে মেজর এস এম খালেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ভারত থেকে মোজাফফরও সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। ওই আলোচনায় তাঁরা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিজেদের বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন।

মইনুল হোসেনের লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি ছিল—মূল পরিকল্পনা ছিল রাষ্ট্রপতিকে সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার উদ্দেশ্য শুরু থেকেই ছিল না।

একই স্মৃতিকথায় বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর মতিউর রহমান কাছ থেকে গুলি চালান এবং উপস্থিত অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়েন। তবে সেখানে কোন তথ্য মোজাফফরের ব্যক্তিগত বক্তব্য এবং কোনটি খালেদের বক্তব্য—তা আলাদাভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। উপরন্তু, ওই দুই ব্যক্তিই তখন পলাতক অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁদের বক্তব্য আদালতে কখনো বিচারিক যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়নি।

মইনুল হোসেন আরও লিখেছেন, ১৯৯১ সালে দেশে ফিরে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই বৈঠকের বিষয়বস্তু জানিয়েছিলেন। পরে ১৯৯৩ সালে মেজর খালেদ ব্যাংককে মারা যান। ফলে সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় মোজাফফরই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে রয়ে যান।

ডিএমপির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকার পর গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তবে তিনি কত বছর ভারতে ছিলেন, কী পরিচয়ে বসবাস করেছেন, কীভাবে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেছেন কিংবা কবে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন—এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এ ছাড়া বনানীর যে বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেখানে কত দিন ধরে অবস্থান করছিলেন, নিজের পরিচয়ে ছিলেন কি না অথবা কার সহায়তায় দেশে বসবাস করছিলেন—এসব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা নাকি আটক করার পরিকল্পনা ছিল, হত্যার পর কেন আবার সার্কিট হাউসে ফেরা হয়েছিল এবং ব্যক্তিগত কাগজপত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

একই সঙ্গে তাঁর চার দশকের বেশি সময়ের পলাতক জীবনের নেপথ্য ঘটনাও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কে বা কারা তাঁকে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে সহায়তা করেছেন এবং কীভাবে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলেছেন—এসব বিষয়ও এখন অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে।

তবে এখন পর্যন্ত মোজাফফর হোসেনের ব্যক্তিগত কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সামরিক তদন্তের নথি কিংবা বর্তমান আইনি অবস্থান সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। ফলে ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত তথ্য, স্মৃতিকথায় উঠে আসা দাবি এবং বর্তমান পুলিশের বক্তব্য—সবকিছুই এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত