আন্তর্জাতিক
বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার পথে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ফেডারেল সরকারের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী চার বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবেন না। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, একাডেমিক প্রোগ্রাম বদল এবং পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার সময়সীমাও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হচ্ছে।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই নতুন বিধান কার্যকর হবে। প্রশাসনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করেছেন। সেই প্রবণতা বন্ধ করা, ভিসার অপব্যবহার রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
এত দিন এফ–১ শিক্ষার্থী ভিসা ও জে–১ এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীরা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ নীতির আওতায় পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকতে পারতেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই তাঁদের ভিসা–সংক্রান্ত অবস্থান নবায়নের বিষয়টি তদারক করত। নতুন ব্যবস্থায় সেই নমনীয়তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করা হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ফেডারেল সরকারের সরাসরি অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিনের দাবি, বহু বছর ধরে অনির্দিষ্ট সময় থাকার সুযোগ অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহারের পথ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, অনেকেই একের পর এক কোর্সে ভর্তি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান দীর্ঘায়িত করেছেন, যা বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
তবে এই যুক্তি নিয়ে একমত নয় আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের বড় অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অধিকাংশ স্নাতক ডিগ্রি চার বছরে শেষ হলেও স্নাতকোত্তর, পিএইচডি এবং গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি শেষ করতে প্রায়ই আরও দীর্ঘ সময় লাগে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গবেষণানির্ভর বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকল্প, গবেষণাপত্র প্রকাশ কিংবা অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ের বাইরে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়।
নতুন নীতিতে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সময়সীমাও কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর অন্য ভিসায় পরিবর্তন অথবা যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের জন্য ৬০ দিনের সুযোগ ছিল। নতুন নিয়মে সেটি কমে দাঁড়াবে মাত্র ৩০ দিনে। ফলে চাকরি, গবেষণা বা পরবর্তী একাডেমিক পরিকল্পনা নিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক অলাভজনক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেটরস (নাফসা) এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ফান্টা আওর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর একটি ব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতির পরিবেশ তৈরি হবে, অথচ যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তকে কেবল ভিসা–সংক্রান্ত প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির ধারাবাহিক অংশ, যেখানে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ, অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ ক্রমান্বয়ে কঠোর করা হচ্ছে।
এর আগে প্রশাসন দেশটির কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনায় সরব বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের পদক্ষেপও নেওয়া হয়। নতুন বিধিমালা সেই নীতিকেই আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কঠোর এই নীতির প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক আয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অনুভব করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
বিষয় : ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নীতি
2.png)
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার পথে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ফেডারেল সরকারের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী চার বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবেন না। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, একাডেমিক প্রোগ্রাম বদল এবং পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার সময়সীমাও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হচ্ছে।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই নতুন বিধান কার্যকর হবে। প্রশাসনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করেছেন। সেই প্রবণতা বন্ধ করা, ভিসার অপব্যবহার রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
এত দিন এফ–১ শিক্ষার্থী ভিসা ও জে–১ এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীরা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ নীতির আওতায় পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকতে পারতেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই তাঁদের ভিসা–সংক্রান্ত অবস্থান নবায়নের বিষয়টি তদারক করত। নতুন ব্যবস্থায় সেই নমনীয়তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করা হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ফেডারেল সরকারের সরাসরি অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিনের দাবি, বহু বছর ধরে অনির্দিষ্ট সময় থাকার সুযোগ অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহারের পথ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, অনেকেই একের পর এক কোর্সে ভর্তি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান দীর্ঘায়িত করেছেন, যা বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
তবে এই যুক্তি নিয়ে একমত নয় আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের বড় অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অধিকাংশ স্নাতক ডিগ্রি চার বছরে শেষ হলেও স্নাতকোত্তর, পিএইচডি এবং গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি শেষ করতে প্রায়ই আরও দীর্ঘ সময় লাগে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গবেষণানির্ভর বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকল্প, গবেষণাপত্র প্রকাশ কিংবা অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ের বাইরে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়।
নতুন নীতিতে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সময়সীমাও কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর অন্য ভিসায় পরিবর্তন অথবা যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের জন্য ৬০ দিনের সুযোগ ছিল। নতুন নিয়মে সেটি কমে দাঁড়াবে মাত্র ৩০ দিনে। ফলে চাকরি, গবেষণা বা পরবর্তী একাডেমিক পরিকল্পনা নিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক অলাভজনক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেটরস (নাফসা) এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ফান্টা আওর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর একটি ব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতির পরিবেশ তৈরি হবে, অথচ যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তকে কেবল ভিসা–সংক্রান্ত প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির ধারাবাহিক অংশ, যেখানে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ, অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ ক্রমান্বয়ে কঠোর করা হচ্ছে।
এর আগে প্রশাসন দেশটির কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনায় সরব বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের পদক্ষেপও নেওয়া হয়। নতুন বিধিমালা সেই নীতিকেই আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কঠোর এই নীতির প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক আয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অনুভব করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
2.png)