সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা: পাকিস্তানের সামনে নতুন সংকট

পাকিস্তানের বিশাল প্রদেশ বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মীর ইয়ার বেলুচ। নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রা চালুর দাবি করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা: পাকিস্তানের সামনে নতুন সংকট
ছবি -সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক বড় ধরনের অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মীর ইয়ার বেলুচ। গত ১৩ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও চিঠির মাধ্যমে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মীর ইয়ার বেলুচের দাবি অনুযায়ী, বেলুচিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভূখণ্ড এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি শুধু স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নতুন রাষ্ট্রের জন্য নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং ‘বেলুচি ফালুস’ নামে নতুন মুদ্রার প্রচলনের কথাও জানিয়েছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী এই গোষ্ঠীটি দাবি করছে, তারা ইতিমধ্যে একটি নিজস্ব প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন—সোনা ও তামার খনি, কয়লা এবং গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণও এখন তাদের হাতে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই নতুন পরিস্থিতির পেছনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টাও রয়েছে। মীর বেলুচ দাবি করেছেন, তাদের সামরিক, নৌ এবং বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী অঞ্চলটি পরিচালনা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে বেলুচিস্তানের মাটি থেকে পুরোপুরি হটিয়ে দেওয়া। এও দাবি করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে থাকা অনেক বেলুচ ও পশতুন সদস্য পদত্যাগ করছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মীর ইয়ার বেলুচের এই আবেদন, ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’কে যেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এই নতুন রাষ্ট্র কাউকে তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে দেবে না।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ইসলামাবাদ বরাবরই বেলুচিস্তানের ওপর পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জোরালোভাবে বজায় রেখেছে। পাকিস্তান সরকার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা বা বিশ্বের কোনো দেশ এই স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়নি। বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক আয়তন বিশাল হলেও জনবসতি কম। দীর্ঘ সময় ধরে এখানে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংঘাত চলে আসছে। মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের অভিযোগ থেকেই এই আন্দোলনের উৎপত্তি।

এই ঘোষণা ও দাবিগুলোকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসলামাবাদ হয়তো এই বিদ্রোহ দমনে আগের চেয়েও কঠোর সামরিক অবস্থানের দিকে যাবে, যা অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাধীনতার দাবির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই ঘোষণার ফলে বেলুচিস্তানের অস্থিরতা কতটা বাড়বে এবং এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কোনো নতুন সংকটের সৃষ্টি করবে কিনা। মীর বেলুচের এই উচ্চাভিলাষী ঘোষণার পর পাকিস্তান সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহল এই সংকটকে কীভাবে মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথে না হেঁটে, অঞ্চলটির মূল সমস্যাগুলোর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া স্থিতিশীলতা ফেরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিষয় : বেলুচিস্তান

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬


বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা: পাকিস্তানের সামনে নতুন সংকট

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক বড় ধরনের অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মীর ইয়ার বেলুচ। গত ১৩ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও চিঠির মাধ্যমে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মীর ইয়ার বেলুচের দাবি অনুযায়ী, বেলুচিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভূখণ্ড এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি শুধু স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নতুন রাষ্ট্রের জন্য নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং ‘বেলুচি ফালুস’ নামে নতুন মুদ্রার প্রচলনের কথাও জানিয়েছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী এই গোষ্ঠীটি দাবি করছে, তারা ইতিমধ্যে একটি নিজস্ব প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন—সোনা ও তামার খনি, কয়লা এবং গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণও এখন তাদের হাতে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই নতুন পরিস্থিতির পেছনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টাও রয়েছে। মীর বেলুচ দাবি করেছেন, তাদের সামরিক, নৌ এবং বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী অঞ্চলটি পরিচালনা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে বেলুচিস্তানের মাটি থেকে পুরোপুরি হটিয়ে দেওয়া। এও দাবি করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে থাকা অনেক বেলুচ ও পশতুন সদস্য পদত্যাগ করছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মীর ইয়ার বেলুচের এই আবেদন, ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’কে যেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এই নতুন রাষ্ট্র কাউকে তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে দেবে না।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ইসলামাবাদ বরাবরই বেলুচিস্তানের ওপর পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জোরালোভাবে বজায় রেখেছে। পাকিস্তান সরকার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা বা বিশ্বের কোনো দেশ এই স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়নি। বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক আয়তন বিশাল হলেও জনবসতি কম। দীর্ঘ সময় ধরে এখানে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংঘাত চলে আসছে। মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের অভিযোগ থেকেই এই আন্দোলনের উৎপত্তি।

এই ঘোষণা ও দাবিগুলোকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসলামাবাদ হয়তো এই বিদ্রোহ দমনে আগের চেয়েও কঠোর সামরিক অবস্থানের দিকে যাবে, যা অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাধীনতার দাবির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই ঘোষণার ফলে বেলুচিস্তানের অস্থিরতা কতটা বাড়বে এবং এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কোনো নতুন সংকটের সৃষ্টি করবে কিনা। মীর বেলুচের এই উচ্চাভিলাষী ঘোষণার পর পাকিস্তান সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহল এই সংকটকে কীভাবে মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথে না হেঁটে, অঞ্চলটির মূল সমস্যাগুলোর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া স্থিতিশীলতা ফেরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত