বিনোদন
১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। পাঞ্জাবের অমৃতসরে নিজের বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয় মানবাধিকারকর্মী জসওয়ন্ত সিং খালরাকে। এরপর তাঁর কোনো খোঁজ আর কখনোই মেলেনি। জীবিত কিংবা মৃত—কোনো অবস্থাতেই নয়। প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, দেশজুড়ে প্রতিবাদও হয়েছিল। তবু দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নানা ব্যাখ্যায় তাঁর অন্তর্ধানকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। এই বাস্তব ঘটনাকেই কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে আলোচিত সিনেমা ‘সাতলুজ’।
একনজরে সিনেমা: সাতলুজ ধরন: রাজনৈতিক ড্রামা পরিচালনা: হানি ত্রেহান অভিনয়: দিলজিৎ দোসাঞ্জ, সুবিন্দর ভিকি, গীতিকা বিদ্যা ওহলিয়ান, কানওয়ালজিৎ সিং, অর্জুন রামপালসহ অনেকে ভাষা: হিন্দি ও পাঞ্জাবি স্ট্রিমিং: জি৫ দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট
এই ছবির পথচলাও যেন এর গল্পের মতোই বিতর্কে মোড়া। শুরুতে নাম ছিল ‘পাঞ্জাব ৯৫’। ২০২৩ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা হয়। পরে ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড (সিবিএফসি) ছবিটিতে প্রায় ১২০টি কাটের নির্দেশ দেয়। তিন বছর ধরে সেন্সর জটিলতায় আটকে থাকার পর নতুন নাম ‘সাতলুজ’ নিয়ে ওটিটিতে মুক্তি পেলেও মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি চাপের মুখে সেটিও সরিয়ে নেওয়া হয়।
হানি ত্রেহানের নির্মাণে ‘সাতলুজ’ কোনো আপসের পথ বেছে নেয় না। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে নিজেই ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন কীভাবে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে—সেই নির্মম বাস্তবতাই উঠে এসেছে ছবিতে। এটি এমন একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, যা দর্শককে শুধু বিনোদন দেয় না; বরং প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা জসওয়ন্ত সিং খালরা, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। বন্ধুর রহস্যজনক মৃত্যু এবং পরে তাঁর মায়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা খালরাকে সত্য অনুসন্ধানে নামতে বাধ্য করে। থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে তিনি প্রশাসনের অনীহার মুখে পড়েন। এরপর হাসপাতাল, মর্গ ও শ্মশানে ঘুরতে গিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তাঁর সামনে আসে। শ্মশানের রেজিস্টারে শত শত ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ মরদেহের নথি তাঁর সন্দেহকে আরও গভীর করে তোলে।
হুমকি, নজরদারি আর মৃত্যুভয় উপেক্ষা করেও খালরা তদন্ত চালিয়ে যান। তাঁর পাশে থাকেন স্ত্রী পরমজিৎ, যদিও তিনি জানেন এই লড়াই পুরো পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে শৈশবের বন্ধু কনস্টেবল সতনাম সিং নিজের চাকরি ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সেই সাহসের মূল্য তাকেও দিতে হয়।
ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক এর চরিত্র নির্মাণ। এসএসপি সুগ্গা চরিত্রে সুবিন্দর ভিকি ক্ষমতার উন্মত্ত রূপকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা দীর্ঘ সময় দর্শকের মনে থেকে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতন, ক্ষমতার দম্ভ এবং আইনকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার—সব মিলিয়ে চরিত্রটি ছবির সবচেয়ে ভয়ংকর উপস্থিতিগুলোর একটি।
খালরা নিখোঁজ হওয়ার পর তদন্তে আসেন সিবিআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালক সমুদ্র সিং, যার ভূমিকায় অর্জুন রামপাল। তাঁর উপস্থিতি গল্পে নতুন গতি নিয়ে আসে। একই সঙ্গে আদালতে নিহত ও নিখোঁজ মানুষের পরিবারের পক্ষে লড়াই করা এক আইনজীবীর চরিত্রও ছবির মানবিক দিকটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। কোনো নাটকীয় অতিরঞ্জন ছাড়াই তিনি এক সাধারণ মানুষের ধীরে ধীরে মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হওয়ার যাত্রাকে অত্যন্ত সংযত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ে ক্ষোভ, আতঙ্ক, দৃঢ়তা ও মানবিকতা একসঙ্গে ধরা পড়ে।
পরিচালক হানি ত্রেহান পুলিশি নির্যাতন বা রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার দেখাতে কোথাও রাখঢাক করেননি। তবে তিনি পুরো ব্যবস্থাকে একরৈখিকভাবে দোষারোপও করেন না; বরং দেখান, কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতি কীভাবে গোটা ব্যবস্থাকে কলুষিত করে।
চিত্রগ্রহণেও ছবিটি আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কে ইউ মোহাননের ক্যামেরায় রাতের পাঞ্জাব যেমন রহস্যময়, তেমনি ভয়াবহ। বাস্তবধর্মী উপস্থাপনার সঙ্গে থ্রিলারের আবহ মিলিয়ে ছবিটি মাঝপথে নতুন মাত্রা পায়। সম্পাদনা, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং নীরবতার ব্যবহারও গল্পের আবেগকে আরও তীব্র করেছে।
যদিও ‘সাতলুজ’-এর পটভূমি নব্বইয়ের দশকের পাঞ্জাব, তবু এর বক্তব্য সময় ও ভূগোলের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তার নামে সত্য গোপন করে, ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দেয় এবং প্রশ্ন তোলা মানুষদের শত্রুতে পরিণত করে—তখন গণতন্ত্র কতটা বিপজ্জনক পথে হাঁটতে পারে, ছবিটি সেই সতর্কবার্তাই বহন করে।
ছবির শেষদিকে জসওয়ন্ত সিং খালরার কয়েকটি সংলাপ দীর্ঘ সময় মনে গেঁথে থাকে। তিনি বলেন, "আমরা পুলিশবিরোধী নই, সরকারবিরোধীও নই।" আর সমাপ্তিতে উচ্চারিত হয় তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা—"আমি অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাই।" তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর সেই সহজ অথচ গভীর উপলব্ধি—"কাউকে না কাউকে তো সামনে আসতেই হবে।"
বিষয় : 'সাতলুজ' জসওয়ন্ত সিং
2.png)
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। পাঞ্জাবের অমৃতসরে নিজের বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয় মানবাধিকারকর্মী জসওয়ন্ত সিং খালরাকে। এরপর তাঁর কোনো খোঁজ আর কখনোই মেলেনি। জীবিত কিংবা মৃত—কোনো অবস্থাতেই নয়। প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, দেশজুড়ে প্রতিবাদও হয়েছিল। তবু দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নানা ব্যাখ্যায় তাঁর অন্তর্ধানকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। এই বাস্তব ঘটনাকেই কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে আলোচিত সিনেমা ‘সাতলুজ’।
একনজরে সিনেমা: সাতলুজ ধরন: রাজনৈতিক ড্রামা পরিচালনা: হানি ত্রেহান অভিনয়: দিলজিৎ দোসাঞ্জ, সুবিন্দর ভিকি, গীতিকা বিদ্যা ওহলিয়ান, কানওয়ালজিৎ সিং, অর্জুন রামপালসহ অনেকে ভাষা: হিন্দি ও পাঞ্জাবি স্ট্রিমিং: জি৫ দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট
এই ছবির পথচলাও যেন এর গল্পের মতোই বিতর্কে মোড়া। শুরুতে নাম ছিল ‘পাঞ্জাব ৯৫’। ২০২৩ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা হয়। পরে ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড (সিবিএফসি) ছবিটিতে প্রায় ১২০টি কাটের নির্দেশ দেয়। তিন বছর ধরে সেন্সর জটিলতায় আটকে থাকার পর নতুন নাম ‘সাতলুজ’ নিয়ে ওটিটিতে মুক্তি পেলেও মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি চাপের মুখে সেটিও সরিয়ে নেওয়া হয়।
হানি ত্রেহানের নির্মাণে ‘সাতলুজ’ কোনো আপসের পথ বেছে নেয় না। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে নিজেই ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন কীভাবে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে—সেই নির্মম বাস্তবতাই উঠে এসেছে ছবিতে। এটি এমন একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, যা দর্শককে শুধু বিনোদন দেয় না; বরং প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা জসওয়ন্ত সিং খালরা, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। বন্ধুর রহস্যজনক মৃত্যু এবং পরে তাঁর মায়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা খালরাকে সত্য অনুসন্ধানে নামতে বাধ্য করে। থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে তিনি প্রশাসনের অনীহার মুখে পড়েন। এরপর হাসপাতাল, মর্গ ও শ্মশানে ঘুরতে গিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তাঁর সামনে আসে। শ্মশানের রেজিস্টারে শত শত ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ মরদেহের নথি তাঁর সন্দেহকে আরও গভীর করে তোলে।
হুমকি, নজরদারি আর মৃত্যুভয় উপেক্ষা করেও খালরা তদন্ত চালিয়ে যান। তাঁর পাশে থাকেন স্ত্রী পরমজিৎ, যদিও তিনি জানেন এই লড়াই পুরো পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে শৈশবের বন্ধু কনস্টেবল সতনাম সিং নিজের চাকরি ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সেই সাহসের মূল্য তাকেও দিতে হয়।
ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক এর চরিত্র নির্মাণ। এসএসপি সুগ্গা চরিত্রে সুবিন্দর ভিকি ক্ষমতার উন্মত্ত রূপকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা দীর্ঘ সময় দর্শকের মনে থেকে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতন, ক্ষমতার দম্ভ এবং আইনকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার—সব মিলিয়ে চরিত্রটি ছবির সবচেয়ে ভয়ংকর উপস্থিতিগুলোর একটি।
খালরা নিখোঁজ হওয়ার পর তদন্তে আসেন সিবিআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালক সমুদ্র সিং, যার ভূমিকায় অর্জুন রামপাল। তাঁর উপস্থিতি গল্পে নতুন গতি নিয়ে আসে। একই সঙ্গে আদালতে নিহত ও নিখোঁজ মানুষের পরিবারের পক্ষে লড়াই করা এক আইনজীবীর চরিত্রও ছবির মানবিক দিকটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। কোনো নাটকীয় অতিরঞ্জন ছাড়াই তিনি এক সাধারণ মানুষের ধীরে ধীরে মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হওয়ার যাত্রাকে অত্যন্ত সংযত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ে ক্ষোভ, আতঙ্ক, দৃঢ়তা ও মানবিকতা একসঙ্গে ধরা পড়ে।
পরিচালক হানি ত্রেহান পুলিশি নির্যাতন বা রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার দেখাতে কোথাও রাখঢাক করেননি। তবে তিনি পুরো ব্যবস্থাকে একরৈখিকভাবে দোষারোপও করেন না; বরং দেখান, কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতি কীভাবে গোটা ব্যবস্থাকে কলুষিত করে।
চিত্রগ্রহণেও ছবিটি আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কে ইউ মোহাননের ক্যামেরায় রাতের পাঞ্জাব যেমন রহস্যময়, তেমনি ভয়াবহ। বাস্তবধর্মী উপস্থাপনার সঙ্গে থ্রিলারের আবহ মিলিয়ে ছবিটি মাঝপথে নতুন মাত্রা পায়। সম্পাদনা, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং নীরবতার ব্যবহারও গল্পের আবেগকে আরও তীব্র করেছে।
যদিও ‘সাতলুজ’-এর পটভূমি নব্বইয়ের দশকের পাঞ্জাব, তবু এর বক্তব্য সময় ও ভূগোলের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তার নামে সত্য গোপন করে, ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দেয় এবং প্রশ্ন তোলা মানুষদের শত্রুতে পরিণত করে—তখন গণতন্ত্র কতটা বিপজ্জনক পথে হাঁটতে পারে, ছবিটি সেই সতর্কবার্তাই বহন করে।
ছবির শেষদিকে জসওয়ন্ত সিং খালরার কয়েকটি সংলাপ দীর্ঘ সময় মনে গেঁথে থাকে। তিনি বলেন, "আমরা পুলিশবিরোধী নই, সরকারবিরোধীও নই।" আর সমাপ্তিতে উচ্চারিত হয় তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা—"আমি অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাই।" তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর সেই সহজ অথচ গভীর উপলব্ধি—"কাউকে না কাউকে তো সামনে আসতেই হবে।"
2.png)