জাতীয়
১৬ জুলাই ২০২৪। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর পৌনে দুইটা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সেই রাস্তাটি সাক্ষী হয়ে রইল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। ২২ বছরের এই তরুণ কেবল নিজের জীবন বিলিয়ে দেননি, বরং তিনি সেদিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন দেড় দশকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে। ‘বুক পেতেছি, গুলি কর’—তাঁর সেই সাহসিকতার গর্জন স্তব্ধ করে দিয়েছিল ত্রাসের রাজত্বকে। শটগানের গুলি সাঈদের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলেও, তাঁর অদম্য চেতনাকে দমাতে পারেনি।
সেই দুপুরে আবু সাঈদের মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ছবি ও ভিডিও মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিরস্ত্র এক শিক্ষার্থীর এই নৃশংস মৃত্যু যেন মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের আগুনকে উসকে দেয়। আন্দোলনের রংপুরের সমন্বয়ক সাঈদের আত্মদান সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে। মুহূর্তেই কোটা সংস্কারের যে যৌক্তিক দাবি ছিল, তা রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে।
সেদিন শুধু আবু সাঈদ নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝরেছে আরও অনেক প্রাণ। চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের হামলায় জীবন দেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং দোকানের কর্মচারী মো. ফারুক। ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় প্রাণ হারান কলেজ শিক্ষার্থী সবুজ আলী ও পথচারী শাহজাহান। ১৬ জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী দিনে মোট ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর আন্দোলনের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায়। দাবি ওঠে খুনিদের বিচার ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কারের।
আবু সাঈদের ওই আইকনিক মুহূর্ত ভয়ের সব দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল। ১৫ জুলাই দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নজিরবিহীন হামলার পর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যে আতঙ্কিত ছিল, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার পর সেই চিত্র রাতারাতি বদলে যায়। শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফিরে আসে রাজপথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের অধিকাংশ ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। রোকেয়া হলে নারী শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা থেকে শুরু করে প্রতিটি হল উদ্ধারের দৃশ্য ছিল স্বৈরাচারের পতনের অন্যতম অনুঘটক।
আজ ১৬ জুলাই ২০২৬, সেই রক্তস্নাত দিনটির দ্বিতীয় বার্ষিকী। জাতি আজ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের। দিবসটি উপলক্ষে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শোকর্যালি, আলোচনা সভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে শহীদদের রক্তকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালনসহ দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণের মতো মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন।
এদিকে, দিনটিকে ঘিরে দেশজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দিবসটি কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জসহ স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
বিষয় : গণ অভ্যুত্থান আবু সাইদ
2.png)
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
১৬ জুলাই ২০২৪। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর পৌনে দুইটা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সেই রাস্তাটি সাক্ষী হয়ে রইল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। ২২ বছরের এই তরুণ কেবল নিজের জীবন বিলিয়ে দেননি, বরং তিনি সেদিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন দেড় দশকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে। ‘বুক পেতেছি, গুলি কর’—তাঁর সেই সাহসিকতার গর্জন স্তব্ধ করে দিয়েছিল ত্রাসের রাজত্বকে। শটগানের গুলি সাঈদের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলেও, তাঁর অদম্য চেতনাকে দমাতে পারেনি।
সেই দুপুরে আবু সাঈদের মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ছবি ও ভিডিও মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিরস্ত্র এক শিক্ষার্থীর এই নৃশংস মৃত্যু যেন মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের আগুনকে উসকে দেয়। আন্দোলনের রংপুরের সমন্বয়ক সাঈদের আত্মদান সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে। মুহূর্তেই কোটা সংস্কারের যে যৌক্তিক দাবি ছিল, তা রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে।
সেদিন শুধু আবু সাঈদ নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝরেছে আরও অনেক প্রাণ। চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের হামলায় জীবন দেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং দোকানের কর্মচারী মো. ফারুক। ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় প্রাণ হারান কলেজ শিক্ষার্থী সবুজ আলী ও পথচারী শাহজাহান। ১৬ জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী দিনে মোট ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর আন্দোলনের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায়। দাবি ওঠে খুনিদের বিচার ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কারের।
আবু সাঈদের ওই আইকনিক মুহূর্ত ভয়ের সব দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল। ১৫ জুলাই দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নজিরবিহীন হামলার পর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যে আতঙ্কিত ছিল, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার পর সেই চিত্র রাতারাতি বদলে যায়। শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফিরে আসে রাজপথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের অধিকাংশ ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। রোকেয়া হলে নারী শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা থেকে শুরু করে প্রতিটি হল উদ্ধারের দৃশ্য ছিল স্বৈরাচারের পতনের অন্যতম অনুঘটক।
আজ ১৬ জুলাই ২০২৬, সেই রক্তস্নাত দিনটির দ্বিতীয় বার্ষিকী। জাতি আজ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের। দিবসটি উপলক্ষে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শোকর্যালি, আলোচনা সভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে শহীদদের রক্তকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালনসহ দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণের মতো মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন।
এদিকে, দিনটিকে ঘিরে দেশজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দিবসটি কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জসহ স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
2.png)