সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

ইরানের নতুন কৌশলে হরমুজের পর বন্ধ হতে যাচ্ছে বাব–এল-মান্দেব

হরমুজ প্রণালির পর বাব–এল-মান্দেবকেও কৌশলগত চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান। এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্রপথের বাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 ইরানের নতুন কৌশলে হরমুজের পর বন্ধ হতে যাচ্ছে বাব–এল-মান্দেব
ছবি -সংগৃহীত

হরমুজের পর বাব–এল-মান্দেব: 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান হামলা কিংবা সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের নতুন ভাষা হয়ে উঠছে কৌশলগত সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব–এল-মান্দেবকে ঘিরেও নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল আরেকটি সামরিক হুমকি নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকে কেন্দ্র করে ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর হামলাও বেড়েছে। এই দুই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছেন না মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, তেহরান এখন সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বাড়িয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের প্রধান জ্বালানি করিডোরগুলোও এর অংশ হয়ে উঠবে।

সমুদ্রপথ কেন ইরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র

সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের পক্ষে সহজ নয়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এমন একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে, যা বহু বছর ধরে তেহরানের অন্যতম বড় হাতিয়ার।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। অন্যদিকে বাব–এল-মান্দেব প্রণালি সংযুক্ত করেছে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও ভারত মহাসাগরকে। এ পথ দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও পণ্য পরিবহন হয়।

ফলে এই দুটি প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন—সবকিছুর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্বের ভোক্তাদের কাছেই পৌঁছায়।

হুতিদের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, তারা লোহিত সাগরের নৌপথে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর তারা একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এর ফলে বিশ্বের বৃহৎ শিপিং কোম্পানিগুলোকে সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয়—দুই-ই বেড়ে যায়।

এবার হুতিদের পক্ষ থেকে বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি নতুন করে সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, হুতি নেতা মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে তাঁরা বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে প্রস্তুত। তাঁর দাবি, এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

যদিও এই ধরনের মূল্য পূর্বাভাস নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করার জন্য এমন বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চাপের নতুন সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, তেহরান এখন ওয়াশিংটনকে এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, সংঘাতের মূল্য শুধু ইরানকে নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।

এ কৌশলের মূল দর্শন হলো—যদি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানো হয়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধরত পক্ষের নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বর্তাবে।

এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান এখন সরাসরি সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে বড় উদ্বেগ

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। বরং ধাপে ধাপে সংঘাতের বিস্তার।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে একে বলা হয় 'মিশন ক্রিপ'—যেখানে কোনো পক্ষই শুরুতে সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না, কিন্তু প্রতিটি পাল্টা পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখান থেকে পিছু হটা কঠিন হয়ে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা অনেকটাই সেই দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

কূটনীতির সময় কি ফুরিয়ে আসছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শান্তি আলোচক ডেনিস রস মনে করেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, যাতে ইরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে এবং শুধু আলোচনায় বসাই নয়, একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহও দেখায়।

অন্যদিকে সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগেরের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও উপলব্ধি করছে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য পুরো অঞ্চলকেই দিতে হবে।

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন অনিশ্চয়তা

হরমুজ ও বাব–এল-মান্দেব—এই দুটি প্রণালি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অংশ নয়; এগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিরও অন্যতম প্রাণরেখা।

যদি এই দুই সমুদ্রপথ একই সময়ে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তাহলে শুধু তেলের দামই বাড়বে না; বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।

ফলে বর্তমান সংঘাতের গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে এমন এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অর্থনীতিতে অনুভূত হতে পারে।

এ কারণেই অনেক বিশ্লেষকের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাপ্রবাহ নয়, হরমুজ ও বাব–এল-মান্দেবকে ঘিরে নেওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি তার কী মূল্য দেবে।

বিষয় : ইরান হরমুজ বাব–এল-মান্দেব

কাল মহাকাল

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬


ইরানের নতুন কৌশলে হরমুজের পর বন্ধ হতে যাচ্ছে বাব–এল-মান্দেব

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

হরমুজের পর বাব–এল-মান্দেব: 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান হামলা কিংবা সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের নতুন ভাষা হয়ে উঠছে কৌশলগত সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব–এল-মান্দেবকে ঘিরেও নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল আরেকটি সামরিক হুমকি নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকে কেন্দ্র করে ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর হামলাও বেড়েছে। এই দুই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছেন না মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, তেহরান এখন সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বাড়িয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের প্রধান জ্বালানি করিডোরগুলোও এর অংশ হয়ে উঠবে।

সমুদ্রপথ কেন ইরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র

সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের পক্ষে সহজ নয়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এমন একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে, যা বহু বছর ধরে তেহরানের অন্যতম বড় হাতিয়ার।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। অন্যদিকে বাব–এল-মান্দেব প্রণালি সংযুক্ত করেছে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও ভারত মহাসাগরকে। এ পথ দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও পণ্য পরিবহন হয়।

ফলে এই দুটি প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন—সবকিছুর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্বের ভোক্তাদের কাছেই পৌঁছায়।

হুতিদের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, তারা লোহিত সাগরের নৌপথে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর তারা একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এর ফলে বিশ্বের বৃহৎ শিপিং কোম্পানিগুলোকে সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয়—দুই-ই বেড়ে যায়।

এবার হুতিদের পক্ষ থেকে বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি নতুন করে সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, হুতি নেতা মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে তাঁরা বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে প্রস্তুত। তাঁর দাবি, এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

যদিও এই ধরনের মূল্য পূর্বাভাস নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করার জন্য এমন বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চাপের নতুন সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, তেহরান এখন ওয়াশিংটনকে এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, সংঘাতের মূল্য শুধু ইরানকে নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।

এ কৌশলের মূল দর্শন হলো—যদি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানো হয়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধরত পক্ষের নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বর্তাবে।

এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান এখন সরাসরি সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে বড় উদ্বেগ

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। বরং ধাপে ধাপে সংঘাতের বিস্তার।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে একে বলা হয় 'মিশন ক্রিপ'—যেখানে কোনো পক্ষই শুরুতে সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না, কিন্তু প্রতিটি পাল্টা পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখান থেকে পিছু হটা কঠিন হয়ে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা অনেকটাই সেই দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

কূটনীতির সময় কি ফুরিয়ে আসছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শান্তি আলোচক ডেনিস রস মনে করেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, যাতে ইরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে এবং শুধু আলোচনায় বসাই নয়, একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহও দেখায়।

অন্যদিকে সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগেরের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও উপলব্ধি করছে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য পুরো অঞ্চলকেই দিতে হবে।

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন অনিশ্চয়তা

হরমুজ ও বাব–এল-মান্দেব—এই দুটি প্রণালি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অংশ নয়; এগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিরও অন্যতম প্রাণরেখা।

যদি এই দুই সমুদ্রপথ একই সময়ে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তাহলে শুধু তেলের দামই বাড়বে না; বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।

ফলে বর্তমান সংঘাতের গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে এমন এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অর্থনীতিতে অনুভূত হতে পারে।

এ কারণেই অনেক বিশ্লেষকের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাপ্রবাহ নয়, হরমুজ ও বাব–এল-মান্দেবকে ঘিরে নেওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি তার কী মূল্য দেবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত