সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সম্পাদকীয়সম্পাদকীয়

বঙ্গোপসাগরে চীনের নতুন করিডোর: বাংলাদেশের বাস্তবতা ও কৌশলগত পথ

চীনের প্রস্তাবিত করিডোরে কি লাভ, কি ক্ষতি? ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় ঢাকার করনীয়।

বঙ্গোপসাগরে চীনের নতুন করিডোর: বাংলাদেশের বাস্তবতা ও কৌশলগত পথ
ছবি -সংগৃহীত

রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর ঘিরে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের যে কৌশল বেইজিং নিয়েছে, তাতে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডরে যুক্ত হওয়ার আগে ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করতে হবে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে কিয়াউকফিউ নামের ছোট্ট একটি বন্দর। বাইরে থেকে দেখলে একে নিতান্তই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, এই একটি বন্দর ঘিরেই এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক দাবা খেলাটি চলছে। চীনের কাছে এটি নিছক পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা নয়; বরং এটি ভারত মহাসাগরে সরাসরি পা রাখার সবচেয়ে নিরাপদ দরজা। আর এই দরজার পোশাকি নাম হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর বা সিএমইসি।

একটু তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগের চেয়ে বড় কোনো কৌশলগত হাতিয়ার আর নেই। চীনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই-এর সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো এই করিডোর। চীনের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের বুক চিরে সোজা বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে এই পথ। কেন এই বিপুল বিনিয়োগ? সহজ উত্তর হলো, মালাক্কা প্রণালির ওপর বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমানো। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কখনো সংঘাত বাধলে ওই সরু মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই ভয় চীনের সবসময়ের। তাই কিয়াউকফিউ বন্দর দিয়ে সরাসরি তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে নিজেদের দেশে নেওয়ার এই বিকল্প পথটি তাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই লাইফলাইন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের শিক্ষনীয়

আমাদের নিজেদের প্রেক্ষাপট বোঝার আগে আন্তর্জাতিক দিকে একটু চোখ ফেরানো দরকার। এ ধরনের বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডরের মডেল পৃথিবীতে নতুন নয়। আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকাই, সেখানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) অধীনে গাদর বন্দর গড়ে তোলা হয়েছে। শুরুতে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো পাকিস্তান এখন বিশাল ঋণের বোঝায় ধুঁকছে এবং ওই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কেবল বেড়েছে। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের পরিণতি আমাদের সবার জানা। ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্দরটির নিয়ন্ত্রণই বেইজিংয়ের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে কলম্বো।

এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরাশক্তির বড় বিনিয়োগ সব সময় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি আনে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ঋণফাঁদ এবং কৌশলগত পরাধীনতার জন্ম দেয়। তাই চীনের নতুন কোনো করিডরে যুক্ত হওয়ার আগে এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

এবার আসা যাক আমাদের নিজেদের স্বার্থ  সংশ্লিষ্ট বিষয়ে, গত জুন মাসে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি সফরের সময় এই করিডোরের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। চীন প্রস্তাব দিয়েছে, মিয়ানমারের এই করিডোরটি বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে একটি ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ বা সিএমবিইসি গড়ে তোলার। প্রস্তাবটি শুনতে বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর যুক্ত হলে আমাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের স্থানীয় বাস্তবতা আসলে কতটা অনুকূল?

প্রথমত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। রাখাইন রাজ্যসহ করিডোরটির বড় অংশই এখন জান্তা সরকারের হাতছাড়া। সেখানে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে। এই অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে একটি নিরাপদ বাণিজ্যিক পথ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে রোহিঙ্গা সংকটের মতো একটি বিশাল বোঝা। মিয়ানমার যতক্ষণ না এই সংকটের সম্মানজনক সমাধান করছে, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে কোনো বহুমাত্রিক ট্রানজিট বা অর্থনৈতিক চুক্তিতে যাওয়াটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।

এর পাশাপাশি রয়েছে বড় শক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ। বঙ্গোপসাগরে চীনের এই আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে ভারত কখনোই ভালোভাবে নেবে না। কারণ, তারা এটিকে নিজেদের ঘিরে ফেলার কৌশল হিসেবেই দেখছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ভারতও কালাদান প্রকল্পের মতো নিজস্ব অবকাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের কোয়াড মিত্ররাও ভারত মহাসাগরে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকাতে মরিয়া। বাংলাদেশ যদি তড়িঘড়ি করে এই করিডরে যুক্ত হয়, তবে আমরা খুব সহজেই এই বৃহৎ শক্তিগুলোর রেষারেষির মাঝখানে চাপা পড়ে যাব।

আমাদের করণীয় ও নীতি-প্রস্তাব তাহলে বাংলাদেশের পথ কোনটি? ভূরাজনীতিতে আবেগ বা তাড়াহুড়োর কোনো জায়গা নেই। আমাদের এগোতে হবে অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং ধাপে ধাপে।

আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি স্বাধীন ও অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক সমীক্ষা পরিচালনা করা। প্রস্তাবিত করিডরে যুক্ত হলে আমাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ কতটা হবে এবং ঋণের শর্তগুলো কেমন, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ঋণের ফাঁদে যেন আমরা পা না দিই, সেটি নিশ্চিত করাই হবে প্রধান কাজ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে হবে যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন কোনো বৃহৎ অর্থনৈতিক সংযুক্তিতে ঢাকা জড়াবে না। করিডর সম্প্রসারণের এই চীনা প্রস্তাবটিকে আমরা বরং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বেইজিংকে দিয়ে নেপিদোর ওপর চাপ প্রয়োগের একটি কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল পদক্ষেপটি হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা। আমাদের বন্দরগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির একক ব্যবহারের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন—এই তিন শক্তিকেই বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু তা কোনোভাবেই কারও সামরিক বা কৌশলগত আধিপত্যের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না।

ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পরিশেষে এটুকু বলা যায়, একুশ শতকের অর্থনীতিতে কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি নতুন দরজা খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা যেমন রাখে, ঠিক তেমনি এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ভূরাজনৈতিক দাবানলের ঝুঁকি। একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারে না, আবার অন্ধের মতো এতে ঝাঁপিয়েও পড়তে পারে না। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এই বৈশ্বিক রেষারেষি মোকাবিলা করতে পারি। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে আমাদের অত্যন্ত ধীরস্থির, প্রজ্ঞাবান ও বাস্তবমুখী হতে হবে। কারণ, কূটনীতির এই টেবিলে একটি ভুল চাল আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মাশুল গুনতে বাধ্য করতে পারে।

বিষয় : বাংলাদেশ মিয়ানমার চীন করিডোর

কাল মহাকাল

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬


বঙ্গোপসাগরে চীনের নতুন করিডোর: বাংলাদেশের বাস্তবতা ও কৌশলগত পথ

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬

featured Image

রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর ঘিরে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের যে কৌশল বেইজিং নিয়েছে, তাতে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডরে যুক্ত হওয়ার আগে ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করতে হবে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে কিয়াউকফিউ নামের ছোট্ট একটি বন্দর। বাইরে থেকে দেখলে একে নিতান্তই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, এই একটি বন্দর ঘিরেই এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক দাবা খেলাটি চলছে। চীনের কাছে এটি নিছক পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা নয়; বরং এটি ভারত মহাসাগরে সরাসরি পা রাখার সবচেয়ে নিরাপদ দরজা। আর এই দরজার পোশাকি নাম হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর বা সিএমইসি।

একটু তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগের চেয়ে বড় কোনো কৌশলগত হাতিয়ার আর নেই। চীনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই-এর সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো এই করিডোর। চীনের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের বুক চিরে সোজা বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে এই পথ। কেন এই বিপুল বিনিয়োগ? সহজ উত্তর হলো, মালাক্কা প্রণালির ওপর বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমানো। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কখনো সংঘাত বাধলে ওই সরু মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই ভয় চীনের সবসময়ের। তাই কিয়াউকফিউ বন্দর দিয়ে সরাসরি তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে নিজেদের দেশে নেওয়ার এই বিকল্প পথটি তাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই লাইফলাইন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের শিক্ষনীয়

আমাদের নিজেদের প্রেক্ষাপট বোঝার আগে আন্তর্জাতিক দিকে একটু চোখ ফেরানো দরকার। এ ধরনের বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডরের মডেল পৃথিবীতে নতুন নয়। আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকাই, সেখানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) অধীনে গাদর বন্দর গড়ে তোলা হয়েছে। শুরুতে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো পাকিস্তান এখন বিশাল ঋণের বোঝায় ধুঁকছে এবং ওই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কেবল বেড়েছে। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের পরিণতি আমাদের সবার জানা। ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্দরটির নিয়ন্ত্রণই বেইজিংয়ের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে কলম্বো।

এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরাশক্তির বড় বিনিয়োগ সব সময় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি আনে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ঋণফাঁদ এবং কৌশলগত পরাধীনতার জন্ম দেয়। তাই চীনের নতুন কোনো করিডরে যুক্ত হওয়ার আগে এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

এবার আসা যাক আমাদের নিজেদের স্বার্থ  সংশ্লিষ্ট বিষয়ে, গত জুন মাসে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি সফরের সময় এই করিডোরের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। চীন প্রস্তাব দিয়েছে, মিয়ানমারের এই করিডোরটি বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে একটি ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ বা সিএমবিইসি গড়ে তোলার। প্রস্তাবটি শুনতে বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর যুক্ত হলে আমাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের স্থানীয় বাস্তবতা আসলে কতটা অনুকূল?

প্রথমত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। রাখাইন রাজ্যসহ করিডোরটির বড় অংশই এখন জান্তা সরকারের হাতছাড়া। সেখানে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে। এই অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে একটি নিরাপদ বাণিজ্যিক পথ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে রোহিঙ্গা সংকটের মতো একটি বিশাল বোঝা। মিয়ানমার যতক্ষণ না এই সংকটের সম্মানজনক সমাধান করছে, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে কোনো বহুমাত্রিক ট্রানজিট বা অর্থনৈতিক চুক্তিতে যাওয়াটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।

এর পাশাপাশি রয়েছে বড় শক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ। বঙ্গোপসাগরে চীনের এই আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে ভারত কখনোই ভালোভাবে নেবে না। কারণ, তারা এটিকে নিজেদের ঘিরে ফেলার কৌশল হিসেবেই দেখছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ভারতও কালাদান প্রকল্পের মতো নিজস্ব অবকাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের কোয়াড মিত্ররাও ভারত মহাসাগরে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকাতে মরিয়া। বাংলাদেশ যদি তড়িঘড়ি করে এই করিডরে যুক্ত হয়, তবে আমরা খুব সহজেই এই বৃহৎ শক্তিগুলোর রেষারেষির মাঝখানে চাপা পড়ে যাব।

আমাদের করণীয় ও নীতি-প্রস্তাব তাহলে বাংলাদেশের পথ কোনটি? ভূরাজনীতিতে আবেগ বা তাড়াহুড়োর কোনো জায়গা নেই। আমাদের এগোতে হবে অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং ধাপে ধাপে।

আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি স্বাধীন ও অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক সমীক্ষা পরিচালনা করা। প্রস্তাবিত করিডরে যুক্ত হলে আমাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ কতটা হবে এবং ঋণের শর্তগুলো কেমন, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ঋণের ফাঁদে যেন আমরা পা না দিই, সেটি নিশ্চিত করাই হবে প্রধান কাজ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে হবে যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন কোনো বৃহৎ অর্থনৈতিক সংযুক্তিতে ঢাকা জড়াবে না। করিডর সম্প্রসারণের এই চীনা প্রস্তাবটিকে আমরা বরং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বেইজিংকে দিয়ে নেপিদোর ওপর চাপ প্রয়োগের একটি কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল পদক্ষেপটি হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা। আমাদের বন্দরগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির একক ব্যবহারের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন—এই তিন শক্তিকেই বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু তা কোনোভাবেই কারও সামরিক বা কৌশলগত আধিপত্যের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না।

ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পরিশেষে এটুকু বলা যায়, একুশ শতকের অর্থনীতিতে কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি নতুন দরজা খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা যেমন রাখে, ঠিক তেমনি এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ভূরাজনৈতিক দাবানলের ঝুঁকি। একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারে না, আবার অন্ধের মতো এতে ঝাঁপিয়েও পড়তে পারে না। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এই বৈশ্বিক রেষারেষি মোকাবিলা করতে পারি। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে আমাদের অত্যন্ত ধীরস্থির, প্রজ্ঞাবান ও বাস্তবমুখী হতে হবে। কারণ, কূটনীতির এই টেবিলে একটি ভুল চাল আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মাশুল গুনতে বাধ্য করতে পারে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত