আন্তর্জাতিক
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপকে চরম ‘উসকানিমূলক’ ও ‘আগ্রাসী’ বলে কড়া সমালোচনা করেছে।
গত সোমবার দুপুর ১২টা ১ মিনিটে চালানো এই পরীক্ষায় অবশ্য কোনো বিধ্বংসী গোলা বা বিস্ফোরক ছিল না। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া দাবি করেছে, এটি তাদের নিয়মিত বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ এবং নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই পরীক্ষা চালানো হয়নি। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং মহড়াটিকে শতভাগ নিরাপদ ও পেশাদারি বলে দাবি করেছেন। উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মিত্রদের জানানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এই বিষয়টিকে যেন অতিরঞ্জিতভাবে না দেখে।
তবে বেইজিংয়ের এমন আশ্বাসে মোটেই শান্ত হয়নি ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্ভবত চীনের সর্বাধুনিক ‘জেএল-৩’ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র, যা ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে। গত সোমবার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি অন্তত ৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটার উড়ে গিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই মহড়ার তীব্র বিরোধিতার অন্যতম কারণ হলো স্থান নির্বাচন। ১৯৮৬ সালের ‘রারোটোঙ্গা চুক্তি’ অনুযায়ী প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চল সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত এলাকা। ১৯৮৭ সালে চীন নিজেও এই চুক্তিতে সই করে সেখানে পারমাণবিক হুমকি না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “পুরো বিশ্ব যখন পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকাতে মরিয়া, বেইজিং তখন ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে।”
প্রতিবেশী ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর মাঝেও এই ঘটনা ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বিষয়টিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। স্বল্প সময়ের নোটিশে পারমাণবিক সক্ষমতার এমন মহড়াকে তিনি ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। সলোমন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউ ওয়ালের কণ্ঠেও শোনা গেছে স্পষ্ট বিরক্তি। চীনকে বন্ধুরাষ্ট্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বন্ধুত্ব বজায় রাখুন, তবে আমাদের নিজেদের অঞ্চলে এভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না।” তাইওয়ানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও এটিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর একটি সুকৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
হঠাৎ কেন এই পরীক্ষা, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। কাকতালীয়ভাবে ঠিক যে মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করছিল, তখনই এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় চীন। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক মেইয়া নাউয়েন্স মনে করেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন হয়তো মিত্রদের চুক্তির প্রতি নিজেদের নীরব ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সক্ষমতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও, বিশ্লেষকদের শঙ্কা—এই মহড়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের কূটনৈতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিষয় : প্রাচীন প্রযুক্তি ক্ষেপনাস্ত্র
2.png)
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপকে চরম ‘উসকানিমূলক’ ও ‘আগ্রাসী’ বলে কড়া সমালোচনা করেছে।
গত সোমবার দুপুর ১২টা ১ মিনিটে চালানো এই পরীক্ষায় অবশ্য কোনো বিধ্বংসী গোলা বা বিস্ফোরক ছিল না। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া দাবি করেছে, এটি তাদের নিয়মিত বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ এবং নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই পরীক্ষা চালানো হয়নি। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং মহড়াটিকে শতভাগ নিরাপদ ও পেশাদারি বলে দাবি করেছেন। উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মিত্রদের জানানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এই বিষয়টিকে যেন অতিরঞ্জিতভাবে না দেখে।
তবে বেইজিংয়ের এমন আশ্বাসে মোটেই শান্ত হয়নি ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্ভবত চীনের সর্বাধুনিক ‘জেএল-৩’ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র, যা ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে। গত সোমবার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি অন্তত ৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটার উড়ে গিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই মহড়ার তীব্র বিরোধিতার অন্যতম কারণ হলো স্থান নির্বাচন। ১৯৮৬ সালের ‘রারোটোঙ্গা চুক্তি’ অনুযায়ী প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চল সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত এলাকা। ১৯৮৭ সালে চীন নিজেও এই চুক্তিতে সই করে সেখানে পারমাণবিক হুমকি না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “পুরো বিশ্ব যখন পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকাতে মরিয়া, বেইজিং তখন ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে।”
প্রতিবেশী ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর মাঝেও এই ঘটনা ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বিষয়টিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। স্বল্প সময়ের নোটিশে পারমাণবিক সক্ষমতার এমন মহড়াকে তিনি ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। সলোমন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউ ওয়ালের কণ্ঠেও শোনা গেছে স্পষ্ট বিরক্তি। চীনকে বন্ধুরাষ্ট্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বন্ধুত্ব বজায় রাখুন, তবে আমাদের নিজেদের অঞ্চলে এভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না।” তাইওয়ানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও এটিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর একটি সুকৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
হঠাৎ কেন এই পরীক্ষা, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। কাকতালীয়ভাবে ঠিক যে মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করছিল, তখনই এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় চীন। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক মেইয়া নাউয়েন্স মনে করেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন হয়তো মিত্রদের চুক্তির প্রতি নিজেদের নীরব ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সক্ষমতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও, বিশ্লেষকদের শঙ্কা—এই মহড়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের কূটনৈতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
2.png)