মহাকালের আয়নামহাকালের আয়না

৫ই আগষ্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি ভারতের উদ্দেশে প্রতিবাদ নয়, নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের ঘোষণা

শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থানের প্রতিবাদে ৫ আগস্টের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি শুধু একটি কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়। এর ভাষায় ফুটে উঠেছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ়তা, জুলাই-পরবর্তী জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সমতার নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর প্রত্যয়।

৫ই আগষ্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি ভারতের উদ্দেশে প্রতিবাদ নয়, নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের ঘোষণা
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন সব সময় নতুন চুক্তি, নতুন জোট কিংবা বড় কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় একটি রাষ্ট্রের পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার ভাষায়। রাষ্ট্র কোন শব্দ ব্যবহার করছে, কোন বিষয়কে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে, কোন সীমারেখা টেনে দিচ্ছে—এসবের মধ্যেই তার রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন ধরা পড়ে।

বাংলাদেশের ৫ আগস্টের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিটি সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিল।

এটি শুধু শেখ হাসিনার দিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার প্রতিবাদ নয়। এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় একটি বার্তা—জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চাইছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো বিবৃতির ভাষা। সেখানে ‘ক্ষুব্ধ’, ‘দণ্ডিত গণহত্যাকারী’, ‘সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা’, ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান’, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’, ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ এবং ‘মাফিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর মতো তীব্র শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

কূটনীতির প্রচলিত ভাষায় এমন শব্দচয়ন বিরল। সাধারণত রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে ক্ষোভ থাকলেও শব্দের ধার কিছুটা ভোঁতা রাখা হয়। ‘গভীর উদ্বেগ’, ‘দুঃখ প্রকাশ’, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ কিংবা ‘পারস্পরিক স্বার্থ’-এর মতো শব্দ দিয়ে কঠিন বার্তাও তুলনামূলক নরম করে বলা হয়।

এই বিবৃতিতে সেই প্রচলিত কূটনৈতিক মসৃণতা অনেকটাই অনুপস্থিত।

এখানেই এর রাজনৈতিক তাৎপর্য।

রাষ্ট্রের ভাষায় জনতার আকাঙ্ক্ষা

জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষাটি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে, তার একটি হলো—দেশের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই নেবে। কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ধারক হয়ে উঠবে না।

৫ আগস্টের বিবৃতিতে সেই আকাঙ্ক্ষাই রাষ্ট্রীয় ভাষা পেয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ আর ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনো ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হবে না।

এটি নিছক একটি কূটনৈতিক বাক্য নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিভাষায় ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বলতে এমন রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়, যার রাজনৈতিক বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অস্বাভাবিক প্রভাব থাকে।

সুতরাং বাংলাদেশ যখন ঘোষণা করে যে তারা ক্লায়েন্ট স্টেট হবে না, তখন তার অর্থ দাঁড়ায়—বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব থাকবে না।

ভারতের জন্য এটিই সম্ভবত বিবৃতিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী। দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বাস্তবতা বাংলাদেশ অস্বীকার করছে না।

বরং বাংলাদেশ স্পষ্ট করে বলছে, ভারতের সঙ্গে তারা একটি গঠনমূলক, পারস্পরিকভাবে লাভজনক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদা।

অর্থাৎ বার্তাটি ভারতের বিরুদ্ধে নয়; বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা।

বড় প্রতিবেশী মানেই অভিভাবক নয়

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য সমান নয়। আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব—প্রায় সব সূচকেই ভারত অনেক বড় রাষ্ট্র।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক সত্য হলো, রাষ্ট্রের আকার বড় হলেই তার সার্বভৌমত্বের মূল্য বড় হয় না।

ভারত বড় রাষ্ট্র, বাংলাদেশ তুলনামূলক ছোট। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে দুই রাষ্ট্রই সার্বভৌম। এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে বুঝতে হবে।

ভারত বাংলাদেশের বড় প্রতিবেশী হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের অভিভাবক নয়।

এই পার্থক্যটি আগামী দিনের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অতীতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনায় অনেক সময় দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন বাংলাদেশ বলতে চাইছে, তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে দেশের জনগণের মাধ্যমে; অন্য কোনো রাজধানীর রাজনৈতিক পছন্দ দিয়ে নয়।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গটি তাই ব্যক্তির চেয়ে বড়

বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক ও দণ্ডিত গণহত্যাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘মাফিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো স্থান থাকবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এই ভাষা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এখানে শেখ হাসিনাকে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়েছে—যে ব্যবস্থাকে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করতে চাইছে।

অবশ্য কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা হলো—যে কর্তৃত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন অন্য কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর মাধ্যমে না ঘটে।

একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সমার্থক হয়ে ওঠার সুযোগ না দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত পরীক্ষা।

জাতিসংঘের তথ্যের উল্লেখ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিবৃতিতে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে।

কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ তার বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক দাবি হিসেবে না রেখে আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে তথ্য ও প্রমাণের গুরুত্ব বেশি। ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের নথি ও অনুসন্ধানের উল্লেখ একটি সচেতন কূটনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

এর মাধ্যমে ঢাকা মূলত বলতে চাইছে—জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত তথ্যকে অস্বীকার করে অতীতকে পুনর্লিখনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রত্যর্পণ চুক্তি এখন দ্বিপক্ষীয় আস্থার প্রশ্ন

বিবৃতিতে ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো কোনো জবাব দেয়নি।

এতে বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা একজন সাবেক নেতার অবস্থানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান একটি চুক্তি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটিও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

ভারত বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারে। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আইনি বা অন্য কোনো সীমাবদ্ধতার কথাও বলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ নীরবতা দ্বিপক্ষীয় আস্থার জন্য সহায়ক নয়।

আর সেই নীরবতার মধ্যেই শেখ হাসিনাকে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলে বাংলাদেশের ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের বিবৃতিও ঠিক সেই জায়গাটিই তুলে ধরেছে—এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করছে এবং দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর।

দিল্লির জন্য বার্তা: সরকার নয়, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক

ভারতের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কি কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক হিসেবে পুনর্গঠিত হবে?

দুটি পথ এক নয়।

কোনো একটি সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই সম্পর্কও সংকটে পড়ে। কিন্তু জনগণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও সম্পর্ক টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই শিক্ষা ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যদি এমন ধারণা শক্তিশালী হয় যে ভারত তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু বর্তমান রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘমেয়াদে সেটি দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক মনোভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীর জন্য এটি নিশ্চয়ই কাম্য নয়।

নতুন বাংলাদেশের দাবির সামনে বাস্তব পরীক্ষা

তবে এই বিবৃতিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিরও সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রের ভাষা বদলানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তন শুধু ভাষায় প্রমাণিত হয় না।

নতুন বাংলাদেশের দাবি কতটা বাস্তব, তা নির্ধারিত হবে প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন হচ্ছে, নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে, বিচারব্যবস্থা কতটা নিরপেক্ষ থাকছে, সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে এবং রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরে।

একইভাবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও আত্মমর্যাদা ও বাস্তববোধের সমন্বয় জরুরি।

ভারত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভূগোল দুই দেশকে আলাদা হওয়ার সুযোগ দেয় না। তাই বাংলাদেশের স্বার্থ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং সম্পর্ককে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে না।

সেই সম্পর্কের সূত্র হতে পারে খুব সরল:

বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা নয়।
সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু হস্তক্ষেপ নয়।
কূটনৈতিক সৌজন্য থাকবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়।
সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু জাতীয় মর্যাদার বিনিময়ে নয়।

রাষ্ট্র যখন জনগণের ভাষায় কথা বলে

৫ আগস্টের বিবৃতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই।

এখানে রাষ্ট্র ও জনগণের ভাষার মধ্যে দূরত্ব কমেছে। জনগণ যে ভাষায় সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলছে, রাষ্ট্র সেই ভাষাকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছে।

এটি শুধু ভারতের জন্য একটি বার্তা নয়। বিশ্বের কাছেও এটি বাংলাদেশের নতুন আত্মপরিচয়ের একটি সংকেত।

বাংলাদেশ বলতে চাইছে—সে কোনো বৃহৎ প্রতিবেশীর কৌশলগত পরিসরের একটি ছোট দেশমাত্র নয়। সে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারসম্পন্ন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র।

আর সেই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রশ্নও এখন বদলাতে শুরু করেছে।

কাকে খুশি করা যাবে—এটি আর একমাত্র প্রশ্ন নয়।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়।

এই পরিবর্তনই হয়তো জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা।

তবে সেই আকাঙ্ক্ষাকে টেকসই রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দিতে হলে কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিকতা; সংঘাত নয়, প্রয়োজন দৃঢ় কূটনীতি; আর স্লোগান নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সিদ্ধান্ত।

৫ আগস্টের বিবৃতিটি সেই নতুন পথের একটি শক্তিশালী সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এর মূল বার্তাটি শেষ পর্যন্ত খুব সরল—

বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে নয়; বাংলাদেশ নিজের পক্ষে।

বিষয় : বাংলাদেশ_ভারত_সম্পর্ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি ৫ই আগষ্ট নতুন বাংলাদেশ

কাল মহাকাল

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬


৫ই আগষ্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি ভারতের উদ্দেশে প্রতিবাদ নয়, নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের ঘোষণা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন সব সময় নতুন চুক্তি, নতুন জোট কিংবা বড় কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় একটি রাষ্ট্রের পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার ভাষায়। রাষ্ট্র কোন শব্দ ব্যবহার করছে, কোন বিষয়কে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে, কোন সীমারেখা টেনে দিচ্ছে—এসবের মধ্যেই তার রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন ধরা পড়ে।

বাংলাদেশের ৫ আগস্টের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিটি সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিল।

এটি শুধু শেখ হাসিনার দিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার প্রতিবাদ নয়। এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় একটি বার্তা—জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চাইছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো বিবৃতির ভাষা। সেখানে ‘ক্ষুব্ধ’, ‘দণ্ডিত গণহত্যাকারী’, ‘সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা’, ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান’, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’, ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ এবং ‘মাফিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর মতো তীব্র শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

কূটনীতির প্রচলিত ভাষায় এমন শব্দচয়ন বিরল। সাধারণত রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে ক্ষোভ থাকলেও শব্দের ধার কিছুটা ভোঁতা রাখা হয়। ‘গভীর উদ্বেগ’, ‘দুঃখ প্রকাশ’, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ কিংবা ‘পারস্পরিক স্বার্থ’-এর মতো শব্দ দিয়ে কঠিন বার্তাও তুলনামূলক নরম করে বলা হয়।

এই বিবৃতিতে সেই প্রচলিত কূটনৈতিক মসৃণতা অনেকটাই অনুপস্থিত।

এখানেই এর রাজনৈতিক তাৎপর্য।

রাষ্ট্রের ভাষায় জনতার আকাঙ্ক্ষা

জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষাটি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে, তার একটি হলো—দেশের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই নেবে। কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ধারক হয়ে উঠবে না।

৫ আগস্টের বিবৃতিতে সেই আকাঙ্ক্ষাই রাষ্ট্রীয় ভাষা পেয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ আর ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনো ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হবে না।

এটি নিছক একটি কূটনৈতিক বাক্য নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিভাষায় ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বলতে এমন রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়, যার রাজনৈতিক বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অস্বাভাবিক প্রভাব থাকে।

সুতরাং বাংলাদেশ যখন ঘোষণা করে যে তারা ক্লায়েন্ট স্টেট হবে না, তখন তার অর্থ দাঁড়ায়—বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব থাকবে না।

ভারতের জন্য এটিই সম্ভবত বিবৃতিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী। দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বাস্তবতা বাংলাদেশ অস্বীকার করছে না।

বরং বাংলাদেশ স্পষ্ট করে বলছে, ভারতের সঙ্গে তারা একটি গঠনমূলক, পারস্পরিকভাবে লাভজনক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদা।

অর্থাৎ বার্তাটি ভারতের বিরুদ্ধে নয়; বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা।

বড় প্রতিবেশী মানেই অভিভাবক নয়

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য সমান নয়। আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব—প্রায় সব সূচকেই ভারত অনেক বড় রাষ্ট্র।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক সত্য হলো, রাষ্ট্রের আকার বড় হলেই তার সার্বভৌমত্বের মূল্য বড় হয় না।

ভারত বড় রাষ্ট্র, বাংলাদেশ তুলনামূলক ছোট। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে দুই রাষ্ট্রই সার্বভৌম। এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে বুঝতে হবে।

ভারত বাংলাদেশের বড় প্রতিবেশী হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের অভিভাবক নয়।

এই পার্থক্যটি আগামী দিনের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অতীতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনায় অনেক সময় দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন বাংলাদেশ বলতে চাইছে, তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে দেশের জনগণের মাধ্যমে; অন্য কোনো রাজধানীর রাজনৈতিক পছন্দ দিয়ে নয়।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গটি তাই ব্যক্তির চেয়ে বড়

বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক ও দণ্ডিত গণহত্যাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘মাফিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো স্থান থাকবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এই ভাষা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এখানে শেখ হাসিনাকে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়েছে—যে ব্যবস্থাকে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করতে চাইছে।

অবশ্য কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা হলো—যে কর্তৃত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন অন্য কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর মাধ্যমে না ঘটে।

একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সমার্থক হয়ে ওঠার সুযোগ না দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত পরীক্ষা।

জাতিসংঘের তথ্যের উল্লেখ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিবৃতিতে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে।

কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ তার বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক দাবি হিসেবে না রেখে আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে তথ্য ও প্রমাণের গুরুত্ব বেশি। ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের নথি ও অনুসন্ধানের উল্লেখ একটি সচেতন কূটনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

এর মাধ্যমে ঢাকা মূলত বলতে চাইছে—জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত তথ্যকে অস্বীকার করে অতীতকে পুনর্লিখনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রত্যর্পণ চুক্তি এখন দ্বিপক্ষীয় আস্থার প্রশ্ন

বিবৃতিতে ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো কোনো জবাব দেয়নি।

এতে বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা একজন সাবেক নেতার অবস্থানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান একটি চুক্তি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটিও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

ভারত বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারে। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আইনি বা অন্য কোনো সীমাবদ্ধতার কথাও বলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ নীরবতা দ্বিপক্ষীয় আস্থার জন্য সহায়ক নয়।

আর সেই নীরবতার মধ্যেই শেখ হাসিনাকে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলে বাংলাদেশের ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের বিবৃতিও ঠিক সেই জায়গাটিই তুলে ধরেছে—এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করছে এবং দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর।

দিল্লির জন্য বার্তা: সরকার নয়, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক

ভারতের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কি কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক হিসেবে পুনর্গঠিত হবে?

দুটি পথ এক নয়।

কোনো একটি সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই সম্পর্কও সংকটে পড়ে। কিন্তু জনগণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও সম্পর্ক টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই শিক্ষা ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যদি এমন ধারণা শক্তিশালী হয় যে ভারত তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু বর্তমান রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘমেয়াদে সেটি দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক মনোভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীর জন্য এটি নিশ্চয়ই কাম্য নয়।

নতুন বাংলাদেশের দাবির সামনে বাস্তব পরীক্ষা

তবে এই বিবৃতিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিরও সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রের ভাষা বদলানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তন শুধু ভাষায় প্রমাণিত হয় না।

নতুন বাংলাদেশের দাবি কতটা বাস্তব, তা নির্ধারিত হবে প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন হচ্ছে, নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে, বিচারব্যবস্থা কতটা নিরপেক্ষ থাকছে, সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে এবং রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরে।

একইভাবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও আত্মমর্যাদা ও বাস্তববোধের সমন্বয় জরুরি।

ভারত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভূগোল দুই দেশকে আলাদা হওয়ার সুযোগ দেয় না। তাই বাংলাদেশের স্বার্থ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং সম্পর্ককে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে না।

সেই সম্পর্কের সূত্র হতে পারে খুব সরল:

বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা নয়।
সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু হস্তক্ষেপ নয়।
কূটনৈতিক সৌজন্য থাকবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়।
সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু জাতীয় মর্যাদার বিনিময়ে নয়।

রাষ্ট্র যখন জনগণের ভাষায় কথা বলে

৫ আগস্টের বিবৃতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই।

এখানে রাষ্ট্র ও জনগণের ভাষার মধ্যে দূরত্ব কমেছে। জনগণ যে ভাষায় সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলছে, রাষ্ট্র সেই ভাষাকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছে।

এটি শুধু ভারতের জন্য একটি বার্তা নয়। বিশ্বের কাছেও এটি বাংলাদেশের নতুন আত্মপরিচয়ের একটি সংকেত।

বাংলাদেশ বলতে চাইছে—সে কোনো বৃহৎ প্রতিবেশীর কৌশলগত পরিসরের একটি ছোট দেশমাত্র নয়। সে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারসম্পন্ন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র।

আর সেই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রশ্নও এখন বদলাতে শুরু করেছে।

কাকে খুশি করা যাবে—এটি আর একমাত্র প্রশ্ন নয়।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়।

এই পরিবর্তনই হয়তো জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা।

তবে সেই আকাঙ্ক্ষাকে টেকসই রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দিতে হলে কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিকতা; সংঘাত নয়, প্রয়োজন দৃঢ় কূটনীতি; আর স্লোগান নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সিদ্ধান্ত।

৫ আগস্টের বিবৃতিটি সেই নতুন পথের একটি শক্তিশালী সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এর মূল বার্তাটি শেষ পর্যন্ত খুব সরল—

বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে নয়; বাংলাদেশ নিজের পক্ষে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত