সম্পাদকীয়সম্পাদকীয়

দেশত্যাগের সেই দিন: আকস্মিক সিদ্ধান্ত, নাকি আগে থেকেই সাজানো পরিকল্পনা?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে—এটি কি শেষ মুহূর্তের একটি সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি বহু আগেই প্রস্তুত করা একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন?

দেশত্যাগের সেই দিন: আকস্মিক সিদ্ধান্ত, নাকি আগে থেকেই সাজানো পরিকল্পনা?
ছবি -সংগৃহীত

একজন প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন—এটাই খবর। কিন্তু কীভাবে, কেন এবং কোন প্রস্তুতিতে তিনি দেশ ছাড়লেন—সেটিই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৫ আগস্টের সেই ঘটনা শুধু একটি সরকারের পতনের গল্প নয়। এটি এমন একটি দিন, যা বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সেই দিনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি নীরবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনগণের জানার অধিকার। তাই আজ প্রশ্ন একটাই—শেখ হাসিনার দেশত্যাগ কি শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি আগে থেকেই প্রস্তুত করা একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন?

প্রথম দিকে ঘটনাটি অনেকের কাছে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক নাটকীয় পরিণতি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা তথ্য, বিভিন্ন বর্ণনা এবং ঘটনাক্রমের বিশ্লেষণ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। আর যেখানে উত্তর নেই, সেখানে সন্দেহ জন্ম নেয়। সন্দেহের সেই জায়গা থেকেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এটি কি শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি বহু আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা একটি বিকল্প পরিকল্পনার বাস্তবায়ন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগ নয়, যুক্তির কাছে যেতে হবে। কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়, তথ্য ও ঘটনার ধারাবাহিকতাকে দেখতে হবে।

একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান সংকটের মুহূর্তে দেশ ছাড়বেন, আর সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো প্রস্তুতি থাকবে না—এমনটি সাধারণত দেখা যায় না। কারণ একজন রাষ্ট্রনেতার নিরাপত্তা, চলাচল, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক গন্তব্য—সবকিছুই বহু স্তরের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। এটি কোনো ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়; এটি একটি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত।

তাহলে প্রশ্ন আসে, যদি সবকিছু সত্যিই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে এত দ্রুত সমন্বয় কীভাবে সম্ভব হলো? রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা কীভাবে এত অল্প সময়ে একই ছন্দে কাজ করল? একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য গন্তব্য নির্ধারণ করা, আকাশপথ সমন্বয় করা—এসব কি কয়েক মিনিটে সম্ভব?

আবার এর উল্টো দিকও আছে। যদি ধরে নেওয়া হয়, আগে থেকেই একটি বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত ছিল, তাহলে সেই পরিকল্পনা কখন তৈরি হয়েছিল? কী ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তা করা হয়েছিল? কারা সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন? এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো অজানা।

এখানেই সবচেয়ে বড় সংকট। সত্যের জায়গাটি আজও খালি।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস তখনই তৈরি হয়, যখন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ব্যাখ্যা তথ্যের ভিত্তিতে জনগণের সামনে আসে। কিন্তু যখন ব্যাখ্যার পরিবর্তে নীরবতা থাকে, তখন সেই নীরবতাই নানা গুঞ্জন, গুজব এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই প্রবণতা নতুন নয়। বড় বড় জাতীয় ঘটনার পর প্রায়ই সত্যকে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার আড়ালে ঢেকে ফেলা হয়েছে। ফলে ইতিহাসের বইয়ে একটি বর্ণনা, রাজনৈতিক মঞ্চে আরেকটি বর্ণনা এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বর্ণনা স্থান পেয়েছে। সত্য মাঝখানেই হারিয়ে গেছে।

একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ ইতিহাস যদি প্রমাণের ওপর না দাঁড়ায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই বাস্তবতা জানতে পারবে না।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাও ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

আজ প্রশ্ন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করেছে। সংকটের সময় প্রশাসন কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোথায় কী ঘটেছে।

এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিতর্ক থামবে না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে একটি ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর চারপাশে কেন্দ্রীভূত হলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সিদ্ধান্ত আর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয় না; হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে। এর ফলে সংকটের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা সংবিধান অনুযায়ী কাজ করবে, নাকি ব্যক্তিগত আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেবে—এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও সেই প্রশ্ন থেকে মুক্ত নয়।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে ভেঙে পড়ে না। সরকার বদলায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। আইন কার্যকর থাকে। প্রশাসন তার নিয়মে চলে। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে।

কিন্তু যখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি ব্যক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই ব্যক্তি সরে গেলে পুরো কাঠামোও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। এ কারণেই ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কথা বারবার বলা হয়।

আরেকটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার মতো।

যদি সত্যিই সংকটের কয়েক দিন আগেই সম্ভাব্য দেশত্যাগ নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; সেটি গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রস্তুতির বিষয়। আর যদি এমন কোনো প্রস্তুতি না থেকেও এত দ্রুত সবকিছু সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলেও সেটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কারণ দুই ক্ষেত্রেই জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়।

বরং প্রশ্নহীন রাষ্ট্রই সবচেয়ে বিপজ্জনক রাষ্ট্র। কারণ সেখানে জবাবদিহি থাকে না। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগও থাকে না।

বাংলাদেশের মানুষ গত কয়েক দশকে বহু রাজনৈতিক সংকট দেখেছে। কিন্তু প্রতিবারই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—যে ঘটনাগুলোর পূর্ণ সত্য সময়মতো প্রকাশ করা হয়নি, সেগুলো পরবর্তীকালে আরও বড় বিভাজনের কারণ হয়েছে।

ইতিহাসকে যত বেশি গোপন রাখা হয়েছে, তত বেশি বেড়েছে অবিশ্বাস।

আজও সেই ভুল করা উচিত হবে না।

একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং পেশাদার অনুসন্ধানের মাধ্যমে পুরো ঘটনার প্রতিটি ধাপ জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। কে কখন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কোন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে, কোন প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল, কোনগুলো ছিল জরুরি পরিস্থিতির সিদ্ধান্ত—সবকিছুই নথিভুক্ত হওয়া উচিত।

এতে কোনো ব্যক্তি ছোট বা বড় হবেন না। বরং শক্তিশালী হবে রাষ্ট্র।

কারণ সত্য কখনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়। সত্যকে গোপন করাই রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া সামনে এগোনোর অন্য কোনো পথ নেই। যদি প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না; সেটি প্রচারণায় পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি জাতির যৌথ স্মৃতি। সেই স্মৃতিকে বিকৃত করা মানে ভবিষ্যৎকে বিভ্রান্ত করা।

সবশেষে একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাকে ঘিরে যত প্রশ্ন রয়েছে, তার উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়; প্রমাণে খুঁজতে হবে। অনুমান নয়, নথিতে। গুজব নয়, তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানে।

আজ হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু ইতিহাসের কাছে কোনো পক্ষের ভাষণ নয়, সত্যই টিকে থাকে।

সেই সত্য যত দেরিতেই আসুক, তাকে সামনে আনতেই হবে। কারণ একটি জাতি তখনই পরিণত হয়, যখন সে নিজের ইতিহাসের কঠিন অধ্যায় থেকেও চোখ ফিরিয়ে নেয় না।

আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য দীর্ঘস্থায়ী। রাষ্ট্র টিকে থাকে সত্য, জবাবদিহি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর; কোনো একক ব্যক্তি বা ক্ষমতার ওপর নয়। তাই ৫ আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে সব প্রশ্নের নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর এবং বিশ্বাসযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করা শুধু অতীতের হিসাব মেলানোর জন্য নয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও গণতান্ত্রিক, আরও প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও অপরিহার্য।

বিষয় : হাসিনার দেশ ত্যাগ পূর্বপরিকল্পিত

কাল মহাকাল

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


দেশত্যাগের সেই দিন: আকস্মিক সিদ্ধান্ত, নাকি আগে থেকেই সাজানো পরিকল্পনা?

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একজন প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন—এটাই খবর। কিন্তু কীভাবে, কেন এবং কোন প্রস্তুতিতে তিনি দেশ ছাড়লেন—সেটিই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৫ আগস্টের সেই ঘটনা শুধু একটি সরকারের পতনের গল্প নয়। এটি এমন একটি দিন, যা বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সেই দিনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি নীরবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনগণের জানার অধিকার। তাই আজ প্রশ্ন একটাই—শেখ হাসিনার দেশত্যাগ কি শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি আগে থেকেই প্রস্তুত করা একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন?

প্রথম দিকে ঘটনাটি অনেকের কাছে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক নাটকীয় পরিণতি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা তথ্য, বিভিন্ন বর্ণনা এবং ঘটনাক্রমের বিশ্লেষণ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। আর যেখানে উত্তর নেই, সেখানে সন্দেহ জন্ম নেয়। সন্দেহের সেই জায়গা থেকেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এটি কি শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি বহু আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা একটি বিকল্প পরিকল্পনার বাস্তবায়ন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগ নয়, যুক্তির কাছে যেতে হবে। কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়, তথ্য ও ঘটনার ধারাবাহিকতাকে দেখতে হবে।

একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান সংকটের মুহূর্তে দেশ ছাড়বেন, আর সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো প্রস্তুতি থাকবে না—এমনটি সাধারণত দেখা যায় না। কারণ একজন রাষ্ট্রনেতার নিরাপত্তা, চলাচল, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক গন্তব্য—সবকিছুই বহু স্তরের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। এটি কোনো ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়; এটি একটি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত।

তাহলে প্রশ্ন আসে, যদি সবকিছু সত্যিই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে এত দ্রুত সমন্বয় কীভাবে সম্ভব হলো? রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা কীভাবে এত অল্প সময়ে একই ছন্দে কাজ করল? একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য গন্তব্য নির্ধারণ করা, আকাশপথ সমন্বয় করা—এসব কি কয়েক মিনিটে সম্ভব?

আবার এর উল্টো দিকও আছে। যদি ধরে নেওয়া হয়, আগে থেকেই একটি বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত ছিল, তাহলে সেই পরিকল্পনা কখন তৈরি হয়েছিল? কী ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তা করা হয়েছিল? কারা সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন? এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো অজানা।

এখানেই সবচেয়ে বড় সংকট। সত্যের জায়গাটি আজও খালি।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস তখনই তৈরি হয়, যখন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ব্যাখ্যা তথ্যের ভিত্তিতে জনগণের সামনে আসে। কিন্তু যখন ব্যাখ্যার পরিবর্তে নীরবতা থাকে, তখন সেই নীরবতাই নানা গুঞ্জন, গুজব এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই প্রবণতা নতুন নয়। বড় বড় জাতীয় ঘটনার পর প্রায়ই সত্যকে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার আড়ালে ঢেকে ফেলা হয়েছে। ফলে ইতিহাসের বইয়ে একটি বর্ণনা, রাজনৈতিক মঞ্চে আরেকটি বর্ণনা এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বর্ণনা স্থান পেয়েছে। সত্য মাঝখানেই হারিয়ে গেছে।

একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ ইতিহাস যদি প্রমাণের ওপর না দাঁড়ায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই বাস্তবতা জানতে পারবে না।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাও ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

আজ প্রশ্ন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করেছে। সংকটের সময় প্রশাসন কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোথায় কী ঘটেছে।

এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিতর্ক থামবে না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে একটি ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর চারপাশে কেন্দ্রীভূত হলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সিদ্ধান্ত আর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয় না; হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে। এর ফলে সংকটের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা সংবিধান অনুযায়ী কাজ করবে, নাকি ব্যক্তিগত আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেবে—এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও সেই প্রশ্ন থেকে মুক্ত নয়।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে ভেঙে পড়ে না। সরকার বদলায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। আইন কার্যকর থাকে। প্রশাসন তার নিয়মে চলে। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে।

কিন্তু যখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি ব্যক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই ব্যক্তি সরে গেলে পুরো কাঠামোও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। এ কারণেই ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কথা বারবার বলা হয়।

আরেকটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার মতো।

যদি সত্যিই সংকটের কয়েক দিন আগেই সম্ভাব্য দেশত্যাগ নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; সেটি গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রস্তুতির বিষয়। আর যদি এমন কোনো প্রস্তুতি না থেকেও এত দ্রুত সবকিছু সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলেও সেটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কারণ দুই ক্ষেত্রেই জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়।

বরং প্রশ্নহীন রাষ্ট্রই সবচেয়ে বিপজ্জনক রাষ্ট্র। কারণ সেখানে জবাবদিহি থাকে না। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগও থাকে না।

বাংলাদেশের মানুষ গত কয়েক দশকে বহু রাজনৈতিক সংকট দেখেছে। কিন্তু প্রতিবারই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—যে ঘটনাগুলোর পূর্ণ সত্য সময়মতো প্রকাশ করা হয়নি, সেগুলো পরবর্তীকালে আরও বড় বিভাজনের কারণ হয়েছে।

ইতিহাসকে যত বেশি গোপন রাখা হয়েছে, তত বেশি বেড়েছে অবিশ্বাস।

আজও সেই ভুল করা উচিত হবে না।

একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং পেশাদার অনুসন্ধানের মাধ্যমে পুরো ঘটনার প্রতিটি ধাপ জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। কে কখন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কোন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে, কোন প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল, কোনগুলো ছিল জরুরি পরিস্থিতির সিদ্ধান্ত—সবকিছুই নথিভুক্ত হওয়া উচিত।

এতে কোনো ব্যক্তি ছোট বা বড় হবেন না। বরং শক্তিশালী হবে রাষ্ট্র।

কারণ সত্য কখনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়। সত্যকে গোপন করাই রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া সামনে এগোনোর অন্য কোনো পথ নেই। যদি প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না; সেটি প্রচারণায় পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি জাতির যৌথ স্মৃতি। সেই স্মৃতিকে বিকৃত করা মানে ভবিষ্যৎকে বিভ্রান্ত করা।

সবশেষে একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাকে ঘিরে যত প্রশ্ন রয়েছে, তার উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়; প্রমাণে খুঁজতে হবে। অনুমান নয়, নথিতে। গুজব নয়, তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানে।

আজ হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু ইতিহাসের কাছে কোনো পক্ষের ভাষণ নয়, সত্যই টিকে থাকে।

সেই সত্য যত দেরিতেই আসুক, তাকে সামনে আনতেই হবে। কারণ একটি জাতি তখনই পরিণত হয়, যখন সে নিজের ইতিহাসের কঠিন অধ্যায় থেকেও চোখ ফিরিয়ে নেয় না।

আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য দীর্ঘস্থায়ী। রাষ্ট্র টিকে থাকে সত্য, জবাবদিহি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর; কোনো একক ব্যক্তি বা ক্ষমতার ওপর নয়। তাই ৫ আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে সব প্রশ্নের নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর এবং বিশ্বাসযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করা শুধু অতীতের হিসাব মেলানোর জন্য নয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও গণতান্ত্রিক, আরও প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও অপরিহার্য।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত