আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

হরমুজকে মার্কিন ভুখন্ডের অংশ ঘোষণা করতে যাচ্ছে ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঘোষণা আসছে আগামী সপ্তাহে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণার মন্তব্যে সংঘাতের নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
হরমুজকে মার্কিন ভুখন্ডের অংশ ঘোষণা করতে যাচ্ছে ট্রাম্প
ছবি -সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে তেহরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন ও নজিরবিহীন দাবি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, খুব শিগগিরই প্রণালিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার কথা ভাবছেন।

১৪ আগস্ট নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই মন্তব্য করেন। এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে তা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এ বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। ফলে মন্তব্যটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, নাকি বাস্তব কোনো নীতিগত পরিকল্পনার ইঙ্গিত, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এর আগের দিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহে এমন কিছু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা আগে কোনো দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। তাঁর ভাষায়, তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি হরমুজে অব্যাহত অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো হবে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই তেহরানও অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, হুমকি বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনে ইরান ভয় পাবে না। হরমুজ প্রণালি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানের বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটনের চাপের মুখে প্রণালিকে ঘিরে ইরানের অবস্থান নরম হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম।

হরমুজে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে

সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টির বেশি জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট মাত্র দুটি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর আগের দিনও দুটি জাহাজ চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়।

এই জলপথের গুরুত্ব মূলত জ্বালানি বাণিজ্যের কারণে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিও এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ইরান বা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইতিমধ্যে সেই চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দামও প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। রয়টার্সের হিসাবে, মার্কিন ভোক্তাদের জন্য এক বছরে জ্বালানির দাম প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির রাজনৈতিক ঝুঁকিও কম নয়। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণ ভোটারের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে। ট্রাম্প অবশ্য মার্কিন নাগরিকদের কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার বিষয়টি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এই মূল্য দিতে হচ্ছে।

তবে প্রশাসনের ভেতরেই অগ্রাধিকারের প্রশ্নে ভিন্ন সুর রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আগে বলেছিলেন, মার্কিন জনগণের জন্য জ্বালানির দাম কম রাখা প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য; ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা তার পরের অগ্রাধিকার। ফলে তেলের দাম বাড়তে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনকে একই সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হবে।

অর্থনৈতিক অবরোধে নতুন পর্যায়

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে দেশটির তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনার তাৎপর্য হচ্ছে, ওয়াশিংটন এবার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের চাপও একসঙ্গে ব্যবহার করতে চাইছে।

বেসেন্টের বক্তব্যে এই কৌশলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি হরমুজ অবরোধের কথা বলেছেন। অর্থাৎ তেহরানের আয় কমানোর পাশাপাশি তার বাণিজ্যিক প্রবেশ ও বহির্গমন সীমিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তবে এর একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে সামরিক চাপ যত বাড়বে, সংঘাতের প্রভাব তত বেশি আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বীমা ব্যয়, জাহাজ চলাচলের খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

আব্রাহাম লিংকন নিয়েও চাপ

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির চাপ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর ওপরও পড়ছে। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৪০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান করে নতুন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের রেকর্ড করেছে। জাহাজটিতে প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন রয়েছেন।

নৌসদস্যদের পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলো কয়েকজন নাবিকের সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার কথাও প্রকাশ করেছে। নৌবাহিনী অবশ্য আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তবে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় কয়েকজনকে চিকিৎসা দেওয়ার কথা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প এসব উদ্বেগের গুরুত্ব কমিয়ে বলেছেন, আব্রাহাম লিংকনের মোতায়েনকাল তাঁর কাছে ‘যথেষ্ট দীর্ঘ নয়’। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, রণতরীটিকে শিগগিরই অন্য একটি বিমানবাহী রণতরী দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। এ জন্য ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সীমাবদ্ধতাও সামনে আনছে। একটি বিমানবাহী রণতরীকে দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার অপারেশনে রাখার অর্থ হলো বিপুল জনবল, সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা একই সঙ্গে সচল রাখা। সংঘাত দীর্ঘ হলে এই চাপ আরও বাড়বে।

আলোচনার পথ এখনো বন্ধ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত থামানোর জন্য জুনে যে সমঝোতার উদ্যোগ হয়েছিল, তা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। তবে এটিকে সরাসরি যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার পর্যায়ে নেওয়া হয়নি।

এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে দুই পক্ষের চাপ প্রয়োগের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ওয়াশিংটন চাইছে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে সমঝোতায় আনতে। তেহরানও হরমুজের ওপর নিজের প্রভাবকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে।

সংঘাতের পরবর্তী পর্যায় তাই শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো। হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে সেই চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাজার ও কূটনীতির বড় প্রশ্ন।

বিষয় : হরমুজ প্রণালি মার্কিন ভুখন্ড

কাল মহাকাল

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬


হরমুজকে মার্কিন ভুখন্ডের অংশ ঘোষণা করতে যাচ্ছে ট্রাম্প

প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ইরানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে তেহরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন ও নজিরবিহীন দাবি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, খুব শিগগিরই প্রণালিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার কথা ভাবছেন।

১৪ আগস্ট নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই মন্তব্য করেন। এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে তা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এ বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। ফলে মন্তব্যটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, নাকি বাস্তব কোনো নীতিগত পরিকল্পনার ইঙ্গিত, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এর আগের দিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহে এমন কিছু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা আগে কোনো দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। তাঁর ভাষায়, তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি হরমুজে অব্যাহত অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো হবে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই তেহরানও অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, হুমকি বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনে ইরান ভয় পাবে না। হরমুজ প্রণালি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানের বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটনের চাপের মুখে প্রণালিকে ঘিরে ইরানের অবস্থান নরম হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম।

হরমুজে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে

সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টির বেশি জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট মাত্র দুটি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর আগের দিনও দুটি জাহাজ চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়।

এই জলপথের গুরুত্ব মূলত জ্বালানি বাণিজ্যের কারণে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিও এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ইরান বা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইতিমধ্যে সেই চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দামও প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। রয়টার্সের হিসাবে, মার্কিন ভোক্তাদের জন্য এক বছরে জ্বালানির দাম প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির রাজনৈতিক ঝুঁকিও কম নয়। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে সাধারণ ভোটারের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে। ট্রাম্প অবশ্য মার্কিন নাগরিকদের কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার বিষয়টি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এই মূল্য দিতে হচ্ছে।

তবে প্রশাসনের ভেতরেই অগ্রাধিকারের প্রশ্নে ভিন্ন সুর রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আগে বলেছিলেন, মার্কিন জনগণের জন্য জ্বালানির দাম কম রাখা প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য; ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা তার পরের অগ্রাধিকার। ফলে তেলের দাম বাড়তে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনকে একই সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হবে।

অর্থনৈতিক অবরোধে নতুন পর্যায়

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে দেশটির তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনার তাৎপর্য হচ্ছে, ওয়াশিংটন এবার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের চাপও একসঙ্গে ব্যবহার করতে চাইছে।

বেসেন্টের বক্তব্যে এই কৌশলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি হরমুজ অবরোধের কথা বলেছেন। অর্থাৎ তেহরানের আয় কমানোর পাশাপাশি তার বাণিজ্যিক প্রবেশ ও বহির্গমন সীমিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তবে এর একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে সামরিক চাপ যত বাড়বে, সংঘাতের প্রভাব তত বেশি আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বীমা ব্যয়, জাহাজ চলাচলের খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

আব্রাহাম লিংকন নিয়েও চাপ

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির চাপ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর ওপরও পড়ছে। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৪০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান করে নতুন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের রেকর্ড করেছে। জাহাজটিতে প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন রয়েছেন।

নৌসদস্যদের পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলো কয়েকজন নাবিকের সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার কথাও প্রকাশ করেছে। নৌবাহিনী অবশ্য আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তবে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় কয়েকজনকে চিকিৎসা দেওয়ার কথা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প এসব উদ্বেগের গুরুত্ব কমিয়ে বলেছেন, আব্রাহাম লিংকনের মোতায়েনকাল তাঁর কাছে ‘যথেষ্ট দীর্ঘ নয়’। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, রণতরীটিকে শিগগিরই অন্য একটি বিমানবাহী রণতরী দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। এ জন্য ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সীমাবদ্ধতাও সামনে আনছে। একটি বিমানবাহী রণতরীকে দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার অপারেশনে রাখার অর্থ হলো বিপুল জনবল, সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা একই সঙ্গে সচল রাখা। সংঘাত দীর্ঘ হলে এই চাপ আরও বাড়বে।

আলোচনার পথ এখনো বন্ধ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত থামানোর জন্য জুনে যে সমঝোতার উদ্যোগ হয়েছিল, তা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। তবে এটিকে সরাসরি যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার পর্যায়ে নেওয়া হয়নি।

এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে দুই পক্ষের চাপ প্রয়োগের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ওয়াশিংটন চাইছে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে সমঝোতায় আনতে। তেহরানও হরমুজের ওপর নিজের প্রভাবকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে।

সংঘাতের পরবর্তী পর্যায় তাই শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো। হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে সেই চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাজার ও কূটনীতির বড় প্রশ্ন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত