আন্তর্জাতিক
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকারের দাবি, বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে থাকা ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হয়েছে। রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার কথাও জানিয়েছে মিয়ানমার।
রোহিঙ্গা সংকট নবম বছরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য প্রকাশ করে। বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই করতে গিয়ে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় পরীক্ষা করেছে মিয়ানমার। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে পুরো তালিকা নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান এখনো কঠোর। দেশটির হিসাবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আরও ৪ হাজার ২৪১ জনকে তারা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে দাবি করেছে। ফলে বাংলাদেশের তালিকার একটি বড় অংশের বিষয়ে এখনো দুই দেশের অবস্থান এক হয়নি।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে কাজ করবে তারা। এই বক্তব্যকে প্রত্যাবাসন আলোচনায় একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ঘোষণা দেয়নি মিয়ানমার।
প্রত্যাবাসনের মূল বাধা রাখাইনের নিরাপত্তা
রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির লড়াই তীব্র হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যটির বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় শুধু ঢাকার সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সমঝোতা করলেই প্রত্যাবাসন কার্যকর করা কঠিন। বাংলাদেশও বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চলতি বছরের জুনে সংসদে জানিয়েছিলেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষায়, প্রত্যাবাসনের গতি নির্ভর করছে রাখাইনের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জুলাইয়ে সংসদে জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সামরিক সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংলাপের সম্ভাবনা বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
২০১৭ সালের পর বদলে গেছে পরিস্থিতি
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে বিভিন্ন দফায় সহিংসতার কারণেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে ব্যাপক সহিংসতা, হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগ ওঠে। মিয়ানমার অবশ্য রোহিঙ্গাদের নিজস্ব স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না। দেশটির সরকারি বর্ণনায় তাদের ‘বাঙালি’ বলা হয় এবং বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে দাবি করা হয়।
এই পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নই প্রত্যাবাসনের অন্যতম জটিল বিষয় হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৮ সালে দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছিল। কিন্তু রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং পরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে। পরে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লড়াই রাখাইনকেন্দ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
শিবিরে বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি সংকট
প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজার ও ভাসানচরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীসহ ১৬ লাখ মানুষের সহায়তায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘে বারবার বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও সেখানেই হতে হবে। জুনে জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নয়, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপের মুখে রয়েছে। তিনি দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।
দীর্ঘ অপেক্ষা ও শিবিরের কঠিন জীবন অনেক রোহিঙ্গাকে বিকল্প পথ খুঁজতেও বাধ্য করছে। কেউ কেউ পাচারকারীদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের যাত্রায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
মিয়ানমারের ঘোষণায় নতুন আশার সঙ্গে পুরোনো সংশয়
মিয়ানমারের সর্বশেষ ঘোষণার গুরুত্ব রয়েছে মূলত সংখ্যাটির কারণে। তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হলো, দীর্ঘদিনের যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্তত একটি বড় অংশের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে এটিকে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ মিয়ানমার স্পষ্টভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার শর্ত দিয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, বসতভিটায় ফেরার অধিকার এবং প্রত্যাবর্তনের পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা এখনো নেই।
এ মাসের শুরুতে মালয়েশিয়ায় আটক ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েও একই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা বললেও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা পরে জানান, সেই প্রক্রিয়া মূলত যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের নিয়ে এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়টি এর আওতায় নেই।
বাংলাদেশের জন্য তাই পরবর্তী পর্যায়ের কূটনীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রত্যাবাসনের সংখ্যা নির্ধারণের পাশাপাশি ফিরিয়ে নেওয়া মানুষগুলোর নিরাপত্তা, মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও নিজ এলাকায় বসবাসের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি ও অন্যান্য পক্ষের সংঘাত চলতে থাকলে শুধু কাগজে-কলমে যাচাই সম্পন্ন করাই বাস্তব প্রত্যাবাসনের পথ খুলবে না।
মিয়ানমারের ঘোষণায় তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গার ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়ার জন্য দরকার নির্দিষ্ট সময়সূচি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পাশাপাশি রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা।
বিষয় : মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
2.png)
রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকারের দাবি, বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে থাকা ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হয়েছে। রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার কথাও জানিয়েছে মিয়ানমার।
রোহিঙ্গা সংকট নবম বছরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য প্রকাশ করে। বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই করতে গিয়ে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় পরীক্ষা করেছে মিয়ানমার। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে পুরো তালিকা নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান এখনো কঠোর। দেশটির হিসাবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আরও ৪ হাজার ২৪১ জনকে তারা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে দাবি করেছে। ফলে বাংলাদেশের তালিকার একটি বড় অংশের বিষয়ে এখনো দুই দেশের অবস্থান এক হয়নি।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে কাজ করবে তারা। এই বক্তব্যকে প্রত্যাবাসন আলোচনায় একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ঘোষণা দেয়নি মিয়ানমার।
প্রত্যাবাসনের মূল বাধা রাখাইনের নিরাপত্তা
রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির লড়াই তীব্র হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যটির বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় শুধু ঢাকার সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সমঝোতা করলেই প্রত্যাবাসন কার্যকর করা কঠিন। বাংলাদেশও বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চলতি বছরের জুনে সংসদে জানিয়েছিলেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষায়, প্রত্যাবাসনের গতি নির্ভর করছে রাখাইনের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জুলাইয়ে সংসদে জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সামরিক সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংলাপের সম্ভাবনা বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
২০১৭ সালের পর বদলে গেছে পরিস্থিতি
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে বিভিন্ন দফায় সহিংসতার কারণেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে ব্যাপক সহিংসতা, হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগ ওঠে। মিয়ানমার অবশ্য রোহিঙ্গাদের নিজস্ব স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না। দেশটির সরকারি বর্ণনায় তাদের ‘বাঙালি’ বলা হয় এবং বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে দাবি করা হয়।
এই পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নই প্রত্যাবাসনের অন্যতম জটিল বিষয় হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৮ সালে দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছিল। কিন্তু রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং পরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে। পরে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লড়াই রাখাইনকেন্দ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
শিবিরে বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি সংকট
প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজার ও ভাসানচরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীসহ ১৬ লাখ মানুষের সহায়তায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘে বারবার বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও সেখানেই হতে হবে। জুনে জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নয়, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপের মুখে রয়েছে। তিনি দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।
দীর্ঘ অপেক্ষা ও শিবিরের কঠিন জীবন অনেক রোহিঙ্গাকে বিকল্প পথ খুঁজতেও বাধ্য করছে। কেউ কেউ পাচারকারীদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের যাত্রায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
মিয়ানমারের ঘোষণায় নতুন আশার সঙ্গে পুরোনো সংশয়
মিয়ানমারের সর্বশেষ ঘোষণার গুরুত্ব রয়েছে মূলত সংখ্যাটির কারণে। তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হলো, দীর্ঘদিনের যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্তত একটি বড় অংশের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে এটিকে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ মিয়ানমার স্পষ্টভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার শর্ত দিয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, বসতভিটায় ফেরার অধিকার এবং প্রত্যাবর্তনের পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা এখনো নেই।
এ মাসের শুরুতে মালয়েশিয়ায় আটক ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েও একই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা বললেও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা পরে জানান, সেই প্রক্রিয়া মূলত যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের নিয়ে এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়টি এর আওতায় নেই।
বাংলাদেশের জন্য তাই পরবর্তী পর্যায়ের কূটনীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রত্যাবাসনের সংখ্যা নির্ধারণের পাশাপাশি ফিরিয়ে নেওয়া মানুষগুলোর নিরাপত্তা, মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও নিজ এলাকায় বসবাসের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি ও অন্যান্য পক্ষের সংঘাত চলতে থাকলে শুধু কাগজে-কলমে যাচাই সম্পন্ন করাই বাস্তব প্রত্যাবাসনের পথ খুলবে না।
মিয়ানমারের ঘোষণায় তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গার ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়ার জন্য দরকার নির্দিষ্ট সময়সূচি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পাশাপাশি রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা।
2.png)