আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

২৫০ দিন সমুদ্রে মার্কিন রণতরী, খাবার সংকটে বাড়ছে মানসিক চাপ

দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সামরিক সদস্যের জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরবরাহ ঘাটতি, নষ্ট প্লাম্বিং ও মানসিক চাপের অভিযোগের জবাব চেয়েছেন আইনপ্রণেতারা।

২৫০ দিন সমুদ্রে মার্কিন রণতরী, খাবার সংকটে বাড়ছে মানসিক চাপ
ছবি -সংগৃহীত

২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরীটির নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি, নষ্ট টয়লেট ও প্লাম্বিং, লন্ড্রি সুবিধার সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কারণে ক্লান্তি ও মানসিক চাপের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা।

মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরীটির কয়েকজন সদস্য সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার কথা বিবেচনা করেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এতে জাহাজে দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বৃহস্পতিবার তিনি অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন।

রণতরীটি গত বছরের নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পরে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। মে মাসে এর মোতায়েন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে। এখনো রণতরীটির দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।

একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিয়মিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত রণতরীটির জায়গায় ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বর্তমান রণতরীটি ঠিক কবে সমুদ্র থেকে ফিরবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে চিঠি দিয়েছেন কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। সেখানে তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট, পানিদূষণ, প্লাম্বিংয়ের ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা এবং ডাকব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো বিষয় তুলে ধরেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতে একজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যান। পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাঁকে উদ্ধার করে জাহাজের চিকিৎসা বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

জাহাজে থাকা এক নাবিকের স্বজন বিবিসিকে জানিয়েছেন, দায়িত্ব শুরু করার পর ওই নাবিকের প্রায় ২৯ কেজি ওজন কমেছে। দীর্ঘ সময় কোনো বন্দরে না থামা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগের অভাব এবং বিমান ওঠানামা ও ইঞ্জিনের লাগাতার শব্দ ও কম্পন নাবিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে ওই স্বজনের দাবি।

ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইক লেভিনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রণতরীটির জীবনযাপন নিয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, সেখানে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকা লন্ড্রি সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকটের পাশাপাশি খাবারের ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন তিনি। সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়েও সংকটের অভিযোগ রয়েছে।

তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে বর্তমানে মিশনের জন্য অত্যাবশ্যক সরঞ্জাম ও পণ্য পৌঁছে দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, রণতরীটিতে বিশুদ্ধ পানি, কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।

পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথও নৌবাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিটি জাহাজ, নাবিক ও কমান্ডারের প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। দীর্ঘ ও কঠিন মোতায়েনে দায়িত্ব পালনের জন্য নাবিকদের প্রশংসাও করেন তিনি।

দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নৌসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে গুরুতর মানসিক চাপের হার বেশি। জাহাজের জীবনযাপনের পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং বিশ্রামের সীমিত সুযোগকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সক্ষমতার পাশাপাশি নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে সরবরাহব্যবস্থা ও বিশ্রামের ঘাটতি কতটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সেটিই এখন মার্কিন আইনপ্রণেতা ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়।

বিষয় : মার্কিন রণতরী খাবার সংকট

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬


২৫০ দিন সমুদ্রে মার্কিন রণতরী, খাবার সংকটে বাড়ছে মানসিক চাপ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরীটির নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি, নষ্ট টয়লেট ও প্লাম্বিং, লন্ড্রি সুবিধার সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কারণে ক্লান্তি ও মানসিক চাপের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা।

মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরীটির কয়েকজন সদস্য সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার কথা বিবেচনা করেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এতে জাহাজে দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বৃহস্পতিবার তিনি অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন।

রণতরীটি গত বছরের নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পরে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। মে মাসে এর মোতায়েন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে। এখনো রণতরীটির দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।

একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিয়মিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত রণতরীটির জায়গায় ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বর্তমান রণতরীটি ঠিক কবে সমুদ্র থেকে ফিরবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে চিঠি দিয়েছেন কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। সেখানে তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট, পানিদূষণ, প্লাম্বিংয়ের ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা এবং ডাকব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো বিষয় তুলে ধরেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতে একজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যান। পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাঁকে উদ্ধার করে জাহাজের চিকিৎসা বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

জাহাজে থাকা এক নাবিকের স্বজন বিবিসিকে জানিয়েছেন, দায়িত্ব শুরু করার পর ওই নাবিকের প্রায় ২৯ কেজি ওজন কমেছে। দীর্ঘ সময় কোনো বন্দরে না থামা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগের অভাব এবং বিমান ওঠানামা ও ইঞ্জিনের লাগাতার শব্দ ও কম্পন নাবিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে ওই স্বজনের দাবি।

ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইক লেভিনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রণতরীটির জীবনযাপন নিয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, সেখানে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকা লন্ড্রি সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকটের পাশাপাশি খাবারের ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন তিনি। সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়েও সংকটের অভিযোগ রয়েছে।

তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে বর্তমানে মিশনের জন্য অত্যাবশ্যক সরঞ্জাম ও পণ্য পৌঁছে দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, রণতরীটিতে বিশুদ্ধ পানি, কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।

পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথও নৌবাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিটি জাহাজ, নাবিক ও কমান্ডারের প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। দীর্ঘ ও কঠিন মোতায়েনে দায়িত্ব পালনের জন্য নাবিকদের প্রশংসাও করেন তিনি।

দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নৌসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে গুরুতর মানসিক চাপের হার বেশি। জাহাজের জীবনযাপনের পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং বিশ্রামের সীমিত সুযোগকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সক্ষমতার পাশাপাশি নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে সরবরাহব্যবস্থা ও বিশ্রামের ঘাটতি কতটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সেটিই এখন মার্কিন আইনপ্রণেতা ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত