খেলা
একসময় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলাটাই বাংলাদেশের জন্য ছিল বড় ঘটনা। জয়ের কথা তখন অনেক দূরের। সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের চেয়ে স্বাগতিকরাই বেশি চাপে।
ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করেছে বাংলাদেশ। এরপর ব্যাট হাতে দিন শেষ করেছে ১ উইকেটে ৯৬ রানে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে মাত্র ১০২ রানে। হাতে এখনো নয় উইকেট।
দিনের শুরুতে কে ভেবেছিল গল্পটা এমন হবে?
টস জিতে অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং নিয়েছিল। নিজেদের মাঠ, পরিচিত কন্ডিশন, বিশ্বমানের পেস আক্রমণ—সব মিলিয়ে ম্যাচের শুরুতে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকার কথা ছিল স্বাগতিকদের। কিন্তু নতুন বল হাতে বাংলাদেশ যে চাপ তৈরি করল, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং সেটি সামলাতে পারল না।
শুরুটা করেছিলেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদের বলে গতি ছিল, সুইং ছিল, আর ছিল অফ স্টাম্পের আশপাশে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। তাসকিন আহমেদও অন্য প্রান্ত থেকে চাপ ধরে রাখলেন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের স্বাভাবিক শট খেলার জায়গা কমে গেল।
এরপর একে একে উইকেট।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে একমাত্র বড় প্রতিরোধ এসেছে স্টিভ স্মিথের ব্যাট থেকে। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান ৭১ রান করেছেন। এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে দুই শর কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। কিন্তু অন্য প্রান্তে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে টিকতে পারেননি কেউই।
হাসান তখন থামার নামই নিচ্ছেন না।
একটির পর একটি উইকেট নিয়ে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে সবচেয়ে বড় আঘাতটা তিনিই করেছেন। ৫৫ রানে ৬ উইকেট—ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স একজন বাংলাদেশি পেসারের জন্য আলাদা করে মনে রাখার মতো।
১৯৮ রানে থামল অস্ট্রেলিয়া।
তারপর শুরু হলো বাংলাদেশের ব্যাটিং।
এখানেই ম্যাচটা অন্য দিকে চলে যেতে পারত। কারণ অস্ট্রেলিয়ার হাতে তখনও প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন। ১৯৮ রানের জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশের টপ অর্ডার দ্রুত ফিরলে দিনের সব হিসাবই বদলে যেতে পারত।
কিন্তু বাংলাদেশ এবার সেই পুরোনো ভুল করেনি।
শুরুটা সামলেছেন ব্যাটসম্যানরা। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা আক্রমণ করেছেন, স্টার্কের গতি ছিল, ফিল্ডাররা কাছাকাছি ছিল। তারপরও বাংলাদেশ উইকেট বিলিয়ে দেয়নি। একটি উইকেট হারিয়ে দিনের শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে।
স্কোর ৯৬/১।
ক্রিজে মুমিনুল হক। সঙ্গে তানজিদ হাসান। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের সঙ্গে ব্যবধানটা এখন মাত্র ১০২ রান।
এই জায়গাটায় এসে আজকের দিনের ক্রিকেটীয় গুরুত্বটা বোঝা যায়।
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের শুরুটা ছিল অন্যরকম। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রধান লড়াই ছিল ম্যাচটাকে যতটা সম্ভব দীর্ঘ করা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সিরিজে ২০০৩ সালে দুই ম্যাচেই হেরেছিল বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট তখন অন্য উচ্চতায়।
তাদের ঘরোয়া কাঠামো শক্তিশালী, খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, পেস বোলিংয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্য। বাংলাদেশের তখনও টেস্ট ক্রিকেটের ভিত শক্ত করার কাজ চলছে।
ফলে দুই দলের মধ্যে ব্যবধানটা শুধু মাঠের স্কোরে ছিল না। মানসিক ব্যবধানও ছিল।
বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তখন এমন কথাও বলা হতো—অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সঙ্গে খেললে লাভ কী? বড় দলগুলোর কাছে বাংলাদেশ ছিল অনেকটা সহজ প্রতিপক্ষ। বাংলাদেশের বিপক্ষে জিতবে কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে কত দ্রুত জিতবে—এমন মানসিকতাও ছিল।
সময় বদলেছে।
২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ সেই ব্যবধানের প্রথম বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে সেই টেস্ট জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ছিল মাইলফলক। সেদিনও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাকে অনেকে ম্যাচের আগে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি।
কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই।
মাঠে পুরোনো পরিচয় খুব বেশি কাজে আসে না।
কে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কে নতুন দল—বল হাতে নেওয়ার পর হিসাবটা বদলে যায়।
আজ ডারউইনে সেই হিসাবই বদলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ খেলছে বহু বছর পর। এই সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের শেষ টেস্ট হয়েছিল ২০০৩ সালে। এত দীর্ঘ বিরতির পর ফেরার প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসাররা স্বাগতিকদের ব্যাটিং ধসিয়ে দিয়েছেন।
আর সেটাও কোনো দুর্বল অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে নয়।
স্টিভ স্মিথ আছেন। প্যাট কামিন্স আছেন। মিচেল স্টার্ক আছেন। জশ হ্যাজলউড আছেন। নাথান লায়ন আছেন। বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবেই অস্ট্রেলিয়া এই সিরিজে নেমেছে।
তাই ১৯৮ সংখ্যাটা আরও জোরে কথা বলে।
অবশ্য ক্রিকেটে একটি দিনের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো ম্যাচের ফল লেখা যায় না। টেস্ট ম্যাচের গল্প লম্বা। আজ বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, কাল অস্ট্রেলিয়া ফিরতে পারে। ৯৬/১ থেকে বাংলাদেশের ব্যাটিং ভেঙেও পড়তে পারে, আবার এখান থেকেই বড় লিডও তৈরি হতে পারে।
তবে আজকের দিনটির আলাদা মূল্য আছে।
কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে এমন দিন খুব ঘন ঘন আসে না।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায়।
এই দলটার বিপক্ষে বাংলাদেশকে একসময় খেলতে দেখলেই মনে হতো, ম্যাচটা যেন শুরু হচ্ছে অনেক পিছিয়ে থেকে। অস্ট্রেলিয়ার নামের সঙ্গে একটা ভয় জড়িয়ে থাকত। তাদের পেসারদের গতি, ব্যাটসম্যানদের আক্রমণ, স্লেজিং, ফিল্ডিং—সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর একটা আলাদা মানসিক চাপ তৈরি করত তারা।
আজ সেই চাপটা যেন উল্টো দিকে।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের পেস সামলাতে পারেননি। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা অস্ট্রেলিয়ার পেসের সামনে দিনের শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেছেন।
ক্রিকেটের ইতিহাসে বড় দলগুলোকে হারানোর গল্পগুলো সাধারণত একটা ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়। তারপর সেই ম্যাচ থেকে জন্ম নেয় বিশ্বাস। একসময় যা অসম্ভব মনে হতো, পরের প্রজন্ম সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে মাঠে নামে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটেও এমন পরিবর্তন গত দুই দশকে দেখা গেছে।
২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারানো ছিল বিস্ময়। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানো ছিল ইতিহাস। ২০১৭ সালে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো ছিল নতুন অধ্যায়। এরপর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছে বড় দলকে হারানোর ধারণাটা আর পুরোপুরি অচেনা থাকেনি।
ডারউইনের আজকের দিন সেই পথের আরেকটি দৃশ্য।
হয়তো আগামীকাল অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফিরবে। হয়তো বাংলাদেশ এমন লিড নেবে, যেখান থেকে ম্যাচটা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সেটা জানতে আরও সময় লাগবে।
আজ শুধু একটা দিনের হিসাব রাখা যাক।
অস্ট্রেলিয়া—১৯৮ অলআউট।
বাংলাদেশ—৯৬/১।
আর স্কোরবোর্ডের এই দুই সংখ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট, বাংলাদেশের পেস আক্রমণের দাপট, ব্যাটসম্যানদের সংযম আর বহু বছরের অপেক্ষা।
বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটে আনন্দ করার উপলক্ষ খোঁজে। কখনো সেই উপলক্ষ আসে বড় জয় হয়ে, কখনো আসে কোনো ক্রিকেটারের দুর্দান্ত ইনিংসে, কখনো আসে শেষ ওভারের নাটকীয়তায়।
আজ এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি অসাধারণ প্রথম দিন হয়ে।
আগামীকাল কী হবে, সেটা কালকের খেলা বলবে।
আজকের হিসাবটা বাংলাদেশ রেখে দিয়েছে।
আজকের দিনটা তাই একটু নিজের মতো করে উপভোগ করাই যায়।
কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন দিন বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিদিন আসে না।
2.png)
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
একসময় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলাটাই বাংলাদেশের জন্য ছিল বড় ঘটনা। জয়ের কথা তখন অনেক দূরের। সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের চেয়ে স্বাগতিকরাই বেশি চাপে।
ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করেছে বাংলাদেশ। এরপর ব্যাট হাতে দিন শেষ করেছে ১ উইকেটে ৯৬ রানে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে মাত্র ১০২ রানে। হাতে এখনো নয় উইকেট।
দিনের শুরুতে কে ভেবেছিল গল্পটা এমন হবে?
টস জিতে অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং নিয়েছিল। নিজেদের মাঠ, পরিচিত কন্ডিশন, বিশ্বমানের পেস আক্রমণ—সব মিলিয়ে ম্যাচের শুরুতে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকার কথা ছিল স্বাগতিকদের। কিন্তু নতুন বল হাতে বাংলাদেশ যে চাপ তৈরি করল, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং সেটি সামলাতে পারল না।
শুরুটা করেছিলেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদের বলে গতি ছিল, সুইং ছিল, আর ছিল অফ স্টাম্পের আশপাশে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। তাসকিন আহমেদও অন্য প্রান্ত থেকে চাপ ধরে রাখলেন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের স্বাভাবিক শট খেলার জায়গা কমে গেল।
এরপর একে একে উইকেট।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে একমাত্র বড় প্রতিরোধ এসেছে স্টিভ স্মিথের ব্যাট থেকে। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান ৭১ রান করেছেন। এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে দুই শর কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। কিন্তু অন্য প্রান্তে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে টিকতে পারেননি কেউই।
হাসান তখন থামার নামই নিচ্ছেন না।
একটির পর একটি উইকেট নিয়ে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে সবচেয়ে বড় আঘাতটা তিনিই করেছেন। ৫৫ রানে ৬ উইকেট—ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স একজন বাংলাদেশি পেসারের জন্য আলাদা করে মনে রাখার মতো।
১৯৮ রানে থামল অস্ট্রেলিয়া।
তারপর শুরু হলো বাংলাদেশের ব্যাটিং।
এখানেই ম্যাচটা অন্য দিকে চলে যেতে পারত। কারণ অস্ট্রেলিয়ার হাতে তখনও প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন। ১৯৮ রানের জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশের টপ অর্ডার দ্রুত ফিরলে দিনের সব হিসাবই বদলে যেতে পারত।
কিন্তু বাংলাদেশ এবার সেই পুরোনো ভুল করেনি।
শুরুটা সামলেছেন ব্যাটসম্যানরা। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা আক্রমণ করেছেন, স্টার্কের গতি ছিল, ফিল্ডাররা কাছাকাছি ছিল। তারপরও বাংলাদেশ উইকেট বিলিয়ে দেয়নি। একটি উইকেট হারিয়ে দিনের শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে।
স্কোর ৯৬/১।
ক্রিজে মুমিনুল হক। সঙ্গে তানজিদ হাসান। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের সঙ্গে ব্যবধানটা এখন মাত্র ১০২ রান।
এই জায়গাটায় এসে আজকের দিনের ক্রিকেটীয় গুরুত্বটা বোঝা যায়।
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের শুরুটা ছিল অন্যরকম। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রধান লড়াই ছিল ম্যাচটাকে যতটা সম্ভব দীর্ঘ করা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সিরিজে ২০০৩ সালে দুই ম্যাচেই হেরেছিল বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট তখন অন্য উচ্চতায়।
তাদের ঘরোয়া কাঠামো শক্তিশালী, খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, পেস বোলিংয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্য। বাংলাদেশের তখনও টেস্ট ক্রিকেটের ভিত শক্ত করার কাজ চলছে।
ফলে দুই দলের মধ্যে ব্যবধানটা শুধু মাঠের স্কোরে ছিল না। মানসিক ব্যবধানও ছিল।
বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তখন এমন কথাও বলা হতো—অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সঙ্গে খেললে লাভ কী? বড় দলগুলোর কাছে বাংলাদেশ ছিল অনেকটা সহজ প্রতিপক্ষ। বাংলাদেশের বিপক্ষে জিতবে কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে কত দ্রুত জিতবে—এমন মানসিকতাও ছিল।
সময় বদলেছে।
২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ সেই ব্যবধানের প্রথম বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে সেই টেস্ট জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ছিল মাইলফলক। সেদিনও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাকে অনেকে ম্যাচের আগে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি।
কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই।
মাঠে পুরোনো পরিচয় খুব বেশি কাজে আসে না।
কে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কে নতুন দল—বল হাতে নেওয়ার পর হিসাবটা বদলে যায়।
আজ ডারউইনে সেই হিসাবই বদলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ খেলছে বহু বছর পর। এই সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের শেষ টেস্ট হয়েছিল ২০০৩ সালে। এত দীর্ঘ বিরতির পর ফেরার প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসাররা স্বাগতিকদের ব্যাটিং ধসিয়ে দিয়েছেন।
আর সেটাও কোনো দুর্বল অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে নয়।
স্টিভ স্মিথ আছেন। প্যাট কামিন্স আছেন। মিচেল স্টার্ক আছেন। জশ হ্যাজলউড আছেন। নাথান লায়ন আছেন। বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবেই অস্ট্রেলিয়া এই সিরিজে নেমেছে।
তাই ১৯৮ সংখ্যাটা আরও জোরে কথা বলে।
অবশ্য ক্রিকেটে একটি দিনের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো ম্যাচের ফল লেখা যায় না। টেস্ট ম্যাচের গল্প লম্বা। আজ বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, কাল অস্ট্রেলিয়া ফিরতে পারে। ৯৬/১ থেকে বাংলাদেশের ব্যাটিং ভেঙেও পড়তে পারে, আবার এখান থেকেই বড় লিডও তৈরি হতে পারে।
তবে আজকের দিনটির আলাদা মূল্য আছে।
কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে এমন দিন খুব ঘন ঘন আসে না।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায়।
এই দলটার বিপক্ষে বাংলাদেশকে একসময় খেলতে দেখলেই মনে হতো, ম্যাচটা যেন শুরু হচ্ছে অনেক পিছিয়ে থেকে। অস্ট্রেলিয়ার নামের সঙ্গে একটা ভয় জড়িয়ে থাকত। তাদের পেসারদের গতি, ব্যাটসম্যানদের আক্রমণ, স্লেজিং, ফিল্ডিং—সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর একটা আলাদা মানসিক চাপ তৈরি করত তারা।
আজ সেই চাপটা যেন উল্টো দিকে।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের পেস সামলাতে পারেননি। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা অস্ট্রেলিয়ার পেসের সামনে দিনের শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেছেন।
ক্রিকেটের ইতিহাসে বড় দলগুলোকে হারানোর গল্পগুলো সাধারণত একটা ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়। তারপর সেই ম্যাচ থেকে জন্ম নেয় বিশ্বাস। একসময় যা অসম্ভব মনে হতো, পরের প্রজন্ম সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে মাঠে নামে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটেও এমন পরিবর্তন গত দুই দশকে দেখা গেছে।
২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারানো ছিল বিস্ময়। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানো ছিল ইতিহাস। ২০১৭ সালে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো ছিল নতুন অধ্যায়। এরপর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছে বড় দলকে হারানোর ধারণাটা আর পুরোপুরি অচেনা থাকেনি।
ডারউইনের আজকের দিন সেই পথের আরেকটি দৃশ্য।
হয়তো আগামীকাল অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফিরবে। হয়তো বাংলাদেশ এমন লিড নেবে, যেখান থেকে ম্যাচটা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সেটা জানতে আরও সময় লাগবে।
আজ শুধু একটা দিনের হিসাব রাখা যাক।
অস্ট্রেলিয়া—১৯৮ অলআউট।
বাংলাদেশ—৯৬/১।
আর স্কোরবোর্ডের এই দুই সংখ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট, বাংলাদেশের পেস আক্রমণের দাপট, ব্যাটসম্যানদের সংযম আর বহু বছরের অপেক্ষা।
বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটে আনন্দ করার উপলক্ষ খোঁজে। কখনো সেই উপলক্ষ আসে বড় জয় হয়ে, কখনো আসে কোনো ক্রিকেটারের দুর্দান্ত ইনিংসে, কখনো আসে শেষ ওভারের নাটকীয়তায়।
আজ এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি অসাধারণ প্রথম দিন হয়ে।
আগামীকাল কী হবে, সেটা কালকের খেলা বলবে।
আজকের হিসাবটা বাংলাদেশ রেখে দিয়েছে।
আজকের দিনটা তাই একটু নিজের মতো করে উপভোগ করাই যায়।
কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন দিন বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিদিন আসে না।
2.png)