সম্পাদকীয়
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এই মনোনয়ন ঠিক করেছেন, আর জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফখরুলের বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়াটা এখন কার্যত সময়ের অপেক্ষা মাত্র। নির্বাচন কমিশন এ জন্য ২০ আগস্ট তারিখ ঠিক করে রেখেছে, আর বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে লড়ছেন কর্নেল অলি আহমদ।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—দলের সবচেয়ে সক্রিয় ও পরিচিত মুখকে কেন সাংগঠনিক রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক শীর্ষ পদে বসানো হচ্ছে? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এই একটি সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে আছে অন্তত তিনটি আলাদা রাজনৈতিক হিসাব।
মহাসচিবের চেয়ার খালি হওয়ার অর্থ
মির্জা ফখরুল বহু বছর ধরে বিএনপির প্রকাশ্য মুখ। খালেদা জিয়া যখন কারাবন্দি ছিলেন আর তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন দলের হাল ধরে রেখেছিলেন তিনিই। আন্দোলন, নির্বাচন, কূটনীতি—সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।
রাষ্ট্রপতি হলে এই ভূমিকা থেকে সরে আসতে হবে তাঁকে। এতে মহাসচিবের পদটি খালি হবে, যা বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। স্বাভাবিকভাবেই সেই জায়গায় নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, আর এখানেই রুহুল কবির রিজভীর মতো দীর্ঘদিনের সংগঠকের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ ফখরুলকে বঙ্গভবনে পাঠানো মানেই দলের ভেতরে নেতৃত্বের একটা রদবদল শুরু হয়ে যাওয়া।
তারেক রহমানের জন্য ঝুঁকিহীন সমীকরণ
সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক; সরকার চালানোর বাস্তব ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তাই এই পদে দলের একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাকে বসিয়ে দিলে ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
এতে একধরনের ভারসাম্যও দাঁড়িয়ে যায়। সরকার আর দলের বাস্তব সিদ্ধান্ত থাকবে তারেক রহমানের হাতে, আর রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক শীর্ষ পদে থাকবেন ফখরুল। দুজনের ভূমিকা আলাদা হওয়ায় নেতৃত্বে সংঘাতের সুযোগও কমে আসে।
গ্রহণযোগ্যতাই ফখরুলের বড় শক্তি
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একটা বড় দিক হলো, কঠোর আন্দোলনের সময়েও তিনি বরাবর সংলাপ আর সমঝোতার ভাষায় কথা বলে এসেছেন। প্রতিপক্ষ দলগুলোর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি সময়ে সময়ে বলেছেন।
২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায়, আর ২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থিতিশীল রাখার প্রশ্নে—সংঘাতপ্রবণ নয়, বরং অভিজ্ঞ ও সংলাপমুখী কাউকে রাষ্ট্রপতি করাটা বিএনপির জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পথ।
আসল পরীক্ষা শুরু হবে বঙ্গভবনে যাওয়ার পর
তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফখরুল দীর্ঘদিনের দলীয় মহাসচিব, তাই তাঁকে পুরোপুরি দলনিরপেক্ষ ভাবা কঠিন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রকৃত পরীক্ষা হবে সেখানেই—দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে তিনি কতটা রাষ্ট্রের প্রতীকী ঐক্যের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেন।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে আছে দলের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ আর একজন অভিজ্ঞ, সংলাপমুখী নেতাকে দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা। নাম ঘোষণা করাটা সহজ কাজ ছিল বিএনপির জন্য। কঠিন কাজটা শুরু হবে এখন থেকে—রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করার লড়াইয়ে।
বিষয় : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
2.png)
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এই মনোনয়ন ঠিক করেছেন, আর জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফখরুলের বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়াটা এখন কার্যত সময়ের অপেক্ষা মাত্র। নির্বাচন কমিশন এ জন্য ২০ আগস্ট তারিখ ঠিক করে রেখেছে, আর বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে লড়ছেন কর্নেল অলি আহমদ।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—দলের সবচেয়ে সক্রিয় ও পরিচিত মুখকে কেন সাংগঠনিক রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক শীর্ষ পদে বসানো হচ্ছে? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এই একটি সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে আছে অন্তত তিনটি আলাদা রাজনৈতিক হিসাব।
মহাসচিবের চেয়ার খালি হওয়ার অর্থ
মির্জা ফখরুল বহু বছর ধরে বিএনপির প্রকাশ্য মুখ। খালেদা জিয়া যখন কারাবন্দি ছিলেন আর তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন দলের হাল ধরে রেখেছিলেন তিনিই। আন্দোলন, নির্বাচন, কূটনীতি—সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।
রাষ্ট্রপতি হলে এই ভূমিকা থেকে সরে আসতে হবে তাঁকে। এতে মহাসচিবের পদটি খালি হবে, যা বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। স্বাভাবিকভাবেই সেই জায়গায় নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, আর এখানেই রুহুল কবির রিজভীর মতো দীর্ঘদিনের সংগঠকের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ ফখরুলকে বঙ্গভবনে পাঠানো মানেই দলের ভেতরে নেতৃত্বের একটা রদবদল শুরু হয়ে যাওয়া।
তারেক রহমানের জন্য ঝুঁকিহীন সমীকরণ
সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক; সরকার চালানোর বাস্তব ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তাই এই পদে দলের একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাকে বসিয়ে দিলে ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
এতে একধরনের ভারসাম্যও দাঁড়িয়ে যায়। সরকার আর দলের বাস্তব সিদ্ধান্ত থাকবে তারেক রহমানের হাতে, আর রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক শীর্ষ পদে থাকবেন ফখরুল। দুজনের ভূমিকা আলাদা হওয়ায় নেতৃত্বে সংঘাতের সুযোগও কমে আসে।
গ্রহণযোগ্যতাই ফখরুলের বড় শক্তি
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একটা বড় দিক হলো, কঠোর আন্দোলনের সময়েও তিনি বরাবর সংলাপ আর সমঝোতার ভাষায় কথা বলে এসেছেন। প্রতিপক্ষ দলগুলোর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি সময়ে সময়ে বলেছেন।
২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায়, আর ২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থিতিশীল রাখার প্রশ্নে—সংঘাতপ্রবণ নয়, বরং অভিজ্ঞ ও সংলাপমুখী কাউকে রাষ্ট্রপতি করাটা বিএনপির জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পথ।
আসল পরীক্ষা শুরু হবে বঙ্গভবনে যাওয়ার পর
তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফখরুল দীর্ঘদিনের দলীয় মহাসচিব, তাই তাঁকে পুরোপুরি দলনিরপেক্ষ ভাবা কঠিন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রকৃত পরীক্ষা হবে সেখানেই—দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে তিনি কতটা রাষ্ট্রের প্রতীকী ঐক্যের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেন।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে আছে দলের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ আর একজন অভিজ্ঞ, সংলাপমুখী নেতাকে দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা। নাম ঘোষণা করাটা সহজ কাজ ছিল বিএনপির জন্য। কঠিন কাজটা শুরু হবে এখন থেকে—রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করার লড়াইয়ে।
2.png)