ঢাকা
রাজধানীর যানজট কমাতে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর দ্রুত কাজ শুরুর কথা থাকলেও গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া ছাড়া বাকি তিন টার্মিনাল আপাতত ঢাকাতেই থাকছে। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে বাস ডিপো আলাদা করে শহরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ফলে ঢাকার যানজট কমাতে নেওয়া অন্যতম বড় উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সময় লাগছে। পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, চার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে নিতে আরও দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগতে পারে।
গত ১৫ জুন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় রাজধানীর চারটি প্রধান আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মহাখালী টার্মিনাল প্রথমে পূর্বাঞ্চলে অস্থায়ীভাবে নেওয়া হবে। পরে এটি টঙ্গীর কাছে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের কথা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই পরিকল্পনার বড় অংশ এগোয়নি। গত ১৮ জুন সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপে’ শেখ রবিউল আলম জানান, দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে মহাখালী টার্মিনাল থেকে কিছু বাস ইতিমধ্যে পূর্বাচলে পাঠানো হয়েছে। তবে সেখানে বাস নিতে চালকদের অনীহা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, পূর্বাচলে পর্যাপ্ত খাবারের দোকান নেই। গাড়ি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় মেকানিকও সহজে পাওয়া যায় না। বাস পরিষ্কার করার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও নেই।
এ কারণে মহাখালী টার্মিনাল কার্যত বাস ডিপোর মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলো সেখানে বিশ্রাম নেয়। একই জায়গায় বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও রং করার কাজও হয়। এতে টার্মিনাল এলাকায় বাসের চাপ বাড়ছে। যাত্রী ওঠানামার জায়গা না পেয়ে অনেক সময় ব্যস্ত সড়কেই যাত্রী তোলা-নামানো হচ্ছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, টার্মিনালগুলো শেষ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে নেওয়া হবে। এজন্য জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে। আপাতত বাস রাখার জন্য ডিপো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, কাঁচপুরে চট্টগ্রামগামী কোনো যাত্রীকে নামিয়ে দিলে তার ঢাকায় আসার ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও ভাবতে হবে। একইভাবে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যাত্রীকে পূর্বাচলে নামিয়ে দিলে তাকে শহরে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়তে হবে। তাই টার্মিনাল সরানোর আগে সেখানে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পক্ষে পরিবহন মালিকেরা।
রাজধানীর যানজটের পেছনে টার্মিনালগুলোর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত বাসস্টপেজও বড় ভূমিকা রাখছে। নটর ডেম কলেজের বিপরীতের সড়ক, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে গ্রিন লাইন বাসের স্টপেজ, শ্যামলী, কল্যাণপুর, আসাদগেট এবং ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোলাইরপাড় চৌরাস্তার মতো বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট টার্মিনাল না থাকলেও বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়।
নগর পরিবহনেও নির্দিষ্ট বাসস্টপেজের ব্যবহার খুবই সীমিত। মালিবাগ থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িল সড়কে অনেক বাস যাত্রী যেখানে দাঁড়ান, সেখানেই থামে। ফলে ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ বাস থামানো এবং যাত্রী ওঠানামার কারণে যান চলাচলে বাধা তৈরি হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, টার্মিনালের মূল কাজ হলো বাস এসে যাত্রী নেওয়া এবং গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া। কিন্তু ঢাকার টার্মিনালগুলো এখন অনেকটা ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরের বাইরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরও যাতে একই পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
গণপরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের আওতায় সারা দেশে ২৫৩টি ইউনিয়ন রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন শাজাহান খান। তখন সংগঠনটির বিরুদ্ধে এসব ইউনিয়ন থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল।
ক্ষমতার পালাবদলের পর সংগঠনটির দায়িত্বে আসেন শিমুল বিশ্বাস। এরপর শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি বন্ধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। সংগঠন পরিচালনার জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে সামান্য অর্থ নেওয়া হয় বলেও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতিও পৃথকভাবে কার্যক্রম চালায়। এসব সংগঠনের অধীনে বিভিন্ন জেলায় একাধিক সংগঠন রয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম দাবি করেন, বর্তমান সরকারের সময়ে মালিকদের কাছ থেকে সংগঠনের নামে চাঁদা নেওয়া হয় না। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হয় এবং কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অফিস ও কর্মী রয়েছে। পরিচালন ব্যয় মেটাতে সংশ্লিষ্ট মালিকেরাই অর্থ দেন।
রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে আন্তঃজেলা বাসের টার্মিনাল শহরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। তবে নতুন টার্মিনাল চালুর আগে যাত্রীদের শহরে যাতায়াত, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা না গেলে স্থানান্তরের পরও সমস্যার নতুন রূপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
2.png)
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর যানজট কমাতে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর দ্রুত কাজ শুরুর কথা থাকলেও গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া ছাড়া বাকি তিন টার্মিনাল আপাতত ঢাকাতেই থাকছে। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে বাস ডিপো আলাদা করে শহরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ফলে ঢাকার যানজট কমাতে নেওয়া অন্যতম বড় উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সময় লাগছে। পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, চার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে নিতে আরও দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগতে পারে।
গত ১৫ জুন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় রাজধানীর চারটি প্রধান আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মহাখালী টার্মিনাল প্রথমে পূর্বাঞ্চলে অস্থায়ীভাবে নেওয়া হবে। পরে এটি টঙ্গীর কাছে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের কথা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই পরিকল্পনার বড় অংশ এগোয়নি। গত ১৮ জুন সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপে’ শেখ রবিউল আলম জানান, দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে মহাখালী টার্মিনাল থেকে কিছু বাস ইতিমধ্যে পূর্বাচলে পাঠানো হয়েছে। তবে সেখানে বাস নিতে চালকদের অনীহা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, পূর্বাচলে পর্যাপ্ত খাবারের দোকান নেই। গাড়ি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় মেকানিকও সহজে পাওয়া যায় না। বাস পরিষ্কার করার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও নেই।
এ কারণে মহাখালী টার্মিনাল কার্যত বাস ডিপোর মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলো সেখানে বিশ্রাম নেয়। একই জায়গায় বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও রং করার কাজও হয়। এতে টার্মিনাল এলাকায় বাসের চাপ বাড়ছে। যাত্রী ওঠানামার জায়গা না পেয়ে অনেক সময় ব্যস্ত সড়কেই যাত্রী তোলা-নামানো হচ্ছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, টার্মিনালগুলো শেষ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে নেওয়া হবে। এজন্য জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে। আপাতত বাস রাখার জন্য ডিপো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, কাঁচপুরে চট্টগ্রামগামী কোনো যাত্রীকে নামিয়ে দিলে তার ঢাকায় আসার ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও ভাবতে হবে। একইভাবে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যাত্রীকে পূর্বাচলে নামিয়ে দিলে তাকে শহরে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়তে হবে। তাই টার্মিনাল সরানোর আগে সেখানে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পক্ষে পরিবহন মালিকেরা।
রাজধানীর যানজটের পেছনে টার্মিনালগুলোর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত বাসস্টপেজও বড় ভূমিকা রাখছে। নটর ডেম কলেজের বিপরীতের সড়ক, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে গ্রিন লাইন বাসের স্টপেজ, শ্যামলী, কল্যাণপুর, আসাদগেট এবং ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোলাইরপাড় চৌরাস্তার মতো বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট টার্মিনাল না থাকলেও বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়।
নগর পরিবহনেও নির্দিষ্ট বাসস্টপেজের ব্যবহার খুবই সীমিত। মালিবাগ থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িল সড়কে অনেক বাস যাত্রী যেখানে দাঁড়ান, সেখানেই থামে। ফলে ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ বাস থামানো এবং যাত্রী ওঠানামার কারণে যান চলাচলে বাধা তৈরি হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, টার্মিনালের মূল কাজ হলো বাস এসে যাত্রী নেওয়া এবং গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া। কিন্তু ঢাকার টার্মিনালগুলো এখন অনেকটা ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরের বাইরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরও যাতে একই পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
গণপরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের আওতায় সারা দেশে ২৫৩টি ইউনিয়ন রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন শাজাহান খান। তখন সংগঠনটির বিরুদ্ধে এসব ইউনিয়ন থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল।
ক্ষমতার পালাবদলের পর সংগঠনটির দায়িত্বে আসেন শিমুল বিশ্বাস। এরপর শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি বন্ধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। সংগঠন পরিচালনার জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে সামান্য অর্থ নেওয়া হয় বলেও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতিও পৃথকভাবে কার্যক্রম চালায়। এসব সংগঠনের অধীনে বিভিন্ন জেলায় একাধিক সংগঠন রয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম দাবি করেন, বর্তমান সরকারের সময়ে মালিকদের কাছ থেকে সংগঠনের নামে চাঁদা নেওয়া হয় না। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হয় এবং কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অফিস ও কর্মী রয়েছে। পরিচালন ব্যয় মেটাতে সংশ্লিষ্ট মালিকেরাই অর্থ দেন।
রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে আন্তঃজেলা বাসের টার্মিনাল শহরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। তবে নতুন টার্মিনাল চালুর আগে যাত্রীদের শহরে যাতায়াত, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা না গেলে স্থানান্তরের পরও সমস্যার নতুন রূপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
2.png)