আন্তর্জাতিক
চাঁদের ছায়ায় কয়েক ঘণ্টার জন্য বদলে গেল ইউরোপের আকাশের চেহারা। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখা গেল বিরল সূর্যগ্রহণ। কোথাও সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ ঢেকে যায়, আবার স্পেন, আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের কিছু এলাকায় কয়েক মিনিটের জন্য সূর্য পুরোপুরি আড়ালে চলে যায়।
যুক্তরাজ্য থেকে অবশ্য পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায়নি। দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় এটি ছিল আংশিক গ্রহণ। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর গ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন অনেক এলাকায় চাঁদ সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ ঢেকে ফেলে। কর্নওয়ালে সূর্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত আড়াল হয়।
উত্তর স্কটল্যান্ডে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে গ্রহণ শুরু হয়। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের কিছু আগে। মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বেশির ভাগ এলাকায় আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সূর্যের সামনে চাঁদের ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
তবে উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের অনেক এলাকায় মেঘের কারণে দৃশ্যটি স্পষ্ট ছিল না। তারপরও গ্রহণ দেখতে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থানে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
পূর্ণগ্রহণের দৃশ্য সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল স্পেনের কিছু এলাকায়। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে, অর্থাৎ ব্রিটিশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়, সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় চলে আসে। তখন কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যের আলো প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লা কোরুনিয়ায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে চিলি থেকে যান বিজ্ঞানী ইয়াসমিন ক্যাট্রিচে। পূর্ণগ্রহণ শুরু হলে সেখানে উপস্থিত মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল তীব্র। তাঁর ভাষায়, সেই অনুভূতি কথায় প্রকাশ করা কঠিন। মহাবিশ্বের এই দৃশ্য তাঁকে অভিভূত করেছে।
পূর্ণগ্রহণের সময় চাঁদ পুরো সূর্যকে ঢেকে ফেলায় সূর্যের বাইরের উত্তপ্ত গ্যাসের স্তর করোনা দৃশ্যমান হয়। সূর্যের চারপাশে তখন ম্লান আলোর একটি বলয় দেখা যায়। কোথাও কোথাও সূর্যের পেছন থেকে গোলাপি আভাযুক্ত গ্যাসের ছোট ছোট লুপও দেখা যেতে পারে। এগুলো সূর্যের প্রমিনেন্স, যা সূর্যের অস্থির চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গ্রহণের দৃশ্য দেখতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষ জড়ো হন। অনেকেই বিশেষ সোলার চশমা ব্যবহার করেন। গ্রহণের আগে এসব চশমার চাহিদা এত বেড়ে যায় যে বিভিন্ন দোকানে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়। কেউ কেউ নিরাপদভাবে আংশিক গ্রহণ দেখার জন্য ছাঁকনি, খাবারের বাক্স কিংবা কাগজ ব্যবহার করেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়া খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক। সূর্যের তীব্র আলো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে। ফলে চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে এবং পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে। এবারের গ্রহণে যুক্তরাজ্য থেকে পূর্ণগ্রহণ দেখা যায়নি। কারণ দেশটির ওপর দিয়ে চাঁদের পূর্ণ ছায়া যায়নি।
১৯৯৯ সালের পর যুক্তরাজ্য থেকে দেখা এটিই সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ। ওই সময়ও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সূর্যের বড় একটি অংশ ঢাকা পড়েছিল। এবারের গ্রহণে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আড়াল হয়েছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পৃথিবীতে নিয়মিত ঘটলেও নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকে তা দেখা অত্যন্ত বিরল। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও গড়ে প্রায় ১৮ মাস পরপর পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে। কিন্তু একই নির্দিষ্ট এলাকায় এমন দৃশ্য ফিরে আসতে কয়েক শতাব্দী লেগে যেতে পারে।
এর পেছনে রয়েছে সূর্য ও চাঁদের আকার এবং পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্বের এক বিস্ময়কর সমাপতন। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ দূরে হলেও এর ব্যাসও চাঁদের প্রায় ৪০০ গুণ। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে আকাশে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। এই কারণেই চাঁদ কখনো কখনো সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে পারে।
গ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে থেকে সরে যায়। আবার আলো ফিরতে শুরু করে। পূর্ণগ্রহণের স্থায়িত্ব সাধারণত খুব কম। এবারের পূর্ণ পর্যায়ও দুই মিনিটের কম স্থায়ী হয়েছে। কিন্তু যারা ঘটনাটি সরাসরি দেখেছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই এটি দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
আগামী কয়েক বছর সূর্যগ্রহণপ্রেমীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ থাকবে। তবে এর কোনোটিই যুক্তরাজ্য থেকে পূর্ণ অবস্থায় দেখা যাবে না।
২০২৭ সালে যুক্তরাজ্য থেকে দেখা সর্বোচ্চ গ্রহণে সূর্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ঢাকা পড়তে পারে। আজকের গ্রহণের চেয়ে বেশি অংশ ঢাকা পড়া দৃশ্য দেখতে দেশটির মানুষকে আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে। ২০৮১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে সূর্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ ঢাকা পড়া গ্রহণ দেখা যেতে পারে। আর দেশটি থেকে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে।
বিষয় : বিরল সূর্য গ্রহণ
2.png)
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
চাঁদের ছায়ায় কয়েক ঘণ্টার জন্য বদলে গেল ইউরোপের আকাশের চেহারা। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখা গেল বিরল সূর্যগ্রহণ। কোথাও সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ ঢেকে যায়, আবার স্পেন, আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের কিছু এলাকায় কয়েক মিনিটের জন্য সূর্য পুরোপুরি আড়ালে চলে যায়।
যুক্তরাজ্য থেকে অবশ্য পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায়নি। দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় এটি ছিল আংশিক গ্রহণ। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর গ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন অনেক এলাকায় চাঁদ সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ ঢেকে ফেলে। কর্নওয়ালে সূর্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত আড়াল হয়।
উত্তর স্কটল্যান্ডে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে গ্রহণ শুরু হয়। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের কিছু আগে। মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বেশির ভাগ এলাকায় আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সূর্যের সামনে চাঁদের ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
তবে উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের অনেক এলাকায় মেঘের কারণে দৃশ্যটি স্পষ্ট ছিল না। তারপরও গ্রহণ দেখতে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থানে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
পূর্ণগ্রহণের দৃশ্য সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল স্পেনের কিছু এলাকায়। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে, অর্থাৎ ব্রিটিশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়, সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় চলে আসে। তখন কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যের আলো প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লা কোরুনিয়ায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে চিলি থেকে যান বিজ্ঞানী ইয়াসমিন ক্যাট্রিচে। পূর্ণগ্রহণ শুরু হলে সেখানে উপস্থিত মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল তীব্র। তাঁর ভাষায়, সেই অনুভূতি কথায় প্রকাশ করা কঠিন। মহাবিশ্বের এই দৃশ্য তাঁকে অভিভূত করেছে।
পূর্ণগ্রহণের সময় চাঁদ পুরো সূর্যকে ঢেকে ফেলায় সূর্যের বাইরের উত্তপ্ত গ্যাসের স্তর করোনা দৃশ্যমান হয়। সূর্যের চারপাশে তখন ম্লান আলোর একটি বলয় দেখা যায়। কোথাও কোথাও সূর্যের পেছন থেকে গোলাপি আভাযুক্ত গ্যাসের ছোট ছোট লুপও দেখা যেতে পারে। এগুলো সূর্যের প্রমিনেন্স, যা সূর্যের অস্থির চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গ্রহণের দৃশ্য দেখতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষ জড়ো হন। অনেকেই বিশেষ সোলার চশমা ব্যবহার করেন। গ্রহণের আগে এসব চশমার চাহিদা এত বেড়ে যায় যে বিভিন্ন দোকানে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়। কেউ কেউ নিরাপদভাবে আংশিক গ্রহণ দেখার জন্য ছাঁকনি, খাবারের বাক্স কিংবা কাগজ ব্যবহার করেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়া খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক। সূর্যের তীব্র আলো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে। ফলে চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে এবং পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে। এবারের গ্রহণে যুক্তরাজ্য থেকে পূর্ণগ্রহণ দেখা যায়নি। কারণ দেশটির ওপর দিয়ে চাঁদের পূর্ণ ছায়া যায়নি।
১৯৯৯ সালের পর যুক্তরাজ্য থেকে দেখা এটিই সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ। ওই সময়ও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সূর্যের বড় একটি অংশ ঢাকা পড়েছিল। এবারের গ্রহণে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আড়াল হয়েছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পৃথিবীতে নিয়মিত ঘটলেও নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকে তা দেখা অত্যন্ত বিরল। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও গড়ে প্রায় ১৮ মাস পরপর পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে। কিন্তু একই নির্দিষ্ট এলাকায় এমন দৃশ্য ফিরে আসতে কয়েক শতাব্দী লেগে যেতে পারে।
এর পেছনে রয়েছে সূর্য ও চাঁদের আকার এবং পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্বের এক বিস্ময়কর সমাপতন। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ দূরে হলেও এর ব্যাসও চাঁদের প্রায় ৪০০ গুণ। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে আকাশে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। এই কারণেই চাঁদ কখনো কখনো সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে পারে।
গ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে থেকে সরে যায়। আবার আলো ফিরতে শুরু করে। পূর্ণগ্রহণের স্থায়িত্ব সাধারণত খুব কম। এবারের পূর্ণ পর্যায়ও দুই মিনিটের কম স্থায়ী হয়েছে। কিন্তু যারা ঘটনাটি সরাসরি দেখেছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই এটি দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
আগামী কয়েক বছর সূর্যগ্রহণপ্রেমীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ থাকবে। তবে এর কোনোটিই যুক্তরাজ্য থেকে পূর্ণ অবস্থায় দেখা যাবে না।
২০২৭ সালে যুক্তরাজ্য থেকে দেখা সর্বোচ্চ গ্রহণে সূর্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ঢাকা পড়তে পারে। আজকের গ্রহণের চেয়ে বেশি অংশ ঢাকা পড়া দৃশ্য দেখতে দেশটির মানুষকে আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে। ২০৮১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে সূর্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ ঢাকা পড়া গ্রহণ দেখা যেতে পারে। আর দেশটি থেকে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে।
2.png)