আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

দেশে আল-কায়েদার ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা চলছে, জাতিসংঘ সতর্ক করলো বাংলাদেশকে

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের নতুন প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা একিউআইএসের অবস্থান তৈরির চেষ্টার কথা উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি তৎপরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই সতর্কতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।

দেশে আল-কায়েদার ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা চলছে, জাতিসংঘ সতর্ক করলো বাংলাদেশকে
ছবি -সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বাড়ছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশকে ঘিরে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের (একিউআইএস) তৎপরতার নতুন তথ্য সামনে এনেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদের বিশ্লেষণাত্মক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের ৩৮তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে একিউআইএস।

প্রতিবেদনটি ১০ আগস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়েরপরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্য ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ দল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের সামগ্রিক মাত্রায় বড় পরিবর্তন না এলেও আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন তাদের পুরোনো ঘাঁটির পাশাপাশি নতুন এলাকায় যোগাযোগ, অর্থায়ন ও জনবল সংগ্রহের পথ খুঁজছে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের প্রসঙ্গ এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একিউআইএস বাংলাদেশে নিজেদের কার্যক্রমের জন্য একটি অবস্থান বা ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংগঠনটি বাংলাদেশে প্রকাশ্য বা বড় ধরনের কোনো সশস্ত্র উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে। বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নে সম্ভাব্য সাংগঠনিক তৎপরতা ও অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টার বিষয়টি উঠে এসেছে।

আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থাও প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংগঠনটির মূল নেতৃত্ব বর্তমানে আগের তুলনায় দুর্বল ও কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। নেতৃত্বের ওপর চাপ থাকলেও এর আঞ্চলিক শাখাগুলো নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

একই সময়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএলের নেতৃত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসে আইএসআইএলের উপনেতা আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-মাইনিকির মৃত্যু সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা। তার মৃত্যু আইএসআইএলের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদন। আফগানিস্তানকে ঘিরে আল-কায়েদা ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি, সীমান্ত পেরিয়ে সদস্যদের চলাচল, অর্থায়নের নতুন পথ এবং অনলাইন প্রচারণা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অতীতের জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলোতেও একিউআইএসের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৪ সালে আল-কায়েদার তৎকালীন নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি ভারতীয় উপমহাদেশে একিউআইএস গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর বাংলাদেশে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের দায় সংগঠনটির নামে প্রচার করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে ব্লগার ও প্রকাশক হত্যার কয়েকটি ঘটনায় একিউআইএসের দায় স্বীকারের দাবিও সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পুরোনো মূল্যায়নেও বাংলাদেশে একিউআইএসের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে গত এক দশকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা অনেকটাই কমেছে। এখন ঝুঁকির ধরনও বদলেছে। বড় সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট সেল, অনলাইন যোগাযোগ, ব্যক্তিগতভাবে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া এবং দেশের বাইরে থাকা জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলো নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে।

এই জায়গাতেই জাতিসংঘের নতুন সতর্কতার গুরুত্ব। বাংলাদেশে একিউআইএসের কথিত অবস্থান তৈরির চেষ্টা সফল হয়েছে কি না, সংগঠনটির সঙ্গে স্থানীয় কারও যোগাযোগ রয়েছে কি না কিংবা তারা কী ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে—এসব বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদনের তথ্যকে সরাসরি দেশে নতুন জঙ্গি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

জাতিসংঘের বিশ্লেষণাত্মক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল মূলত নিরাপত্তা পরিষদকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য ও বিশ্লেষণ দেয়। আল-কায়েদা, আইএসআইএল এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর তৎপরতা, অর্থের উৎস, বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধাদের চলাচল এবং অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তার প্রবাহ তারা পর্যবেক্ষণ করে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের অবস্থাও মূল্যায়ন করে।

এই দলের বর্তমান কাঠামো ২০০৪ সালে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫২৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। পরে ২০১৫ সালের ২২৫৩ নম্বর প্রস্তাবসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এর দায়িত্ব ও পরিধি বাড়ানো হয়। বর্তমানে দলটিতে সর্বোচ্চ ১০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হবে সতর্কতাটিকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। একদিকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা দরকার। অন্যদিকে অনলাইন উগ্রবাদ, তরুণদের নিয়োগের চেষ্টা এবং সীমান্তপথে অর্থ ও সদস্য চলাচলের ওপর নজর বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে আর্থিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। কারণ আধুনিক জঙ্গি সংগঠনগুলো সব সময় বড় অঙ্কের অর্থের ওপর নির্ভর করে না। ছোট অঙ্কের লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর, অনলাইন যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও তারা সংগঠন টিকিয়ে রাখতে পারে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দলের কাজের একটি বড় অংশই এসব অর্থায়ন ও যোগাযোগের পথ চিহ্নিত করা।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমারকে ঘিরে জঙ্গি নেটওয়ার্কের চলাচল থাকায় শুধু দেশের ভেতরের নজরদারি দিয়ে পুরো ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। তথ্য বিনিময়, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাম আসার তাৎপর্য এখানেই। দেশে বড় কোনো জঙ্গি ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনটি দেয়নি। বরং একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে বলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে আগাম সতর্কতার ভিত্তিতে মোকাবিলা করাই এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা।

  

 জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি পড়তে ক্লিক করুন

বিষয় : বাংলাদেশ জাতিসংঘ আল-কায়েদা

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬


দেশে আল-কায়েদার ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা চলছে, জাতিসংঘ সতর্ক করলো বাংলাদেশকে

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বাড়ছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশকে ঘিরে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের (একিউআইএস) তৎপরতার নতুন তথ্য সামনে এনেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদের বিশ্লেষণাত্মক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের ৩৮তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে একিউআইএস।

প্রতিবেদনটি ১০ আগস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়েরপরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্য ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ দল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের সামগ্রিক মাত্রায় বড় পরিবর্তন না এলেও আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন তাদের পুরোনো ঘাঁটির পাশাপাশি নতুন এলাকায় যোগাযোগ, অর্থায়ন ও জনবল সংগ্রহের পথ খুঁজছে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের প্রসঙ্গ এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একিউআইএস বাংলাদেশে নিজেদের কার্যক্রমের জন্য একটি অবস্থান বা ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংগঠনটি বাংলাদেশে প্রকাশ্য বা বড় ধরনের কোনো সশস্ত্র উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে। বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নে সম্ভাব্য সাংগঠনিক তৎপরতা ও অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টার বিষয়টি উঠে এসেছে।

আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থাও প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংগঠনটির মূল নেতৃত্ব বর্তমানে আগের তুলনায় দুর্বল ও কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। নেতৃত্বের ওপর চাপ থাকলেও এর আঞ্চলিক শাখাগুলো নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

একই সময়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএলের নেতৃত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসে আইএসআইএলের উপনেতা আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-মাইনিকির মৃত্যু সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা। তার মৃত্যু আইএসআইএলের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদন। আফগানিস্তানকে ঘিরে আল-কায়েদা ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি, সীমান্ত পেরিয়ে সদস্যদের চলাচল, অর্থায়নের নতুন পথ এবং অনলাইন প্রচারণা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অতীতের জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলোতেও একিউআইএসের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৪ সালে আল-কায়েদার তৎকালীন নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি ভারতীয় উপমহাদেশে একিউআইএস গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর বাংলাদেশে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের দায় সংগঠনটির নামে প্রচার করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে ব্লগার ও প্রকাশক হত্যার কয়েকটি ঘটনায় একিউআইএসের দায় স্বীকারের দাবিও সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পুরোনো মূল্যায়নেও বাংলাদেশে একিউআইএসের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে গত এক দশকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা অনেকটাই কমেছে। এখন ঝুঁকির ধরনও বদলেছে। বড় সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট সেল, অনলাইন যোগাযোগ, ব্যক্তিগতভাবে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া এবং দেশের বাইরে থাকা জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলো নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে।

এই জায়গাতেই জাতিসংঘের নতুন সতর্কতার গুরুত্ব। বাংলাদেশে একিউআইএসের কথিত অবস্থান তৈরির চেষ্টা সফল হয়েছে কি না, সংগঠনটির সঙ্গে স্থানীয় কারও যোগাযোগ রয়েছে কি না কিংবা তারা কী ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে—এসব বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদনের তথ্যকে সরাসরি দেশে নতুন জঙ্গি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

জাতিসংঘের বিশ্লেষণাত্মক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল মূলত নিরাপত্তা পরিষদকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য ও বিশ্লেষণ দেয়। আল-কায়েদা, আইএসআইএল এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর তৎপরতা, অর্থের উৎস, বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধাদের চলাচল এবং অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তার প্রবাহ তারা পর্যবেক্ষণ করে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের অবস্থাও মূল্যায়ন করে।

এই দলের বর্তমান কাঠামো ২০০৪ সালে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫২৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। পরে ২০১৫ সালের ২২৫৩ নম্বর প্রস্তাবসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এর দায়িত্ব ও পরিধি বাড়ানো হয়। বর্তমানে দলটিতে সর্বোচ্চ ১০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হবে সতর্কতাটিকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। একদিকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা দরকার। অন্যদিকে অনলাইন উগ্রবাদ, তরুণদের নিয়োগের চেষ্টা এবং সীমান্তপথে অর্থ ও সদস্য চলাচলের ওপর নজর বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে আর্থিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। কারণ আধুনিক জঙ্গি সংগঠনগুলো সব সময় বড় অঙ্কের অর্থের ওপর নির্ভর করে না। ছোট অঙ্কের লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর, অনলাইন যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও তারা সংগঠন টিকিয়ে রাখতে পারে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দলের কাজের একটি বড় অংশই এসব অর্থায়ন ও যোগাযোগের পথ চিহ্নিত করা।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমারকে ঘিরে জঙ্গি নেটওয়ার্কের চলাচল থাকায় শুধু দেশের ভেতরের নজরদারি দিয়ে পুরো ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। তথ্য বিনিময়, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাম আসার তাৎপর্য এখানেই। দেশে বড় কোনো জঙ্গি ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনটি দেয়নি। বরং একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে বলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে আগাম সতর্কতার ভিত্তিতে মোকাবিলা করাই এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা।

  

 জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি পড়তে ক্লিক করুন



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত