আন্তর্জাতিক
কাবুলের রাজপথে শনিবার ছিল বিজয় উদযাপনের আয়োজন। সাঁজোয়া যান নিয়ে কুচকাওয়াজ, পতাকা আর ব্যানারে নিজেদের শাসনের পাঁচ বছর পূর্তির বার্তা দিয়েছে তালেবান। সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতির অবসানকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছে গোষ্ঠীটি।
কিন্তু কাবুলের এই উদযাপনের আড়ালেই ভিন্ন এক আফগানিস্তান। পাঁচ বছর পরও দেশটির বড় অংশের মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নারী ও মেয়েদের শিক্ষা ও চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে খরা, ভূমিকম্প এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় এখন মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এমন আফগানের সংখ্যা ৩৫ লাখ বেড়েছে।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সেনা প্রত্যাহারের পর কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। ক্ষমতায় ফেরার সময় গোষ্ঠীটি আগের শাসনামলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নমনীয় প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে নারী অধিকার পরিস্থিতিই সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হয়ে উঠেছে। তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং নারীদের উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৪ লাখ আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। আফগানিস্তানই এখন বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাধা রয়েছে।
শিক্ষার বাইরে থাকার প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট দেশটির সাক্ষরতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। নারীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে আফগান অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতি ২০৬৬ সাল পর্যন্ত ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
শুধু শিক্ষাই নয়, নারীদের দৈনন্দিন চলাচলও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক নারী মাসে মাত্র এক বা দুইবার বাড়ির বাইরে বের হন। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও তাদের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
তালেবান অবশ্য এসব নীতিকে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক শাসনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাদের দাবি, ইসলামের কাঠামোর মধ্যেই নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন বলছে, বাস্তবে নারী ও মেয়েদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার সংকট তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তালেবানের অবস্থান খুব একটা বদলায়নি। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও অধিকাংশ দেশ তাদের সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। এখন পর্যন্ত রাশিয়াই তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ একেবারে থেমে নেই। আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিভিন্ন দেশ কাবুলের সঙ্গে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।
এই বাস্তবতায় তালেবানের জন্য আঞ্চলিক কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাকিস্তান, চীন, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে কাবুল। আফগানিস্তানের অবস্থান দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করে। এই ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তালেবান।
তবে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে নিরাপত্তা প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। একসময় তালেবানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত পাকিস্তানের সঙ্গে এই টানাপোড়েন কাবুলের আঞ্চলিক কূটনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
অন্যদিকে অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও তালেবান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এবং ইরান ও পাকিস্তান থেকে আফগান নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিদেশি সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ার সময়েই মানবিক প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে মানবিক চিত্র পাওয়া যায় দেশে ফিরে আসা আফগানদের জীবনে। ২৮ বছর বয়সী ফাতিমা তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ইরানে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। কিন্তু গত বছর ইরান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তাকে আফগানিস্তানে ফিরে আসতে হয়। দেশে ফিরে নিজের এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানিও পাঁচ বছর পূর্তির এক ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেছেন, দেশে এখনো কিছু সমস্যা ও জটিলতা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি তালেবানের ক্ষমতায় ফেরাকে মনোবল, সাহস ও সৃষ্টিকর্তার সহায়তার ফল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কাবুলের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ২৮ বছর বয়সী দোকান মালিক নাজিবুল্লাহ ঘোরজাংও তালেবানের বিজয়কে ভবিষ্যতের আশার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার প্রত্যাশা, আফগানিস্তান এবার উন্নয়নের পথে এগোবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরাজয়ের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
এই দুই বক্তব্যের মাঝেই গত পাঁচ বছরের আফগানিস্তানের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তালেবান সামরিকভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে এবং দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য শুধু নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ দিয়ে মাপা যায় না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানবিক নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও তাদের সক্ষমতার পরীক্ষা চলছে।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যাননের ভাষায়, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য শুধু সংঘাত বন্ধ হওয়া যথেষ্ট নয়। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার ওপর, যেখানে সব আফগানের অধিকার ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।
তালেবানের পঞ্চম বর্ষপূর্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ক্ষমতা ধরে রাখা নয়; বরং সেই ক্ষমতাকে কতটা কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দেওয়া সম্ভব। কাবুলের বিজয় কুচকাওয়াজে তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রণের ছবি দেখিয়েছে। কিন্তু দেশের মানবিক সংকট, নারীদের অধিকার, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এখনো তাদের শাসনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হয়ে আছে।
বিষয় : তালেবান আফগানিস্তান
2.png)
রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
কাবুলের রাজপথে শনিবার ছিল বিজয় উদযাপনের আয়োজন। সাঁজোয়া যান নিয়ে কুচকাওয়াজ, পতাকা আর ব্যানারে নিজেদের শাসনের পাঁচ বছর পূর্তির বার্তা দিয়েছে তালেবান। সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতির অবসানকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছে গোষ্ঠীটি।
কিন্তু কাবুলের এই উদযাপনের আড়ালেই ভিন্ন এক আফগানিস্তান। পাঁচ বছর পরও দেশটির বড় অংশের মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নারী ও মেয়েদের শিক্ষা ও চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে খরা, ভূমিকম্প এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় এখন মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এমন আফগানের সংখ্যা ৩৫ লাখ বেড়েছে।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সেনা প্রত্যাহারের পর কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। ক্ষমতায় ফেরার সময় গোষ্ঠীটি আগের শাসনামলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নমনীয় প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে নারী অধিকার পরিস্থিতিই সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হয়ে উঠেছে। তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং নারীদের উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৪ লাখ আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। আফগানিস্তানই এখন বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাধা রয়েছে।
শিক্ষার বাইরে থাকার প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট দেশটির সাক্ষরতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। নারীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে আফগান অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতি ২০৬৬ সাল পর্যন্ত ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
শুধু শিক্ষাই নয়, নারীদের দৈনন্দিন চলাচলও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক নারী মাসে মাত্র এক বা দুইবার বাড়ির বাইরে বের হন। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও তাদের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
তালেবান অবশ্য এসব নীতিকে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক শাসনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাদের দাবি, ইসলামের কাঠামোর মধ্যেই নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন বলছে, বাস্তবে নারী ও মেয়েদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার সংকট তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তালেবানের অবস্থান খুব একটা বদলায়নি। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও অধিকাংশ দেশ তাদের সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। এখন পর্যন্ত রাশিয়াই তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ একেবারে থেমে নেই। আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিভিন্ন দেশ কাবুলের সঙ্গে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।
এই বাস্তবতায় তালেবানের জন্য আঞ্চলিক কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাকিস্তান, চীন, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে কাবুল। আফগানিস্তানের অবস্থান দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করে। এই ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তালেবান।
তবে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে নিরাপত্তা প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। একসময় তালেবানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত পাকিস্তানের সঙ্গে এই টানাপোড়েন কাবুলের আঞ্চলিক কূটনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
অন্যদিকে অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও তালেবান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এবং ইরান ও পাকিস্তান থেকে আফগান নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিদেশি সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ার সময়েই মানবিক প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে মানবিক চিত্র পাওয়া যায় দেশে ফিরে আসা আফগানদের জীবনে। ২৮ বছর বয়সী ফাতিমা তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ইরানে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। কিন্তু গত বছর ইরান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তাকে আফগানিস্তানে ফিরে আসতে হয়। দেশে ফিরে নিজের এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানিও পাঁচ বছর পূর্তির এক ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেছেন, দেশে এখনো কিছু সমস্যা ও জটিলতা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি তালেবানের ক্ষমতায় ফেরাকে মনোবল, সাহস ও সৃষ্টিকর্তার সহায়তার ফল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কাবুলের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ২৮ বছর বয়সী দোকান মালিক নাজিবুল্লাহ ঘোরজাংও তালেবানের বিজয়কে ভবিষ্যতের আশার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার প্রত্যাশা, আফগানিস্তান এবার উন্নয়নের পথে এগোবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরাজয়ের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
এই দুই বক্তব্যের মাঝেই গত পাঁচ বছরের আফগানিস্তানের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তালেবান সামরিকভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে এবং দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য শুধু নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ দিয়ে মাপা যায় না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানবিক নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও তাদের সক্ষমতার পরীক্ষা চলছে।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যাননের ভাষায়, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য শুধু সংঘাত বন্ধ হওয়া যথেষ্ট নয়। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার ওপর, যেখানে সব আফগানের অধিকার ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।
তালেবানের পঞ্চম বর্ষপূর্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ক্ষমতা ধরে রাখা নয়; বরং সেই ক্ষমতাকে কতটা কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দেওয়া সম্ভব। কাবুলের বিজয় কুচকাওয়াজে তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রণের ছবি দেখিয়েছে। কিন্তু দেশের মানবিক সংকট, নারীদের অধিকার, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এখনো তাদের শাসনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হয়ে আছে।
2.png)