ম্যাচের শেষ বাঁশিটা যেন পর্তুগিজ সমর্থকদের হৃদয়ে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিল। মিকেল মেরিনোর করা সেই গোলটা শুধু স্পেনের জয় নিশ্চিত করেনি, ধূলিসাৎ করে দিল পর্তুগালের বিশ্বকাপ জয়ের সব স্বপ্ন। ক্যামেরা যখন সিআর সেভেনের দিকে তাক করল, তখন দেখা গেল এক বিষণ্ণ মানুষ, যিনি কান্না লুকানোর বৃথা চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেষমেশ চোখের পানি বাঁধ মানেনি। পর্তুগালের সর্বকালের সেরা তারকার বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হলো একরাশ হতাশা আর কান্নায়।
মাঠে তখন রোনালদো যেন এক নির্জন দ্বীপ। সতীর্থদের অনেকেরই নীরবতা দেখে মনে হচ্ছিল, বিদায়টা যেন তারা আগেই মেনে নিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে এমন নীরস ও বিষাদময় বিদায় রোনালদোর নামের সঙ্গে বড্ড বেমানান। কেন এমনটা হলো? উত্তর খুঁজছেন ফুটবলবোদ্ধারা। কেউ দায় দিচ্ছেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজকে, কেউ আঙুল তুলছেন সতীর্থদের দিকে, আবার অনেকের মতে, সময়ের স্রোতে রোনালদো নিজেই নিজের ছায়ায় পরিণত হয়েছেন।
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হারের পর রোনালদোকে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল সেখানেই বুঝি শেষ। কিন্তু বয়সের বাধা জয় করে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন এবারের বিশ্বকাপের জন্য। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্স ছিল ভিন্ন কথা বলছে। পুরো টুর্নামেন্টে রোনালদোকে দেখে মনে হয়েছে তিনি যেন তাল হারিয়ে ফেলেছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল বা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল পেলেও, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের হাল ধরার মতো সেই আগের ধার তাঁর খেলায় ছিল না। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে একটি বিব্রতকর রেকর্ডেরও অংশীদার হলেন তিনি—বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের আটটি ম্যাচ হারের ঘটনা এটাই প্রথম।
এই ব্যর্থতার জন্য কোচ রবার্তো মার্তিনেজের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জোরেশোরেই। দলের যখন গোল প্রয়োজন, তখন কার্যকর গনসালো রামোসকে বসিয়ে রেখে কেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রাখা হলো? গত বিশ্বকাপে ফার্নান্দো সান্তোস যেটুকু সাহস দেখিয়েছিলেন, মার্তিনেজ সেখানে পুরোপুরি ব্যর্থ। মনে হয়েছে, রোনালদোর প্রতি অন্ধ মায়ার কাছেই হেরেছে পর্তুগালের ভাগ্য। টাইম-ম্যানেজমেন্ট করে তাঁকে খেলানোর সুযোগ থাকলেও কোচ সেটি কাজে লাগাননি, যা দলের ভারসাম্যে বড় আঘাত করেছে।
সতীর্থদের সঙ্গে রোনালদোর বোঝাপড়াও ছিল চোখে পড়ার মতো দুর্বল। ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা ভিতিনিয়ার মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো রসায়ন দেখা যায়নি। মাঠের খেলায় মনে হয়েছে, রোনালদো যেন দলের সঙ্গে আলাদা কোনো লড়াই করছিলেন, আর বাকিরা তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন।
সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন তো সরাসরিই বলেছেন, ‘মাঠে রোনালদোকে দেখে একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো মনে হয়েছে। তিনি খেলা বা প্রতিপক্ষের ওপর কোনো প্রভাবই রাখতে পারেননি। তাঁর এই নিস্তেজ পারফরম্যান্স পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রাকেই শেষ করে দিয়েছে।’
যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। রোনালদোর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের করুণ সমাপ্তি ঘটল। তবে এই বিদায় পর্তুগাল ফুটবলের জন্য নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিল। ওয়েইন রুনির ভাষায়, ‘রোনালদোকে হারানোর মধ্য দিয়েই হয়তো পর্তুগালের নতুন যুগের সূচনা হলো। এখন অন্যদের সামনে সুযোগ নিজেদের মেলে ধরার।’
রোনালদোর সেই চিরচেনা হাসি আর গোলের উদযাপন হয়তো আর বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাবে না। তবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড়ের দীর্ঘ যাত্রার প্রেরণাগুলো নিয়ে পর্তুগাল চাইলে নতুন করে পথ চলতে পারে। বিদায় রোনালদো, স্বাগত এক নতুন পর্তুগাল।
2.png)
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
ম্যাচের শেষ বাঁশিটা যেন পর্তুগিজ সমর্থকদের হৃদয়ে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিল। মিকেল মেরিনোর করা সেই গোলটা শুধু স্পেনের জয় নিশ্চিত করেনি, ধূলিসাৎ করে দিল পর্তুগালের বিশ্বকাপ জয়ের সব স্বপ্ন। ক্যামেরা যখন সিআর সেভেনের দিকে তাক করল, তখন দেখা গেল এক বিষণ্ণ মানুষ, যিনি কান্না লুকানোর বৃথা চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেষমেশ চোখের পানি বাঁধ মানেনি। পর্তুগালের সর্বকালের সেরা তারকার বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হলো একরাশ হতাশা আর কান্নায়।
মাঠে তখন রোনালদো যেন এক নির্জন দ্বীপ। সতীর্থদের অনেকেরই নীরবতা দেখে মনে হচ্ছিল, বিদায়টা যেন তারা আগেই মেনে নিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে এমন নীরস ও বিষাদময় বিদায় রোনালদোর নামের সঙ্গে বড্ড বেমানান। কেন এমনটা হলো? উত্তর খুঁজছেন ফুটবলবোদ্ধারা। কেউ দায় দিচ্ছেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজকে, কেউ আঙুল তুলছেন সতীর্থদের দিকে, আবার অনেকের মতে, সময়ের স্রোতে রোনালদো নিজেই নিজের ছায়ায় পরিণত হয়েছেন।
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হারের পর রোনালদোকে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল সেখানেই বুঝি শেষ। কিন্তু বয়সের বাধা জয় করে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন এবারের বিশ্বকাপের জন্য। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্স ছিল ভিন্ন কথা বলছে। পুরো টুর্নামেন্টে রোনালদোকে দেখে মনে হয়েছে তিনি যেন তাল হারিয়ে ফেলেছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল বা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল পেলেও, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের হাল ধরার মতো সেই আগের ধার তাঁর খেলায় ছিল না। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে একটি বিব্রতকর রেকর্ডেরও অংশীদার হলেন তিনি—বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের আটটি ম্যাচ হারের ঘটনা এটাই প্রথম।
এই ব্যর্থতার জন্য কোচ রবার্তো মার্তিনেজের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জোরেশোরেই। দলের যখন গোল প্রয়োজন, তখন কার্যকর গনসালো রামোসকে বসিয়ে রেখে কেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রাখা হলো? গত বিশ্বকাপে ফার্নান্দো সান্তোস যেটুকু সাহস দেখিয়েছিলেন, মার্তিনেজ সেখানে পুরোপুরি ব্যর্থ। মনে হয়েছে, রোনালদোর প্রতি অন্ধ মায়ার কাছেই হেরেছে পর্তুগালের ভাগ্য। টাইম-ম্যানেজমেন্ট করে তাঁকে খেলানোর সুযোগ থাকলেও কোচ সেটি কাজে লাগাননি, যা দলের ভারসাম্যে বড় আঘাত করেছে।
সতীর্থদের সঙ্গে রোনালদোর বোঝাপড়াও ছিল চোখে পড়ার মতো দুর্বল। ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা ভিতিনিয়ার মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো রসায়ন দেখা যায়নি। মাঠের খেলায় মনে হয়েছে, রোনালদো যেন দলের সঙ্গে আলাদা কোনো লড়াই করছিলেন, আর বাকিরা তাঁকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন।
সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন তো সরাসরিই বলেছেন, ‘মাঠে রোনালদোকে দেখে একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো মনে হয়েছে। তিনি খেলা বা প্রতিপক্ষের ওপর কোনো প্রভাবই রাখতে পারেননি। তাঁর এই নিস্তেজ পারফরম্যান্স পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রাকেই শেষ করে দিয়েছে।’
যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। রোনালদোর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায়ের করুণ সমাপ্তি ঘটল। তবে এই বিদায় পর্তুগাল ফুটবলের জন্য নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিল। ওয়েইন রুনির ভাষায়, ‘রোনালদোকে হারানোর মধ্য দিয়েই হয়তো পর্তুগালের নতুন যুগের সূচনা হলো। এখন অন্যদের সামনে সুযোগ নিজেদের মেলে ধরার।’
রোনালদোর সেই চিরচেনা হাসি আর গোলের উদযাপন হয়তো আর বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাবে না। তবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড়ের দীর্ঘ যাত্রার প্রেরণাগুলো নিয়ে পর্তুগাল চাইলে নতুন করে পথ চলতে পারে। বিদায় রোনালদো, স্বাগত এক নতুন পর্তুগাল।
2.png)