বানিজ্য
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে গভীর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা চাকরিচ্যুতির শিকার হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারখানাগুলো আর্থিক সংকট বা ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার অজুহাত দেখালেও, শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ—অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করার চেষ্টার জের ধরেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে।
শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতের ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ জন শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কেবল ২৭টি কারখানাই এই সময়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১৬ জুন গাজীপুরের ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং ও ইউনিক ডিজাইনার্স কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যারা এখনো বকেয়া বেতন-ভাতা বুঝে পাননি।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের প্রভাব এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ সহায়তার কঠোর নীতি কারখানা বন্ধের মূল কারণ। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও ব্যাংকিং জটিলতায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অনেক উদ্যোক্তার পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে শ্রমিকনেতারা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, গত নভেম্বরে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের নিয়ম সহজ হওয়ার পর শ্রমিকরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। মালিকদের একাংশ এটি মেনে নিতে না পেরে কৌশলে ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ‘অসদাচরণ’ বা ‘কাগজপত্রে জালিয়াতি’র অজুহাতে ছাঁটাই করছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারও বিষয়টি কঠোরভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যেসব শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ—প্রায় ১ হাজার ৫৯৯ জন—আন্দোলন, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করা বা অসদাচরণের অভিযোগে চাকরি হারিয়েছেন। তবে সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক মন্দার দোহাই দিয়ে ঈদুল আজহার পরপরই ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতাদের মতে, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হতে পারে। সরকার বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠন করলেও, তা সঠিক নিয়মে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা নিশ্চিত করা এবং ছাঁটাইয়ের কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয় : পোশাক খাতে অস্থিরতা
2.png)
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে গভীর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা চাকরিচ্যুতির শিকার হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারখানাগুলো আর্থিক সংকট বা ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার অজুহাত দেখালেও, শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ—অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করার চেষ্টার জের ধরেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে।
শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতের ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ জন শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কেবল ২৭টি কারখানাই এই সময়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১৬ জুন গাজীপুরের ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং ও ইউনিক ডিজাইনার্স কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যারা এখনো বকেয়া বেতন-ভাতা বুঝে পাননি।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের প্রভাব এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ সহায়তার কঠোর নীতি কারখানা বন্ধের মূল কারণ। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও ব্যাংকিং জটিলতায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অনেক উদ্যোক্তার পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে শ্রমিকনেতারা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, গত নভেম্বরে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের নিয়ম সহজ হওয়ার পর শ্রমিকরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। মালিকদের একাংশ এটি মেনে নিতে না পেরে কৌশলে ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ‘অসদাচরণ’ বা ‘কাগজপত্রে জালিয়াতি’র অজুহাতে ছাঁটাই করছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারও বিষয়টি কঠোরভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যেসব শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ—প্রায় ১ হাজার ৫৯৯ জন—আন্দোলন, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করা বা অসদাচরণের অভিযোগে চাকরি হারিয়েছেন। তবে সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক মন্দার দোহাই দিয়ে ঈদুল আজহার পরপরই ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতাদের মতে, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হতে পারে। সরকার বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠন করলেও, তা সঠিক নিয়মে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা নিশ্চিত করা এবং ছাঁটাইয়ের কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
2.png)