খেলা
ছোটবেলায় পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রায়ই মার খেয়ে বাড়ি ফিরতেন। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যেতেন দাদা-দাদির কাছে। পাড়ার সেই দুষ্টু ছেলেরাই তাকে ক্ষ্যাপাতে বলত—তুমি তো বাড়ি গিয়ে ঠিকই "দাদির নালিশ" করবে। সেই থেকেই নাম হয়ে গেল ভোজিনহা—পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ "ছোট্ট দাদি"। সেই আদুরে, খানিকটা লজ্জাজনক নামটাই যে একদিন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত পরিচয় হয়ে উঠবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি।
ভোজিনহার আসল নাম জোসিমার হোসে এভোরা দিয়াস। জন্ম ১৯৮৬ সালের ৩ জুন, কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিন্দেলো শহরে। তার বাবা চেয়েছিলেন ছেলের নাম রাখতে "ভালদানো"—রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হোর্হে ভালদানোর নামে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম ছিলো কোন বিদেশি বিখ্যাত খেলোয়াড়ের নামে হুবহু কারো নামকরণ করা যাবেনা। তাই সেটা সম্ভব হয়নি। শেষমেশ তার নাম রাখা হয় জোসিমার—১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলা রাইট-ব্যাক জোসিমারের সম্মানে।তবে এক্ষেত্রে সাথে 'হোসে এভোরা দিয়াস' যোগ করে আইনের বাধা এড়ানো গেলো। তার বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় এবং মা সংসার সামলাতে ব্যস্ত থাকায়, ছোট্ট জোসিমার বড় হয়েছেন দাদা-দাদির স্নেহের ছায়ায়।
২৫ বছর বয়সে পেশাদার অভিষেক, তারপর দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন
আজকের ফুটবল বিশ্বে যেখানে প্রতিভাবান কিশোররা ১৮-১৯ বছর বয়সেই ইউরোপের বড় ক্লাবে সই করে ফেলে, সেখানে ভোজিনহা পেশাদার ফুটবলে পা রাখেন ২৫ বছর বয়সে—২০০৭ সালে স্থানীয় ক্লাব বাতুকের হয়ে। মজার বিষয়, সেই বছরই জন্ম নিয়েছিলেন স্পেনের বর্তমান তারকা লামিনে ইয়ামাল, যাকে পরবর্তীতে বিশ্বকাপের মঞ্চেই ভোজিনহা রুখে দেবেন।
এরপর শুরু হয় তার সত্যিকারের ভবঘুরে যাত্রা। কেপ ভার্দের মিন্দেলেন্সে থেকে শুরু করে এঙ্গোলার প্রোগ্রেসো দো সাম্বিজাঙ্গা, মলদোভার জিমব্রু কিশিনাউ, পর্তুগালের জিল ভিসেন্তে ও শাভেস, সাইপ্রাসের এইএল লিমাসল, এমনকি স্লোভাকিয়ার এএস ত্রেনচিনেও খেলেছেন তিনি। প্রায় ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে ২০০-র বেশি ম্যাচ খেলা এই গোলরক্ষকের ঝুলিতে শিরোপা বলতে সাইপ্রাসে এইএল লিমাসলের হয়ে জেতা একটি কাপ ও একটি লিগ শিরোপা। ইউরোপের বড় লিগ কিংবা বড় ক্লাবের চাকচিক্য কোনোদিনই তার ভাগ্যে জোটেনি। অথচ ২০১২ সাল থেকে জাতীয় দলের হয়ে টানা খেলে গেছেন, ৯০-এর বেশি ম্যাচ খেলে হয়ে উঠেছেন কেপ ভার্দের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন। খেলেছেন ২০১৩, ২০১৫, ২০২১ ও ২০২৩—চারটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে।তবু আন্তর্জাতিক পরিচিতির আলো তার গায়ে লাগেনি। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চ তো দূরের কথা।
মজার ব্যাপার হল এঙ্গোলার প্রোগ্রেসো দো সাম্বিজাঙ্গায় যোগ দিয়ে দেখলেন সেখানে জোসিমার নামে অন্য একজন খেলোয়াড় ইতিমধ্যেই খেলছেন ক্লাবের হয়ে। তিনি নিজেকে জোসিমার-২ হিসেবে পরিচয় করতে চাননি। অতঃপর জার্সি নাম হিসেবে বেছে নিলেন 'ভোজিনহা' যা তাকে ছোট বেলায় খেপাতে পাড়ার ছেলেরা ব্যভার করতো।
অবশেষে বিশ্বকাপ, আর ইতিহাস গড়া এক রাত
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেয়—বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা দল স্পেন। আটলান্টার মাঠে স্পেন সেদিন বল দখলে রেখেছিল প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময়, নিয়েছিল ২৭টি শট, যার মধ্যে ৭টি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে সেদিন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী ভোজিনহা। একটির পর একটি অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি ম্যাচ শেষ করেন গোলশূন্য ড্র দিয়ে। মাঠে নামা বদলি খেলোয়াড় ইয়ামালও তাকে ফাঁকি দিতে পারেননি। ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে তারই হাতে।
সেই রাতে ভোজিনহা হয়ে ওঠেন কোনো দেশের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে খেলা সর্বকনিষ্ঠ নন—বরং সবচেয়ে প্রবীণ খেলোয়াড়, যিনি এক দিন আগে কুরাসাওয়ের এলয় রুমের গড়া রেকর্ড ভেঙে দেন। পিটার শিল্টন ও দিনো জফের পর তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপে ক্লিন শিট রাখা তৃতীয় প্রবীণতম গোলরক্ষক। ম্যাচ শেষে ক্যামেরার সামনে কেঁদে ফেলেন তিনি। কারণ যাদের জন্য এই মুহূর্তটা সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য ছিল—তার দাদা-দাদি, যারা তাকে বড় করেছেন—তারা আর বেঁচে নেই এই দিন দেখার জন্য। তার মা-ও সেদিন মাঠে থাকতে পারেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় সময়মতো দেশে পৌঁছাতে পারেননি তিনি।
রাতারাতি তারকা, আর এক কংগ্রেসম্যানের হস্তক্ষেপ
ম্যাচের আগে ভোজিনহার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ছিল মাত্র প্রায় ৫০ হাজার। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংখ্যাটা লাখ ছাড়িয়ে যায়, আর দিন কয়েকের মধ্যে তা পৌঁছে যায় প্রায় ১৮ মিলিয়নে। ব্রাজিলিয়ান ও পর্তুগিজ সম্প্রচারকারীদের ব্যাপক কাভারেজ আর ভক্তদের গণআন্দোলনের কল্যাণে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
এই গল্পের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশটুকু আসে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি থেকে। কেপ ভার্দেসহ বেশ কয়েকটি দেশের ভ্রমণকারীদের জন্য তখন কড়া ভিসা-বন্ড নিয়ম বলবৎ ছিল। ভোজিনহার আবেগঘন সাক্ষাৎকার নজরে আসে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিসের। তিনি নিজে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে অনুরোধ জানান যেন ভোজিনহার মাকে সময়মতো যুক্তরাষ্ট্রে আসার ব্যবস্থা করা যায়। শেষ পর্যন্ত সেই অনুরোধ কাজেও লাগে—উরুগুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচে মায়ামির গ্যালারিতে বসে ছেলের খেলা দেখতে পান তার মা।
যাত্রা থামেনি সেখানেই
স্পেন-ম্যাচের রূপকথার পর কেপ ভার্দে উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষেও ড্র করে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে। শেষ ষোলোর আগে রাউন্ড অব ৩২-এ প্রতিপক্ষ ছিল ফেভারিট আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিলেও ভোজিনহা সেই ম্যাচেও নজর কাড়েন—লিওনেল মেসির একটি ফ্রি-কিক দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ২৩টি শটের বিপরীতে ১৮টি সেভ করেন তিনি, যা এই বিশ্বকাপে যেকোনো গোলরক্ষকের মধ্যে অন্যতম সেরা রেকর্ড।
সময়ের হিসেব আর জীবনের শিক্ষা
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো সময়ের এই সমীকরণ। যখন মেসি বা রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরা ক্যারিয়ারের শেষ বিকেলে তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন, তখন ভোজিনহার গল্পটা যেন সবে শুরু হলো! তিনি যদি ৩২ কিংবা ৩৫ বছর বয়সে হাল ছেড়ে দিয়ে অবসর নিয়ে নিতেন—যেটা একজন "সাধারণ" গোলরক্ষকের জন্য যুক্তিসঙ্গতই মনে হতো—তবে আজ বিশ্ব তার এই রূপকথা দেখত না।
জাপানি ভাষায় একটি সুন্দর ধারণা আছে—"ওবাইতরি"। অর্থাৎ, প্রতিটি ফুলের ফোটার সময় ভিন্ন। কারো সাফল্য তাড়াতাড়ি আসে, কারো আবার অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়। ভোজিনহা নিজেও ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, ১৮ বছর বয়সী নিজেকে নিয়ে তিনি গর্বিত হতে বলতেন—কারণ সেই ছেলেটাই সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে গেছে এই মুহূর্তের জন্য।
ভোজিনহার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যের জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতার সঙ্গে আপনার জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। একজনের সাফল্যের সময় আরেকজনের মতো হবে না। লড়ে যান, নিজের কাজ করে যান। এমনও হতে পারে, আপনি হয়তো ২০ বছরে সেই পরিচিতি পেলেন না, যা আপনার কঠোর পরিশ্রমের ফলে হঠাৎই এক রাতে অর্জিত হয়ে যেতে পারে।
আঙ্গোলা-মলদোভা-সাইপ্রাস-স্লোভাকিয়ার অখ্যাত লিগ ঘুরে বেড়ানো এক গোলরক্ষক, যার বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই, যিনি কোনোদিন রিয়াল মাদ্রিদ বা এসি মিলানের জার্সি গায়ে চড়াননি—তিনিই যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগকে হতাশ করে দিতে পারেন, তখন প্রশ্ন জাগে—সফলতা আসার কোনো ধরাবাঁধা বয়স বা সময় কি আসলেই আছে?
ভোজিনহা যদি চল্লিশ বছর বয়সে এসে বিশ্বকে চমকে দিতে পারেন, তাহলে আপনি কেন পারবেন না? কেবল হার না মানার মানসিকতাটুকু ধরে রাখুন—সাফল্য ঠিকই একদিন আপনার দরজায় কড়া নাড়বে, ঠিক যেভাবে সে নেড়েছিল আটলান্টার সেই সন্ধ্যায়, এক "ছোট্ট দাদি" নামের গোলরক্ষকের দরজায়।
বিষয় : কেপ ভার্দে ভোজিনহা
2.png)
রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
ছোটবেলায় পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রায়ই মার খেয়ে বাড়ি ফিরতেন। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যেতেন দাদা-দাদির কাছে। পাড়ার সেই দুষ্টু ছেলেরাই তাকে ক্ষ্যাপাতে বলত—তুমি তো বাড়ি গিয়ে ঠিকই "দাদির নালিশ" করবে। সেই থেকেই নাম হয়ে গেল ভোজিনহা—পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ "ছোট্ট দাদি"। সেই আদুরে, খানিকটা লজ্জাজনক নামটাই যে একদিন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত পরিচয় হয়ে উঠবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি।
ভোজিনহার আসল নাম জোসিমার হোসে এভোরা দিয়াস। জন্ম ১৯৮৬ সালের ৩ জুন, কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিন্দেলো শহরে। তার বাবা চেয়েছিলেন ছেলের নাম রাখতে "ভালদানো"—রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হোর্হে ভালদানোর নামে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম ছিলো কোন বিদেশি বিখ্যাত খেলোয়াড়ের নামে হুবহু কারো নামকরণ করা যাবেনা। তাই সেটা সম্ভব হয়নি। শেষমেশ তার নাম রাখা হয় জোসিমার—১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলা রাইট-ব্যাক জোসিমারের সম্মানে।তবে এক্ষেত্রে সাথে 'হোসে এভোরা দিয়াস' যোগ করে আইনের বাধা এড়ানো গেলো। তার বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় এবং মা সংসার সামলাতে ব্যস্ত থাকায়, ছোট্ট জোসিমার বড় হয়েছেন দাদা-দাদির স্নেহের ছায়ায়।
২৫ বছর বয়সে পেশাদার অভিষেক, তারপর দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন
আজকের ফুটবল বিশ্বে যেখানে প্রতিভাবান কিশোররা ১৮-১৯ বছর বয়সেই ইউরোপের বড় ক্লাবে সই করে ফেলে, সেখানে ভোজিনহা পেশাদার ফুটবলে পা রাখেন ২৫ বছর বয়সে—২০০৭ সালে স্থানীয় ক্লাব বাতুকের হয়ে। মজার বিষয়, সেই বছরই জন্ম নিয়েছিলেন স্পেনের বর্তমান তারকা লামিনে ইয়ামাল, যাকে পরবর্তীতে বিশ্বকাপের মঞ্চেই ভোজিনহা রুখে দেবেন।
এরপর শুরু হয় তার সত্যিকারের ভবঘুরে যাত্রা। কেপ ভার্দের মিন্দেলেন্সে থেকে শুরু করে এঙ্গোলার প্রোগ্রেসো দো সাম্বিজাঙ্গা, মলদোভার জিমব্রু কিশিনাউ, পর্তুগালের জিল ভিসেন্তে ও শাভেস, সাইপ্রাসের এইএল লিমাসল, এমনকি স্লোভাকিয়ার এএস ত্রেনচিনেও খেলেছেন তিনি। প্রায় ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে ২০০-র বেশি ম্যাচ খেলা এই গোলরক্ষকের ঝুলিতে শিরোপা বলতে সাইপ্রাসে এইএল লিমাসলের হয়ে জেতা একটি কাপ ও একটি লিগ শিরোপা। ইউরোপের বড় লিগ কিংবা বড় ক্লাবের চাকচিক্য কোনোদিনই তার ভাগ্যে জোটেনি। অথচ ২০১২ সাল থেকে জাতীয় দলের হয়ে টানা খেলে গেছেন, ৯০-এর বেশি ম্যাচ খেলে হয়ে উঠেছেন কেপ ভার্দের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন। খেলেছেন ২০১৩, ২০১৫, ২০২১ ও ২০২৩—চারটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে।তবু আন্তর্জাতিক পরিচিতির আলো তার গায়ে লাগেনি। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চ তো দূরের কথা।
মজার ব্যাপার হল এঙ্গোলার প্রোগ্রেসো দো সাম্বিজাঙ্গায় যোগ দিয়ে দেখলেন সেখানে জোসিমার নামে অন্য একজন খেলোয়াড় ইতিমধ্যেই খেলছেন ক্লাবের হয়ে। তিনি নিজেকে জোসিমার-২ হিসেবে পরিচয় করতে চাননি। অতঃপর জার্সি নাম হিসেবে বেছে নিলেন 'ভোজিনহা' যা তাকে ছোট বেলায় খেপাতে পাড়ার ছেলেরা ব্যভার করতো।
অবশেষে বিশ্বকাপ, আর ইতিহাস গড়া এক রাত
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেয়—বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা দল স্পেন। আটলান্টার মাঠে স্পেন সেদিন বল দখলে রেখেছিল প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময়, নিয়েছিল ২৭টি শট, যার মধ্যে ৭টি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে সেদিন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী ভোজিনহা। একটির পর একটি অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি ম্যাচ শেষ করেন গোলশূন্য ড্র দিয়ে। মাঠে নামা বদলি খেলোয়াড় ইয়ামালও তাকে ফাঁকি দিতে পারেননি। ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে তারই হাতে।
সেই রাতে ভোজিনহা হয়ে ওঠেন কোনো দেশের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে খেলা সর্বকনিষ্ঠ নন—বরং সবচেয়ে প্রবীণ খেলোয়াড়, যিনি এক দিন আগে কুরাসাওয়ের এলয় রুমের গড়া রেকর্ড ভেঙে দেন। পিটার শিল্টন ও দিনো জফের পর তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপে ক্লিন শিট রাখা তৃতীয় প্রবীণতম গোলরক্ষক। ম্যাচ শেষে ক্যামেরার সামনে কেঁদে ফেলেন তিনি। কারণ যাদের জন্য এই মুহূর্তটা সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য ছিল—তার দাদা-দাদি, যারা তাকে বড় করেছেন—তারা আর বেঁচে নেই এই দিন দেখার জন্য। তার মা-ও সেদিন মাঠে থাকতে পারেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় সময়মতো দেশে পৌঁছাতে পারেননি তিনি।
রাতারাতি তারকা, আর এক কংগ্রেসম্যানের হস্তক্ষেপ
ম্যাচের আগে ভোজিনহার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ছিল মাত্র প্রায় ৫০ হাজার। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংখ্যাটা লাখ ছাড়িয়ে যায়, আর দিন কয়েকের মধ্যে তা পৌঁছে যায় প্রায় ১৮ মিলিয়নে। ব্রাজিলিয়ান ও পর্তুগিজ সম্প্রচারকারীদের ব্যাপক কাভারেজ আর ভক্তদের গণআন্দোলনের কল্যাণে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
এই গল্পের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশটুকু আসে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি থেকে। কেপ ভার্দেসহ বেশ কয়েকটি দেশের ভ্রমণকারীদের জন্য তখন কড়া ভিসা-বন্ড নিয়ম বলবৎ ছিল। ভোজিনহার আবেগঘন সাক্ষাৎকার নজরে আসে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিসের। তিনি নিজে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে অনুরোধ জানান যেন ভোজিনহার মাকে সময়মতো যুক্তরাষ্ট্রে আসার ব্যবস্থা করা যায়। শেষ পর্যন্ত সেই অনুরোধ কাজেও লাগে—উরুগুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচে মায়ামির গ্যালারিতে বসে ছেলের খেলা দেখতে পান তার মা।
যাত্রা থামেনি সেখানেই
স্পেন-ম্যাচের রূপকথার পর কেপ ভার্দে উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষেও ড্র করে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে। শেষ ষোলোর আগে রাউন্ড অব ৩২-এ প্রতিপক্ষ ছিল ফেভারিট আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিলেও ভোজিনহা সেই ম্যাচেও নজর কাড়েন—লিওনেল মেসির একটি ফ্রি-কিক দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ২৩টি শটের বিপরীতে ১৮টি সেভ করেন তিনি, যা এই বিশ্বকাপে যেকোনো গোলরক্ষকের মধ্যে অন্যতম সেরা রেকর্ড।
সময়ের হিসেব আর জীবনের শিক্ষা
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো সময়ের এই সমীকরণ। যখন মেসি বা রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরা ক্যারিয়ারের শেষ বিকেলে তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন, তখন ভোজিনহার গল্পটা যেন সবে শুরু হলো! তিনি যদি ৩২ কিংবা ৩৫ বছর বয়সে হাল ছেড়ে দিয়ে অবসর নিয়ে নিতেন—যেটা একজন "সাধারণ" গোলরক্ষকের জন্য যুক্তিসঙ্গতই মনে হতো—তবে আজ বিশ্ব তার এই রূপকথা দেখত না।
জাপানি ভাষায় একটি সুন্দর ধারণা আছে—"ওবাইতরি"। অর্থাৎ, প্রতিটি ফুলের ফোটার সময় ভিন্ন। কারো সাফল্য তাড়াতাড়ি আসে, কারো আবার অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়। ভোজিনহা নিজেও ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, ১৮ বছর বয়সী নিজেকে নিয়ে তিনি গর্বিত হতে বলতেন—কারণ সেই ছেলেটাই সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে গেছে এই মুহূর্তের জন্য।
ভোজিনহার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যের জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতার সঙ্গে আপনার জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। একজনের সাফল্যের সময় আরেকজনের মতো হবে না। লড়ে যান, নিজের কাজ করে যান। এমনও হতে পারে, আপনি হয়তো ২০ বছরে সেই পরিচিতি পেলেন না, যা আপনার কঠোর পরিশ্রমের ফলে হঠাৎই এক রাতে অর্জিত হয়ে যেতে পারে।
আঙ্গোলা-মলদোভা-সাইপ্রাস-স্লোভাকিয়ার অখ্যাত লিগ ঘুরে বেড়ানো এক গোলরক্ষক, যার বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই, যিনি কোনোদিন রিয়াল মাদ্রিদ বা এসি মিলানের জার্সি গায়ে চড়াননি—তিনিই যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগকে হতাশ করে দিতে পারেন, তখন প্রশ্ন জাগে—সফলতা আসার কোনো ধরাবাঁধা বয়স বা সময় কি আসলেই আছে?
ভোজিনহা যদি চল্লিশ বছর বয়সে এসে বিশ্বকে চমকে দিতে পারেন, তাহলে আপনি কেন পারবেন না? কেবল হার না মানার মানসিকতাটুকু ধরে রাখুন—সাফল্য ঠিকই একদিন আপনার দরজায় কড়া নাড়বে, ঠিক যেভাবে সে নেড়েছিল আটলান্টার সেই সন্ধ্যায়, এক "ছোট্ট দাদি" নামের গোলরক্ষকের দরজায়।
2.png)