বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি
সৌরঝড়ের তীব্র ছোবল থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে বিজ্ঞানীরা এক অভাবনীয় ও সাহসী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। মহাকাশে বিশাল এক ‘গ্যাস পকেট’ বা কৃত্রিম ঢাল তৈরির মাধ্যমে সূর্য থেকে ধেয়ে আসা উচ্চ-শক্তির কণার স্রোতকে দুর্বল করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন গবেষকরা। ‘স্টর্মওয়াল’ (StormWall) নামে পরিচিত এই প্রকল্পটিকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর জন্য একধরনের ‘সানস্ক্রিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
সৌরচক্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূর্যের অস্থিতিশীলতা বেড়ে যায়, ফলে তৈরি হয় করোনাল মাস ইজেকশন (সিএমই)। এই বিশাল প্লাজমা মেঘ যখন পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়, তখন জিপিএস অচল হওয়া, স্যাটেলাইটের ক্ষতিসাধন, বিদ্যুৎ গ্রিড ভেঙে পড়া এমনকি বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি শতাব্দীতে অন্তত একবার এমন অতি শক্তিশালী সৌরঝড় আঘাত হানে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করতে সক্ষম।
গবেষকদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে কক্ষপথে বাসের আকারের ছয়টি বিশাল উপগ্রহ স্থাপন করা হবে। সূর্য থেকে ধেয়ে আসা সিএমই শনাক্ত করার সাথে সাথেই এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে সোডিয়াম, বেরিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মতো প্রতিক্রিয়াশীল গ্যাস নির্গত করবে। এই গ্যাস একটি কৃত্রিম প্লাজমা স্তর তৈরি করবে, যা পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের ওপর পড়া ঝড়ের শক্তির আঘাতকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেবে। গবেষণার প্রধান লেখক ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানী ব্রায়ান ওয়ালশ একে পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের জন্য একটি ‘এয়ারব্যাগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রকল্পটির কার্যকারিতা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা ২০২৪ সালের মে মাসে আঘাত হানা গত দুই দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়কে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে সিমুলেশন চালিয়েছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ধ্বংসের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একটি বিশাল সৌরঝড়ের শক্তি অর্ধেক করার জন্য যে পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন, তা সিএমই-এর ভরের তুলনায় খুবই নগণ্য।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ছয়টি বিশাল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বারবার ব্যবহারের খরচ হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার। এছাড়া প্রতিটি বড় ঝড় মোকাবেলায় একবার গ্যাস ব্যবহার করলে উপগ্রহগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যেতে পারে, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুণ।
তবুও এই বিপুল বিনিয়োগকে বিজ্ঞানীরা সময়োপযোগী মনে করছেন। কারণ, একটি ভয়াবহ সৌরঝড় যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে, তবে সেই তুলনায় স্টর্মওয়াল প্রকল্পের খরচ অত্যন্ত যৌক্তিক। নাসার সৌর পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান ডেভিড সিবেকসহ অন্য গবেষকরাও এই দূরদর্শী প্রকল্পটিকে একটি অপরিহার্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন। সফলভাবে কার্যকর করা গেলে, স্টর্মওয়াল মানবজাতির প্রযুক্তিগত সভ্যতাকে মহাজাগতিক ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করার এক ঢাল হয়ে উঠবে।
বিষয় : সৌরঝড় স্টর্মওয়াল
2.png)
রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
সৌরঝড়ের তীব্র ছোবল থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে বিজ্ঞানীরা এক অভাবনীয় ও সাহসী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। মহাকাশে বিশাল এক ‘গ্যাস পকেট’ বা কৃত্রিম ঢাল তৈরির মাধ্যমে সূর্য থেকে ধেয়ে আসা উচ্চ-শক্তির কণার স্রোতকে দুর্বল করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন গবেষকরা। ‘স্টর্মওয়াল’ (StormWall) নামে পরিচিত এই প্রকল্পটিকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর জন্য একধরনের ‘সানস্ক্রিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
সৌরচক্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূর্যের অস্থিতিশীলতা বেড়ে যায়, ফলে তৈরি হয় করোনাল মাস ইজেকশন (সিএমই)। এই বিশাল প্লাজমা মেঘ যখন পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়, তখন জিপিএস অচল হওয়া, স্যাটেলাইটের ক্ষতিসাধন, বিদ্যুৎ গ্রিড ভেঙে পড়া এমনকি বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি শতাব্দীতে অন্তত একবার এমন অতি শক্তিশালী সৌরঝড় আঘাত হানে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করতে সক্ষম।
গবেষকদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে কক্ষপথে বাসের আকারের ছয়টি বিশাল উপগ্রহ স্থাপন করা হবে। সূর্য থেকে ধেয়ে আসা সিএমই শনাক্ত করার সাথে সাথেই এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে সোডিয়াম, বেরিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মতো প্রতিক্রিয়াশীল গ্যাস নির্গত করবে। এই গ্যাস একটি কৃত্রিম প্লাজমা স্তর তৈরি করবে, যা পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের ওপর পড়া ঝড়ের শক্তির আঘাতকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেবে। গবেষণার প্রধান লেখক ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানী ব্রায়ান ওয়ালশ একে পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের জন্য একটি ‘এয়ারব্যাগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রকল্পটির কার্যকারিতা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা ২০২৪ সালের মে মাসে আঘাত হানা গত দুই দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়কে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে সিমুলেশন চালিয়েছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ধ্বংসের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একটি বিশাল সৌরঝড়ের শক্তি অর্ধেক করার জন্য যে পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন, তা সিএমই-এর ভরের তুলনায় খুবই নগণ্য।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ছয়টি বিশাল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বারবার ব্যবহারের খরচ হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার। এছাড়া প্রতিটি বড় ঝড় মোকাবেলায় একবার গ্যাস ব্যবহার করলে উপগ্রহগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যেতে পারে, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুণ।
তবুও এই বিপুল বিনিয়োগকে বিজ্ঞানীরা সময়োপযোগী মনে করছেন। কারণ, একটি ভয়াবহ সৌরঝড় যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে, তবে সেই তুলনায় স্টর্মওয়াল প্রকল্পের খরচ অত্যন্ত যৌক্তিক। নাসার সৌর পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান ডেভিড সিবেকসহ অন্য গবেষকরাও এই দূরদর্শী প্রকল্পটিকে একটি অপরিহার্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন। সফলভাবে কার্যকর করা গেলে, স্টর্মওয়াল মানবজাতির প্রযুক্তিগত সভ্যতাকে মহাজাগতিক ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করার এক ঢাল হয়ে উঠবে।
2.png)