বানিজ্য
নিরাপদ ও শরিয়াহভিত্তিক সরকারি মাধ্যমে বিনিয়োগে আগ্রহী সাধারণ মানুষ, প্রবাসী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম মাত্র ২৭৩ দিন (৯ মাস) মেয়াদি ‘স্বল্পমেয়াদি বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ছাড়ছে সরকার। মাত্র ১০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বিনিয়োগ সীমা নির্ধারণ করায় সাধারণ মধ্যবিত্তরাও এই প্রথম কোনো সরকারি বড় বিনিয়োগে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এত দিন বাংলাদেশে ইস্যু হওয়া সরকারি সুকুক বন্ডগুলোর বেশির ভাগই ছিল ৫, ৭ কিংবা ১০ বছর মেয়াদি, যা দীর্ঘমেয়াদে টাকা আটকে থাকার কারণে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারত না। সেই বৃত্ত ভেঙে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এই স্বল্পমেয়াদি সুকুকের জন্য আবেদন গ্রহণ করা হবে আজ রবিবার (২৮ জুন)। বিনিয়োগকারীরা সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ পাবেন। এই সুকুকের মাধ্যমে বাজার থেকে মোট ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা বার্ষিক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে নিশ্চিত মুনাফা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এটি একটি ‘ইজারা সুকুক’। এর বড় সুবিধা হলো, ২৭৩ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মূল অর্থের সঙ্গে অর্জিত এককালীন মুনাফা সরাসরি বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হবে। ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং যেকোনো দেশীয় বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এতে অংশ নিতে পারবেন।
বিনিয়োগকারীরা তাঁদের নিজস্ব যেকোনো তফশিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা হিসাবের (ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) মাধ্যমে এই সুকুকের জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডিউলের (এসএসএম) মাধ্যমে এই নিলাম ও বরাদ্দ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
যাঁরা প্রথমবার কোনো সরকারি সুকুকে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন, তাঁদের আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে একটি ‘সুকুক ইনভেস্টর’ (এসআই) আইডি খুলে নিতে হবে। তবে আগে যাঁরা সরকারি সুকুকে বিনিয়োগ করে এসআই আইডি নিয়ে রেখেছেন, তাঁদের নতুন করে আইডি খোলার প্রয়োজন হবে না। অন্যান্য প্রথাগত সরকারি সিকিউরিটিজের মতো এই সুকুকেও ব্যাংকের জন্য রেপো (Repo) সুবিধা মিলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি এই সুকুক শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য যেমন শতভাগ নিরাপদ সরকারি বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলে দিল, তেমনি সরকারও তুলনামূলক কম সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সহজে সংগ্রহ করতে পারবে।
সুকুক (Sukuk) কী?
শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি বন্ডকে সাধারণত ‘সুকুক’ বলা হয়। এটি প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের বিকল্প। সাধারণ বন্ডে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট হারে ‘সুদ’ পেলেও, সুকুকে সুদের কোনো স্থান নেই। এখানে নির্দিষ্ট কোনো বাস্তব সম্পদ বা সরকারের কোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্পের মালিকানার অংশের বিপরীতে ইজারা দেওয়া হয় এবং ওই সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের ‘মুনাফা’ দেওয়া হয়। সুকুক একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ সিলমোহরযুক্ত এমন আইনি দলিল, যা কোনো সম্পদের ওপর প্রকৃত অধিকার বা মালিকানার প্রমাণ বহন করে।
বাংলাদেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার সরকার এই ‘বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ব্যবস্থা চালু করে। সুকুকের মাধ্যমে অর্থায়নের জন্য ২০২০ সালে দেশের মোট ৬৮টি বড় বড় প্রকল্পের তালিকা তৈরি করেছিল অর্থ বিভাগ। প্রথম সুকুকটি ছিল ৮ হাজার কোটি টাকার, যা সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের বিপরীতে ছাড়া হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে সুকুক ছাড়ছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে শুরু করে ২০blank২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের সুকুক ছাড়ার মাধ্যমে সরকার বাজার থেকে মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে সরাসরি সরকারি নিলামের মাধ্যমে এসেছে ৩২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং বিশেষ (প্রাইভেট প্লেসমেন্ট) সুকুকের মাধ্যমে এসেছে ১০ হাজার কোটি টাকা।
ইসলামি ব্যাংকিং ও সুকুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বিশ্বের শীর্ষ দেশ মালয়েশিয়া। এ ছাড়া বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর এবং এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও (ইউএসএ) সুকুক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এটি এখন শুধু মুসলিম দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অমুসলিম দেশগুলোতেও একটি অতি নির্ভরযোগ্য ও স্বীকৃত অর্থায়নব্যবস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সুকুক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চলমান সুকুকের মোট পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। প্রতিবছর বিশ্ববাজারে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন নতুন সুকুক ছাড়া হচ্ছে।
বিষয় : ‘সুকুক’ বন্ড
2.png)
রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
নিরাপদ ও শরিয়াহভিত্তিক সরকারি মাধ্যমে বিনিয়োগে আগ্রহী সাধারণ মানুষ, প্রবাসী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম মাত্র ২৭৩ দিন (৯ মাস) মেয়াদি ‘স্বল্পমেয়াদি বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ছাড়ছে সরকার। মাত্র ১০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বিনিয়োগ সীমা নির্ধারণ করায় সাধারণ মধ্যবিত্তরাও এই প্রথম কোনো সরকারি বড় বিনিয়োগে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এত দিন বাংলাদেশে ইস্যু হওয়া সরকারি সুকুক বন্ডগুলোর বেশির ভাগই ছিল ৫, ৭ কিংবা ১০ বছর মেয়াদি, যা দীর্ঘমেয়াদে টাকা আটকে থাকার কারণে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারত না। সেই বৃত্ত ভেঙে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এই স্বল্পমেয়াদি সুকুকের জন্য আবেদন গ্রহণ করা হবে আজ রবিবার (২৮ জুন)। বিনিয়োগকারীরা সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ পাবেন। এই সুকুকের মাধ্যমে বাজার থেকে মোট ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা বার্ষিক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে নিশ্চিত মুনাফা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এটি একটি ‘ইজারা সুকুক’। এর বড় সুবিধা হলো, ২৭৩ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মূল অর্থের সঙ্গে অর্জিত এককালীন মুনাফা সরাসরি বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হবে। ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং যেকোনো দেশীয় বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এতে অংশ নিতে পারবেন।
বিনিয়োগকারীরা তাঁদের নিজস্ব যেকোনো তফশিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা হিসাবের (ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) মাধ্যমে এই সুকুকের জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডিউলের (এসএসএম) মাধ্যমে এই নিলাম ও বরাদ্দ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
যাঁরা প্রথমবার কোনো সরকারি সুকুকে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন, তাঁদের আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে একটি ‘সুকুক ইনভেস্টর’ (এসআই) আইডি খুলে নিতে হবে। তবে আগে যাঁরা সরকারি সুকুকে বিনিয়োগ করে এসআই আইডি নিয়ে রেখেছেন, তাঁদের নতুন করে আইডি খোলার প্রয়োজন হবে না। অন্যান্য প্রথাগত সরকারি সিকিউরিটিজের মতো এই সুকুকেও ব্যাংকের জন্য রেপো (Repo) সুবিধা মিলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি এই সুকুক শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য যেমন শতভাগ নিরাপদ সরকারি বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলে দিল, তেমনি সরকারও তুলনামূলক কম সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সহজে সংগ্রহ করতে পারবে।
সুকুক (Sukuk) কী?
শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি বন্ডকে সাধারণত ‘সুকুক’ বলা হয়। এটি প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের বিকল্প। সাধারণ বন্ডে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট হারে ‘সুদ’ পেলেও, সুকুকে সুদের কোনো স্থান নেই। এখানে নির্দিষ্ট কোনো বাস্তব সম্পদ বা সরকারের কোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্পের মালিকানার অংশের বিপরীতে ইজারা দেওয়া হয় এবং ওই সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের ‘মুনাফা’ দেওয়া হয়। সুকুক একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ সিলমোহরযুক্ত এমন আইনি দলিল, যা কোনো সম্পদের ওপর প্রকৃত অধিকার বা মালিকানার প্রমাণ বহন করে।
বাংলাদেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার সরকার এই ‘বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ব্যবস্থা চালু করে। সুকুকের মাধ্যমে অর্থায়নের জন্য ২০২০ সালে দেশের মোট ৬৮টি বড় বড় প্রকল্পের তালিকা তৈরি করেছিল অর্থ বিভাগ। প্রথম সুকুকটি ছিল ৮ হাজার কোটি টাকার, যা সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের বিপরীতে ছাড়া হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে সুকুক ছাড়ছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে শুরু করে ২০blank২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের সুকুক ছাড়ার মাধ্যমে সরকার বাজার থেকে মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে সরাসরি সরকারি নিলামের মাধ্যমে এসেছে ৩২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং বিশেষ (প্রাইভেট প্লেসমেন্ট) সুকুকের মাধ্যমে এসেছে ১০ হাজার কোটি টাকা।
ইসলামি ব্যাংকিং ও সুকুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বিশ্বের শীর্ষ দেশ মালয়েশিয়া। এ ছাড়া বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর এবং এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও (ইউএসএ) সুকুক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এটি এখন শুধু মুসলিম দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অমুসলিম দেশগুলোতেও একটি অতি নির্ভরযোগ্য ও স্বীকৃত অর্থায়নব্যবস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সুকুক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চলমান সুকুকের মোট পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। প্রতিবছর বিশ্ববাজারে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন নতুন সুকুক ছাড়া হচ্ছে।
2.png)