অর্থনীতিঅর্থনীতি

এআইয়ের দৌড়ে বাংলাদেশেরমত উন্নয়নশীল দেশের বড় সুযোগ কি?

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে চাকরি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে এআইয়ের ইতিবাচক ফল মিললেও অবকাঠামো, দক্ষতা ও কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণে জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের।

দিদারুল ইসলাম
দিদারুল ইসলাম
এআইয়ের দৌড়ে বাংলাদেশেরমত উন্নয়নশীল দেশের বড় সুযোগ কি?
ছবি -সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা আলাদা। এসব দেশে এআইয়ের কারণে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার চেয়ে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বরং কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে এআই।

বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যমান চাকরির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের মাধ্যমে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই কর্মীদের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

আইসিটি, অর্থ ও ব্যবসায়িক সেবার মতো চিন্তাশক্তিনির্ভর কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়তার সম্ভাবনা বেশি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এ কারণে এআইয়ের তাৎক্ষণিক ধাক্কা এসব দেশের শ্রমবাজারে তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, এআইয়ের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবে কর্মীদের কাজের ধরন বদলাবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে

এআইয়ের প্রভাব সব শ্রেণির কর্মীর ওপর সমান হবে না। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীদের বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই জনপ্রিয় হওয়ার পর যেসব কাজ তুলনামূলক সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায়, সেসব কাজের চাহিদা কমার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব এখনও কম।

চীন ও ভারতে এর কিছু উদাহরণও পাওয়া গেছে। চীনে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে। ভারতে এআই দিয়ে তুলনামূলক সহজে করা যায়—এমন উচ্চ দক্ষতার সেবামূলক চাকরির বিজ্ঞপ্তিতেও কমতি দেখা গেছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব তরুণ কর্মীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে।

ছোট ব্যবসায় এআইয়ের নতুন সম্ভাবনা

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে ছোট ব্যবসার ভূমিকা বড়। নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যেখানে কর্মীর সংখ্যা ১০ জনের কম। অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। কৃষি, খুচরা ব্যবসা, আবাসন ও খাদ্যসেবা এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, এআই এসব ছোট ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মেসেজিং অ্যাপ, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তারা আগে থেকেই ব্যবহার করে, সেগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে এআই ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ছোট উদ্যোক্তারা এআইয়ের সুবিধা নিতে পারবেন।

ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও থাইল্যান্ডের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ছোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো না থাকলেও এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা

এআই ব্যবহারে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে নেই। বরং স্বাস্থ্যখাতে এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।

দেশে এআইনির্ভর মেডিকেল ইমেজিং ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তের পরীক্ষা প্রতিদিন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবায় রোগ শনাক্তের সক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

সরকারি ডিজিটাল সেবার যে ভিত্তি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য ও নাগরিকসেবায় এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে সব উদ্যোগ সফল হয়নি। মোবাইল ফোনের তথ্য ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের একটি এআইভিত্তিক পদ্ধতি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় ওই পদ্ধতিতে তথ্যের নির্ভুলতাও কম ছিল।

এ কারণে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ, অন্য দেশের প্রযুক্তি হুবহু অনুসরণ না করে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতায় সেগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।

প্রযুক্তির সঙ্গে অবকাঠামোও জরুরি

এআই থেকে সুফল পেতে জাতীয় এআই নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি গ্রহণে নিয়ন্ত্রক ও বৈদেশিক মুদ্রাজনিত বাধা কমানো এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

কানাডীয় অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁও একই ধরনের মত দিয়েছেন। ঢাকায় বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যেসব অর্থনীতিতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, এআই সেসব দেশের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে দক্ষতার ব্যবধান কমানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে এআই ব্যবহারের খরচ দেশভেদে অনেক বেশি ভিন্ন হলে এই সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং এআই ব্যবহারের উপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি এআইয়ের মাধ্যমে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রযুক্তি গ্রহণের খরচ কমানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।

চাকরি হারানোর অন্য আশঙ্কাও আছে

এআইয়ের পাশাপাশি অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তার বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘ইজ বাংলাদেশ রেডি ফর দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক’ শীর্ষক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এআই ও অটোমেশনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এলডিসি উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার। ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মী। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির রয়েছে।

অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করেন। তবে তাঁদের বড় একটি অংশ অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত।

প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানে জোর

শ্রম গবেষক ও উৎপাদন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, অটোমেশন ও উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকানোর সুযোগ বাংলাদেশের নেই। বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানকে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।

শ্রম অধিকার ও গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রস্তুতির অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা না থাকা। এ জন্য সরকার, শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, অটোমেশন আসার আগেই কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং কর্মহীন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার।

অটোমেশন বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সেই বিনিয়োগ করতে পারবে না। ফলে প্রযুক্তিগত রূপান্তরও ধাপে ধাপে এগোবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করছে। এআই গ্রহণের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, তথ্যব্যবস্থা ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

নিজস্ব অত্যাধুনিক এআই ব্যবস্থা তৈরির চেয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা মানিয়ে নেওয়াই উন্নয়নশীল দেশের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত। এআই যেমন উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি কিছু কাজ বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করবে। তাই প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাই হবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।

বিষয় : বাংলাদেশ এআই প্রযুক্তি সম্ভাবনা

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬


এআইয়ের দৌড়ে বাংলাদেশেরমত উন্নয়নশীল দেশের বড় সুযোগ কি?

প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা আলাদা। এসব দেশে এআইয়ের কারণে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার চেয়ে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বরং কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে এআই।

বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যমান চাকরির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের মাধ্যমে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই কর্মীদের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

আইসিটি, অর্থ ও ব্যবসায়িক সেবার মতো চিন্তাশক্তিনির্ভর কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়তার সম্ভাবনা বেশি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এ কারণে এআইয়ের তাৎক্ষণিক ধাক্কা এসব দেশের শ্রমবাজারে তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, এআইয়ের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবে কর্মীদের কাজের ধরন বদলাবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে

এআইয়ের প্রভাব সব শ্রেণির কর্মীর ওপর সমান হবে না। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীদের বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই জনপ্রিয় হওয়ার পর যেসব কাজ তুলনামূলক সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায়, সেসব কাজের চাহিদা কমার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব এখনও কম।

চীন ও ভারতে এর কিছু উদাহরণও পাওয়া গেছে। চীনে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে। ভারতে এআই দিয়ে তুলনামূলক সহজে করা যায়—এমন উচ্চ দক্ষতার সেবামূলক চাকরির বিজ্ঞপ্তিতেও কমতি দেখা গেছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব তরুণ কর্মীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে।

ছোট ব্যবসায় এআইয়ের নতুন সম্ভাবনা

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে ছোট ব্যবসার ভূমিকা বড়। নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যেখানে কর্মীর সংখ্যা ১০ জনের কম। অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। কৃষি, খুচরা ব্যবসা, আবাসন ও খাদ্যসেবা এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, এআই এসব ছোট ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মেসেজিং অ্যাপ, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তারা আগে থেকেই ব্যবহার করে, সেগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে এআই ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ছোট উদ্যোক্তারা এআইয়ের সুবিধা নিতে পারবেন।

ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও থাইল্যান্ডের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ছোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো না থাকলেও এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা

এআই ব্যবহারে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে নেই। বরং স্বাস্থ্যখাতে এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।

দেশে এআইনির্ভর মেডিকেল ইমেজিং ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তের পরীক্ষা প্রতিদিন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবায় রোগ শনাক্তের সক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

সরকারি ডিজিটাল সেবার যে ভিত্তি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য ও নাগরিকসেবায় এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে সব উদ্যোগ সফল হয়নি। মোবাইল ফোনের তথ্য ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের একটি এআইভিত্তিক পদ্ধতি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় ওই পদ্ধতিতে তথ্যের নির্ভুলতাও কম ছিল।

এ কারণে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ, অন্য দেশের প্রযুক্তি হুবহু অনুসরণ না করে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতায় সেগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।

প্রযুক্তির সঙ্গে অবকাঠামোও জরুরি

এআই থেকে সুফল পেতে জাতীয় এআই নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি গ্রহণে নিয়ন্ত্রক ও বৈদেশিক মুদ্রাজনিত বাধা কমানো এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

কানাডীয় অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁও একই ধরনের মত দিয়েছেন। ঢাকায় বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যেসব অর্থনীতিতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, এআই সেসব দেশের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে দক্ষতার ব্যবধান কমানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে এআই ব্যবহারের খরচ দেশভেদে অনেক বেশি ভিন্ন হলে এই সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং এআই ব্যবহারের উপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি এআইয়ের মাধ্যমে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রযুক্তি গ্রহণের খরচ কমানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।

চাকরি হারানোর অন্য আশঙ্কাও আছে

এআইয়ের পাশাপাশি অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তার বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘ইজ বাংলাদেশ রেডি ফর দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক’ শীর্ষক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এআই ও অটোমেশনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এলডিসি উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার। ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মী। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির রয়েছে।

অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করেন। তবে তাঁদের বড় একটি অংশ অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত।

প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানে জোর

শ্রম গবেষক ও উৎপাদন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, অটোমেশন ও উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকানোর সুযোগ বাংলাদেশের নেই। বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানকে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।

শ্রম অধিকার ও গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রস্তুতির অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা না থাকা। এ জন্য সরকার, শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, অটোমেশন আসার আগেই কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং কর্মহীন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার।

অটোমেশন বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সেই বিনিয়োগ করতে পারবে না। ফলে প্রযুক্তিগত রূপান্তরও ধাপে ধাপে এগোবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করছে। এআই গ্রহণের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, তথ্যব্যবস্থা ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

নিজস্ব অত্যাধুনিক এআই ব্যবস্থা তৈরির চেয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা মানিয়ে নেওয়াই উন্নয়নশীল দেশের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত। এআই যেমন উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি কিছু কাজ বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করবে। তাই প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাই হবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত