অর্থনীতি
চট্টগ্রাম বন্দরের পাশেই কর্ণফুলী নদীর তীরে আনোয়ারায় শুরু হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজ। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে পরিকল্পনার মধ্যে থাকা প্রকল্পটি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়; বরং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যা দেশের শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গত দুই বছরে নতুন গতি পায়। ২০২৫ সালের মার্চে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই উদ্যোগ আরও এগিয়ে যায়। একই বছরের চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অন্তত ১২টি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে।
সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আনোয়ারার অর্থনৈতিক অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ৭ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ। প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে ১ হাজার ২৩৫ মিটার জেটি লিংক রোড, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, চার লেনের সড়ক, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব অবকাঠামো শিল্পকারখানা স্থাপনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনকে আরও দ্রুত ও সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রথম ধাপে এই অঞ্চলে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে। পরবর্তীতে বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের সীমাও অতিক্রম করতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
শিল্পের ধরনেও থাকছে বৈচিত্র্য। প্রচলিত তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে এখানে ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অটোমোবাইল শিল্পের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন শিল্পের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আনোয়ারার সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আমদানি-রপ্তানির ব্যয় ও সময় উভয়ই কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, নির্মাণাধীন বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত শিল্প ও বাণিজ্য করিডরে রূপ নিতে পারে।
শুধু আনোয়ারাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জ, মংলা এবং চাঁদপুরের মতলবসহ একাধিক অঞ্চলে নতুন শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্পভিত্তি বিস্তৃত হবে, রপ্তানি বহুমুখী হবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। এখন এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন, সময়মতো অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
2.png)
মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের পাশেই কর্ণফুলী নদীর তীরে আনোয়ারায় শুরু হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজ। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে পরিকল্পনার মধ্যে থাকা প্রকল্পটি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়; বরং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যা দেশের শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গত দুই বছরে নতুন গতি পায়। ২০২৫ সালের মার্চে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই উদ্যোগ আরও এগিয়ে যায়। একই বছরের চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অন্তত ১২টি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে।
সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আনোয়ারার অর্থনৈতিক অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ৭ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ। প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে ১ হাজার ২৩৫ মিটার জেটি লিংক রোড, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, চার লেনের সড়ক, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব অবকাঠামো শিল্পকারখানা স্থাপনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনকে আরও দ্রুত ও সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রথম ধাপে এই অঞ্চলে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে। পরবর্তীতে বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের সীমাও অতিক্রম করতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
শিল্পের ধরনেও থাকছে বৈচিত্র্য। প্রচলিত তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে এখানে ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অটোমোবাইল শিল্পের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন শিল্পের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আনোয়ারার সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আমদানি-রপ্তানির ব্যয় ও সময় উভয়ই কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, নির্মাণাধীন বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত শিল্প ও বাণিজ্য করিডরে রূপ নিতে পারে।
শুধু আনোয়ারাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জ, মংলা এবং চাঁদপুরের মতলবসহ একাধিক অঞ্চলে নতুন শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্পভিত্তি বিস্তৃত হবে, রপ্তানি বহুমুখী হবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। এখন এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন, সময়মতো অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
2.png)