জাতীয়
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ফের বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতির পাশাপাশি কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় জাতীয় উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্রাম ও রাজধানীর বাইরের শিল্পাঞ্চলে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার বিদ্যুৎ গেলে ফিরতে কয়েক ঘণ্টা লাগছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আগের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। মাত্র ১০ ঘণ্টা পর রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। এর আগে ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। আর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
বর্তমানে গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর বড় অংশও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বড় ঘাটতি
বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ গ্যাসের সংকট। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে কেন্দ্রগুলো পাচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম গ্যাস নিয়ে চলছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। একসময় গ্যাস থেকে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও এখন তা নেমে এসেছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে। কিছুদিন আগেও এই উৎপাদন ছিল সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো ও সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এলএনজি টার্মিনাল এখনও পুরোপুরি সচল নয়
গ্যাস সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হয় গত ২১ জুলাই। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে।
প্রায় ১৫ দিন পর আংশিক মেরামতের মাধ্যমে টার্মিনালটি থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরেনি এটি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, টার্মিনালের মেরামত শেষ হতে আরও দুই থেকে তিন দিন লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থায় যোগ হতে পারে।
তবে এতে সংকট পুরোপুরি কাটবে না। কারণ দেশে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
কয়লার সরবরাহেও ধাক্কা
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার সংকটও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তরে বিলম্ব হচ্ছে। এতে কেন্দ্রটিতে কয়লা পৌঁছাতে বাড়তি সময় লাগছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও কমেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। বাংলাদেশে কেন্দ্রটির সরবরাহ ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হলেও কয়েক দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট। ঝাড়খণ্ডে বন্যার পানিতে কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে আজ মঙ্গলবার কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে আদানি পাওয়ার।
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। রক্ষণাবেক্ষণ শেষে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। বিপরীতে রামপাল ও বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।
গ্রাম-শহর সর্বত্র ভোগান্তি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকের ওপর। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তীব্র গরমে ফ্যান, এসি ও পানির পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনলাইনভিত্তিক কাজ।
সিলেটে গতকাল সোমবার ২৪৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২০২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪৫ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষুব্ধ হয়ে রোববার রাতে নগরের টুকের বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বগুড়ার সান্তাহারেও চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক অবস্থায় আনতেও সময় লাগে। উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়।
দ্রুত গ্যাস বাড়ানোর চেষ্টা
লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতির পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সচিব পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন।
যেসব কেন্দ্র দ্রুত জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিতে পারবে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ানো গেলে উৎপাদনও দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিং কিছুটা কমতে পারে। তবে বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ দিয়ে ঘাটতি সামাল
গ্যাস ও কয়লার সংকট মোকাবিলায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ে।
এর ওপর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, সাময়িকভাবে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি মোকাবিলা করা গেলেও দীর্ঘ সময় এভাবে চলা সম্ভব নয়। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক করাই এখন মূল সমাধান।
কয়েক দিনের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির আশা
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা করছেন, এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তাঁর মতে, গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের আশা, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এতে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ নাও হতে পারে। কারণ তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
দীর্ঘদিনের সংকটই এখন বড় আকারে
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে সংকটকে গভীর করেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতার ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাময়িকভাবে গ্যাস বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হলেও এতে স্থায়ী সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, গ্যাস-বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশের জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। দ্রুত এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তবে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।’
স্থানীয় গ্রিডেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা
জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি স্থানীয় সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপ করছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট।
আড়াইহাজারে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। ২০২৩ সালে এটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও পুরোপুরি চালু করা যায়নি। কোরিয়া থেকে বিশেষায়িত প্রকৌশলী দল এলে বাকি কাজ সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হতে পারে।
উপকেন্দ্রটি চালু হলে ভূলতা গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিকল্প সঞ্চালনপথ তৈরি হবে। এতে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারের স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা উন্নতি আসতে পারে। তবে জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতি থাকলে শুধু স্থানীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়িয়ে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
বিষয় : জ্বালানি সংকট লোডশেডিং
2.png)
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ফের বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতির পাশাপাশি কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় জাতীয় উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্রাম ও রাজধানীর বাইরের শিল্পাঞ্চলে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার বিদ্যুৎ গেলে ফিরতে কয়েক ঘণ্টা লাগছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আগের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। মাত্র ১০ ঘণ্টা পর রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। এর আগে ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। আর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
বর্তমানে গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর বড় অংশও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বড় ঘাটতি
বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ গ্যাসের সংকট। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে কেন্দ্রগুলো পাচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম গ্যাস নিয়ে চলছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। একসময় গ্যাস থেকে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও এখন তা নেমে এসেছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে। কিছুদিন আগেও এই উৎপাদন ছিল সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো ও সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এলএনজি টার্মিনাল এখনও পুরোপুরি সচল নয়
গ্যাস সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হয় গত ২১ জুলাই। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে।
প্রায় ১৫ দিন পর আংশিক মেরামতের মাধ্যমে টার্মিনালটি থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরেনি এটি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, টার্মিনালের মেরামত শেষ হতে আরও দুই থেকে তিন দিন লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থায় যোগ হতে পারে।
তবে এতে সংকট পুরোপুরি কাটবে না। কারণ দেশে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
কয়লার সরবরাহেও ধাক্কা
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার সংকটও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তরে বিলম্ব হচ্ছে। এতে কেন্দ্রটিতে কয়লা পৌঁছাতে বাড়তি সময় লাগছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও কমেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। বাংলাদেশে কেন্দ্রটির সরবরাহ ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হলেও কয়েক দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট। ঝাড়খণ্ডে বন্যার পানিতে কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে আজ মঙ্গলবার কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে আদানি পাওয়ার।
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। রক্ষণাবেক্ষণ শেষে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। বিপরীতে রামপাল ও বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।
গ্রাম-শহর সর্বত্র ভোগান্তি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকের ওপর। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তীব্র গরমে ফ্যান, এসি ও পানির পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনলাইনভিত্তিক কাজ।
সিলেটে গতকাল সোমবার ২৪৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২০২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪৫ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষুব্ধ হয়ে রোববার রাতে নগরের টুকের বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বগুড়ার সান্তাহারেও চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক অবস্থায় আনতেও সময় লাগে। উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়।
দ্রুত গ্যাস বাড়ানোর চেষ্টা
লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতির পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সচিব পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন।
যেসব কেন্দ্র দ্রুত জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিতে পারবে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ানো গেলে উৎপাদনও দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিং কিছুটা কমতে পারে। তবে বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ দিয়ে ঘাটতি সামাল
গ্যাস ও কয়লার সংকট মোকাবিলায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ে।
এর ওপর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, সাময়িকভাবে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি মোকাবিলা করা গেলেও দীর্ঘ সময় এভাবে চলা সম্ভব নয়। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক করাই এখন মূল সমাধান।
কয়েক দিনের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির আশা
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা করছেন, এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তাঁর মতে, গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের আশা, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এতে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ নাও হতে পারে। কারণ তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
দীর্ঘদিনের সংকটই এখন বড় আকারে
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে সংকটকে গভীর করেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতার ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাময়িকভাবে গ্যাস বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হলেও এতে স্থায়ী সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, গ্যাস-বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশের জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। দ্রুত এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তবে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।’
স্থানীয় গ্রিডেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা
জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি স্থানীয় সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপ করছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট।
আড়াইহাজারে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। ২০২৩ সালে এটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও পুরোপুরি চালু করা যায়নি। কোরিয়া থেকে বিশেষায়িত প্রকৌশলী দল এলে বাকি কাজ সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হতে পারে।
উপকেন্দ্রটি চালু হলে ভূলতা গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিকল্প সঞ্চালনপথ তৈরি হবে। এতে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারের স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা উন্নতি আসতে পারে। তবে জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতি থাকলে শুধু স্থানীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়িয়ে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
2.png)